Thursday, 18 March 2021

শূন্য নিয়ে হৈ চৈ

 শূন্য এমন একটি সুপরিচিত সংখ্যা যে এর সম্পর্কে কিছু বলা অকারনে হৈচৈ মনে হতে পারে, কিন্তু বিবেচনা করলে শূন্য এমনই একটা সংখ্যা যা নিয়ে হৈ চৈ করা যথেষ্ট যুক্তি সঙ্গত।   গণিতের ইতিহাসে শূন্য একটি নবাগত সংখ্যা, অন্যান্য সংখ্যা   এক, দুই ইত্যাদির তুলনায় নাবালক বলা যায়। প্রায় ২০০,০০০ বছর আগে পৃথিবীতে মানব জাতির প্রথম আবির্ভাব হয় আনুমানিক ৫০০০ বছর আগে মানব জাতি প্রথম অংক শেখে, শেখে , , এইসব সংখ্যা লেখা শূন্য লেখা শেখে অনেক পরে, মাত্র ১৪০০ বছর আগে ওই যে বলে না যে "প্রয়োজনই উদ্ভাবনের কারণপ্রয়োজনেই মানবজাতি অংক শিখেছিল শুরুতে মানবজাতি ছিল যাযাবর, খাদ্যের সন্ধানে নানান জায়গায় ঘুরে বেড়াত তাদের খাদ্য ছিল ফলমূল, ছোট ছোট প্রানীর মাংস অনেক পরে সে শেখে আগুন জ্বালান, শেখে মাংস পুড়িয়ে খাওয়া, শেখে পশুপালন কয়েক হাজার বছর লাগে তার কৃষিকর্ম শিখতে  কৃষিকর্ম  শেখার সাথে সাথে শেষ হয় তার যাযাবর জীবন উর্বর নদী উপত্যকায়, যেখানে কৃষির অপরিহার্য উপাদান জল পাওয়া যায়, সেখানে বানায় স্থায়ী বসতি সমস্ত প্রাচীন সভ্যতাগুলি তাই নদীর ধারেমেসোপটেমীয় সভ্যতা (আধুনিক ইরাকের অংশ) টাইগ্রিস এবং ইউফ্রেটিস নদীর ধারে, সিন্ধু সভ্যতা সিন্ধু নদীর ধারে, মিসরীয় সভ্যতা নীল নদের ধারে, চীন সভ্যতা  হুয়ান হুয়ান নদীর ধারে কৃষি পশুপালনের জন্য তাদের গণিতের প্রয়োজন হয় কার কত জমি আছে, কত গরুছাগল আছে, এটা জানা প্রয়োজন হল এটা ঠিক যে তারা একটা গরু দুইটা গরুর মধ্যে পার্থক্য করতে পারত, সংখ্যাটা বেশী হলে, যেমন ২৫টা গরু ২৬টা গরুর মধ্যে  পার্থক্য করতে পারত না এখনও কিছু কিছু উপজাতি আছে যারা তিন বা চারের বেশি গণনা করতে পারে না তিন বা চারের বেশি কিছুই তাদের কাছেঅনেক তাদের কাছে দশটা গরুও নেক, চল্লিশটা গরুও অনেক এই গণনার বিষয়ে প্রসিদ্ধ রাশিয়ান-আমেরিকান পদার্থবিদ জর্জ গ্যামোরওয়ান, টু, থ্রী ইনফিনিটিবইটিতে একটি মজার গল্প আছে দুই হাঙ্গেরীর অভিজাত একটি খেলা খেলছে, যে বেশি সংখ্যা বলতে পারবে সে জিতবে

"ভাল," তাদের একজন বলল, "প্রথমে তুমি বল

দ্বিতীয়জন বেশ কিছু সময় ধরে চিন্তা করে বলল,  "তিন"

এবার প্রথম জনের পালা সে অনেকখন ধরে চিন্তা করল, মাথা চুলকাল, তারপর হাল ছেড়ে বলল, “”তুমি জিতলে 

মেসোপটেমীয়ার সুমের অঞ্চলকে বলা হয়  সভ্যতার আঁতুড়ঘর সুমেরীয়রা প্রথম শেখে লাঙ্গল দিয়ে চাষ করতে, তারাই প্রথম চাকা বানায় তারাই প্রথম মানুষ যারা লিখতে শিখছিল  কাদামাটির ফলকের ওপরে শক্ত কাঠির সাহায্যে তারা লিখত, তাদের লিপিকেকুনীফর্ম” (cuneiform) বলা হয় প্রথম গণনাও শিখেছিল সুমেরীয়রা, তারা বড় সংখ্যা গণনাও করতে পারত ওরাই প্রথম শিখেছিল প্রতীক চিহ্ন দিয়ে সংখ্যা বোঝাতে হাজার হাজার বছর ধরে আমরা অভ্যস্ত হয়েছি, নাহলে একই প্রতীক তিনটি ঘোড়া বোঝাতে পারে আবার তিনটি গরুও বোঝাতে পারে এটা বিস্ময়কর বোধ হতো আমরা টি ঘোড়া বা টি গরু বুঝতে পারি, এই চিহ্নটির মানে বুঝতে মানব জাতিকে অপেক্ষা করতে হয়েছে  গটিলেব ফের্জ, গিসেপি পীয়ানো, বারট্রান্ড রাসেলের মত প্রখ্যাত গণিতজ্ঞদের জন্য, অপেক্ষা করতে হয়েছিল জর্জ ক্যান্টরেরসেটথিয়োরির জন্য সংক্ষেপে সেট একটি সংগ্রহ, সংগ্রহটি যে কোন কিছুরই হতে পারে যেমন, একটি শার্ট, একটি প্যান্ট, একজোড়া জুতো একটি সেট হতে পারে, আবার পনেরটি শার্ট, দশটি প্যান্ট নিয়েও হতে পারে একটি সেট কয়েকটি সেট নিয়েও একটি সেট হতে পারে, আবার কিছুই নাই, সেটাও একটা সেট (তখন তাকে বলেখালি বা নাল সেট’) সেট থিয়োরির মতে প্রতীক চিহ্নটি একটি সেট যার প্রতিটি সদস্যদের সংগ্রহে তিনটি উপাদান আছে আরও সাধারণ ভাবে বলা যায়, প্রাকৃতিক সংখ্যা n একটি সেট যার সদস্যদের n টি উপাদান আছে  

গণিতে সংখ্যা লেখার জন্য যতগুলো পৃথক চিহ্ন ব্যাবহার করা হয় তাকে রাডিক্স বা বেস বলে। যেমন, আজকাল আমরা দশমিক বা ১০ বেস গাণিতিক পদ্ধতি ব্যাবহার করি, অর্থাৎ, ০,১,২,৩,৪,৫,৬,৭,৮,৯ এই দশটি পৃথক চিহ্ন ব্যাবহার করে সমস্ত সংখ্যাকে লিখে থাকি। সুমেরীয়রা ৬০ রাডিক্স বা বেস ব্যাবহার করত। এই গাণিতিক পদ্ধতিকে সেক্সাজেসিমাল পদ্ধতি বলা হয়। সেক্সাজেসিমাল পদ্ধতিতে ৬০টি পৃথক চিহ্ন ব্যাবহার করার কথা। সুমেরীয়দের  সেক্সাজেসিমাল পদ্ধতি পুরোপুরি শুদ্ধ সেক্সাজেসিমাল পদ্ধতি ছিল না, তারা ৬০-এর কিছু কম চিহ্ন ব্যাবহার করে থাকত। কি করে তারা সেক্সাজেসিমাল পদ্ধতি ব্যাবহার শিখেছিল সেটা একটা রহস্য। অনেকে মনে করেন, প্রাচীন মানুষেরা ৩৬০ দিনে বছর হিসেব করত। সেই সময় মনে করা হত সূর্য পৃথিবীর চারিপাশে বৃত্তাকার পথে ঘুরে। তাই তারা বৃত্তকে ৩৬০ ডিগ্রীতে ভাগ করে, প্রতিটি ডিগ্রী একদিনে সূর্যের পৃথিবীর পরিক্রমণের মাপ। তারা খুব সম্ভবত জানত বৃত্তের  ব্যাসার্ধ তার পরিধির ওপর ৬-বার   প্রয়োগ করা যায় এবং ব্যাসার্ধটি জ্যা হিসাবে ব্যাবহার করলে যে চাপটি তৈরী হয় সেটির মাপ ৬০ ডিগ্রী। সম্ভবত এইসব কারনেই তারা ৬০ রাডিক্স বা সেক্সাজেসিমাল পদ্ধতি ব্যাবহার করে।  অন্য একটি মতও আছে। একহাতের পাঁচটি আঙ্গুল এবং অন্য হাতের চারটি আঙ্গুলের ১২টি গাঁটের সাহায্যে সহজেই ১ থেকে ৬০ গণনা করা যায়। গণনার এই সুবিধা থেকেই সেক্সাজেসিমাল পদ্ধতির উৎপত্তি।  আমি নিজে এই মতে বিশ্বাসী। আমার মনে হয়, প্রথম মতবাদটির জন্য অনেক উন্নত জ্ঞান প্রয়োজন,  যেমন   বৃত্তের ব্যাসার্ধ বৃত্তের পরিধিকে ছয়বার অতিক্রম করে,   সেটা সেই সময়ের মানুষের ছিল না।

সেক্সাজেসিমাল পদ্ধতি ব্যাবহারের একটি বিশেষ সুবিধা ছিল। উল্লেখ্য যে সুমেরীয়রা ভগ্নাংশের ব্যাবহার জানত না। ভগ্নাংশে আমরা যে চিহ্নটি ব্যাবহার করি পূর্ণ সংখ্যাটি পৃথক করার জন্য, তারা সেটির ব্যাবহার করত না। ৬০ একটি অতিরিক্তভাবে যৌগিক সংখ্যা (সুপার কমপোজিট নম্বর)। এটি   ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ১০, ১২, ১৫, ২০, ৩০, এবং ৬০ দ্বারা বিভক্ত। এই পদ্ধতিতে  ভগ্নাংশের ব্যাবহার ন্যূনতম । সেক্সাজেসিমাল পদ্ধতির  একটি অবশিষ্টাংশ এখনো আমাদের সময় বিভাজনে দেখতে পাই, ৬০ সেকেন্ডে এক মিনিট, ৬০ মিনিটে এক ঘন্টা ইত্যাদি। 

পরবর্তীকালে সুমেরীয় সভ্যতা ব্যাবিলনীয় সভ্যতায় রূপান্তরিত হয় এবং ধীরে ধীরে সুমেরীয়-ব্যাবিলনীয় গণনা পদ্ধতি অন্যান্য সভ্যতায়, মিশর, ভারতবর্ষ, চীন ইত্যাদি দেশে ছড়িয়ে পড়ে। গণিতের বিকাশে এই সব সভ্যতারও অবদান আছে। যেমন সুমেরীয়-ব্যাবিলনীয়রা  সেক্সাজেসিমাল গণনা পদ্ধতি ব্যাবহার করত। মিশরীয় এবং ভারতীয়রা দশমিক বা ১০ বেস   পদ্ধতিটি, বর্তমানে যেটি প্রচলিত, তার প্রবর্তন করে। দুটি হাতের ১০ টি আঙুল ব্যবহার করে ১০ পর্যন্ত গণনা করা সহজ। সম্ভবত, মিশরীয় গণনার সুবিধার জন্য দশমিক পদ্ধতিটি   আবিষ্কার করেছিল।

আমরা জানি গ্রীকদের জ্যামিতি এবং সংখ্যা তত্ত্বের ক্ষেত্রে ব্যাপক অবদান আছে। কিন্তু সুমের, মিশর, চীন ইত্যাদি সভ্যতার মত, তাদের কাছেও শূন্য অধরা ছিল। সত্যি কথা বলতে তারা যে নীতি মেনে সংখ্যাব্যাবস্থা করেছিলেন সেই ব্যাবস্থায়  তারা  শূন্য প্রবর্তনের কোনও প্রয়োজন বোধ করে নি। গ্রীকরা জ্যামিতিকভাবে সংখ্যার কথা ভাবতেন, উদাহরণস্বরূপ ইউক্লিডের এলিমেন্টে, সংখ্যা তত্ত্ব সম্পর্কে সূক্ষ্ম ও মূল্যবান আলোচনা রয়েছে, এবং সেখানে সংখ্যাকে সর্বদা একটি সরল রেখার দৈর্ঘ্য হিসাবে দেখা হয়েছে। তাদের সেই জ্যামিতিক চিন্তায় তাই শূন্যের কোন অবকাশ ছিল না। এখানে উল্লেখ্য যে গ্রীকদের সংখ্যার জন্য পৃথক চিহ্ন নেই;  তারা তাদের বর্ণমালার কিছু বর্ণকে সংখ্যা হিসাবে চিহ্নিত করেছিল। কয়েকটি গ্রীক সংখ্যা নিম্নের চিত্রটিতে  দেখানো হয়েছে। আরও বড়  সংখ্যার জন্য তাদের পৃথক পৃথক চিহ্ন ছিল, যেমন, r=১০০,  f=৫০০ ইত্যাদি। তাদের সর্বোচ্চ সংখ্যাটি ছিল ১০০০০=m, যাকে "মাইরাড" বলা হত।


চিত্র-১। গ্রীকরা তাদের বর্ণমালা থেকে সংখ্যার চিহ্ন নিয়েছিলেন। কিছু গ্রীক সংখ্যা দেখান হয়েছে।  

রোমান সংখ্যা পদ্ধতি (এখনও যার সীমিত ব্যবহার আছে) গ্রীকদের মতোই। বর্ণমালার সাতটি প্রতীক চিহ্নকে তারা ব্যাবহার করত,

I = 1, V = 5, X = 10, L = 50, C = 100, D = 500, and M = 1,000,

এবং এদের সাহায্যেই অন্যান্য সমস্ত সংখ্যা তারা লিখত। তাদের পদ্ধতিতে উচ্চতর মানযুক্ত বর্ণের পিছনে বসানো বর্ণের মান যুক্ত হবে, আর সামনে বসানো বর্ণের মান বিয়োগ হবে। নিম্নে কিছু উদাহরণ দেওয়া হল,

III=, IX= and XI=১১,  MMXVI=২০১৬.

কোনও রোমান গণিতবিদকে যদি বড় সংখ্যা   লিখতে হত, তবে তাকে প্রচুর কষ্ট করতে হত।  উদাহরণস্বরূপ, ১০০ হাজার   সংখ্যাটি  লিখতে হলে তাকে  M   পরপর  একশ বার লিখতে হবে।

শূন্য আবিষ্কার হয়েছিল ভারতে। গণিতের বিকাশে ভারতের এই অবদান তুলনা বিহীন।   এই সম্পর্কে ফ্রান্স তথা পৃথিবীর অন্যতম সেরা গণিতবিদ ল্যাপলাস[1] (১৭৪৯-১৮২৭ খ্রীষ্টাব্দ) বলেছিলেন,

“এই ভারতই দশটি প্রতীক চিহ্নের মাধ্যমে সমস্ত সংখ্যার প্রকাশের জন্য আমাদের একটি সহজ ও দক্ষ পদ্ধতি দিয়েছে, যে পদ্ধতিতে প্রতিটি প্রতীকের একটি পরম মান এবং একটি অবস্থানগত মান আছে। এই গভীর জ্ঞান ও গুরুত্ত্বপূর্ন ধারণাটি আমাদের কাছে এখন এত সহজ দেখায় যে আমরা এর সত্যিকার মূল্য উপেক্ষা করি। এই পদ্ধতির সরলতা এবং দুর্দান্ত স্বাচ্ছন্দ্যতা গণিতকে মানব ইতিহাসের দরকারী আবিষ্কারগুলির প্রথম পদে ফেলেছে। ভারতীয় এই কৃতিত্বের মহিমা আরও বেশি করে অনুভব করি যখন দেখি যে বিশ্বের দুই সেরা প্রতিভাবান প্রাচীন পুরুষ আর্কিমিডিস[2] এবং অ্যাপলোনিয়াস[3] এই আবিষ্কারে অক্ষম ছিলেন।“

আনুমানিক ৬২৮  খ্রিস্টাব্দে ভারতে শূন্য আবিষ্কার হয়েছিল কিন্তু তার অনেক আগেই  ভারতীয়রা গণিত এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান তার অনেক আগেই উৎকর্ষতা  অর্জন করেছিল। ঐতিহ্যগতভাবে, ভারতীয়রা ব্রাহ্মি সংখ্যা পদ্ধতি ব্যবহার করত যার   প্রথম দশ সংখ্যা নিম্ন  চিত্রে দেখানো হয়েছে। 

চিত্র-২। ব্রাহ্মি সংখ্যার কিছু উদাহরণ।


ব্রাহ্মি দশমিক পদ্ধতিতে কিন্তু শূন্য ছিল না এবং সংখ্যার কেবলমাত্র পরম মান থাকত, অবস্থানগত মান থাকত না।

আর্যভট্ট (৪৭৬-৫৫০ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন বৈদিক-পরবর্তী যুগের ভারতের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ গণিতবিদ এবং জ্যোতির্বিদ।  তিনি বেশ কয়েকটি গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের গ্রন্থ রচনা করেছিলেন, যার বেশিরভাগই এখন হারিয়ে গেছে। তাঁর একটিমাত্র গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ “আর্যভাটিয়া” বর্তমানে বিত্তমান। মাত্র ২৩ বছর বয়সে তিনি গ্রন্থটি রচনা করেছিলেন। আর্যভাটিয়া চারটি অধ্যায়ে বিভক্ত, দশগীতিকা, গণিত, কালক্রিয়া ও গোল।  দশগীতিকায়, আর্যভট্ট সম্ভবত গ্রীকদের প্রভাবে সংস্কৃত বর্ণমালার উপর ভিত্তি করে একটি সংখ্যা ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন। গ্রীকদের মতো তিনিও সংখ্যার জন্য আলাদা চিহ্ন ব্যাবহার না করে  সংস্কৃত লিপির কিছু চিহ্নকে সংখ্যা হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন। সংস্কৃত লিপির ৩৩টি ব্যঞ্জনবর্ণের প্রথম ২৫টিকে বলা হয় বর্গ বর্ণ, অবশিষ্টদের অবর্গ বর্ণ। আর্যভট্ট প্রথম ২৫টি বর্গ বর্ণের মান নির্ধারিত করেন ১,২,৩,…২৫। অবর্গ বর্ণগুলির মান যথাক্রমে নির্ধারন করেন ৩০, ৪০, ৫০, ৬০, ৭০, ৮০,৯০, এবং ১০০।  

চিত্র-৩। সংস্কৃত ব্যঞ্জনবর্ণের আর্যভট্ট দ্বারা নির্ধারিত সংখ্যাগত মান।

তিনি নয়টি সংস্কৃত স্বরবর্ণগুলিতেও সংখ্যার মান নির্ধারন করেছিলেন (চিত্র 4 দেখুন এবং সংখ্যা লেখার কিছু বিধি নিণয় করেছিলেন। যদি কোনও ব্যঞ্জনবর্ণ স্বরবর্ণের সাথে মিলিত হয় তবে ব্যঞ্জনবর্ণের মানটি স্বরবর্ণের স্থান মানের দ্বারা গুণিত হবে। আর্যভট্টের পদ্ধতিতে সংখ্যা লেখার কয়েকটি উদাহরণ চিত্র ৪-এ দেখানো হয়েছে। উল্লেখ্য যে  আর্যভট্টের পদ্ধতিতে খুব বড় সংখ্যা লেখা সহজ ছিল। তিনি ছিলেন মূলত এক জ্যোতির্বিদ এবং একজন জ্যোতির্বিদ হিসাবে তাঁর বড় সংখ্যার প্রয়োজন ছিল। সংস্কৃত স্বরবর্ণগুলিতে সংখ্যাসূচক মান নির্ধারণের মাধ্যমে তিনি নিশ্চিত হয়েছিলেন যে তিনি খুব বড় সংখ্যা  গণনা করতে পারবেন।

চিত্র-৪। আর্যভট্ট দ্বারা নির্ধারিত নয়টি সংস্কৃত স্বরবর্ণের সংখ্যাসূচক মান।  আর্যভট্টর নিয়মানুযায়ী সংখ্যা লেখার উদাহরণও দেওয়া হয়েছে।

আর্যভট্ট  তাঁর ২৩ বছর বয়সে   আর্যভাটিয়া লিখেছিলেন এবং আমরা দেখি যে তিনি শূন্যের ব্যাবহার জানতেন না প্রায় সুতরাং, ৫০০ শতাব্দী অবধি  ভারতীয়দের শূন্য জানা ছিল না শূন্য  ভারতে উদ্ভাবিত হয়েছিল ৬২৮  খ্রিস্টাব্দ নাগাদ শূন্যর দুটি ব্যবহার রয়েছে, একটি সংখ্যা হিসাবে; পরম শূন্যতা বা অবিদ্যমানতার প্রতীক, এবং আরেকটি  স্থানধারক হিসাবে অবশ্যই  ২১০৬   বা ২১৬ বা ২০১৬   সমান নয় শূন্য আবিষ্কার করেছিলেন ভারতীয় গণিতবিদ ব্রহ্মগুপ্ত (৫৯৮-৬৭০ খ্রীষ্টাব্দ)) তাঁর.৩০ বছর বয়সে তার শ্রেষ্ঠ কীর্তি  "ব্রহ্মস্পুতাসিদ্ধান্তরচনা করেছিলেন এবং সেখানেই প্রথম শূন্যকে একটি সংখ্যা হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে গ্রীকদের চিন্তায় সংখ্যার  একটি মূর্ত বা জ্যামিতিক রূপ ছিল, তুলনায় ভারতীয় চিন্তায় সংখ্যার রূপ ছিল বিমূর্ত বা ভাবগত চিন্তা ভাবনার এই পার্থ্যকর জন্যই  ব্রহ্মগুপ্ত শূন্যর আবষ্কার করতে পেরেছিলেন ব্রহ্মস্পুতসিদ্ধন্তে, তিনি শূন্যকে সংখ্যাকে নিজের থেকে বিয়োগের ফলাফল হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন তিনি শূন্যের গাণিতিক ক্রিয়াকলাপগুলিও লিপিবদ্ধ করেছিলেন তখনকার রীতি অনুযায়ী নিয়মগুলি পদ্যতে দেওয়া হয়েছিল যদি অনুবাদ করি আমরা পাই,

   ‘ক’ যদি একটি সংখ্যা হয় তবে,

(১) ক+০ = ক;

(২) ক-০= ক;

(৩) ক × ০ =০

(৪) ক/০ =ক/০

(৫) ০/০= ০

তাঁর প্রথম তিনটি নিয়ম সঠীক। যোগ, বিয়োগ এবং শূন্যের সাথে গুণনের বিধিগুলি আজও কার্যকর। তবে শূন্য দ্বারা বিভাজনের তাঁর বিধিগুলি সম্পূর্ণ ভুল ছিল। শূন্য দ্বারা একটি সংখ্যার বিভাজনের জন্য, বহু কথায়, ব্রহ্মগুপ্ত যা বলেছিলেন তা  হল   ক/০ =ক/০। আমরা বুঝতে পারি শূন্য দ্বারা বিভাজন সম্বন্ধে তিনি নিশ্চিত নন।  এখন আমরা জানি যে শূন্য দ্বারা বিভাজন গাণিতিকভাবে সংজ্ঞায়িত ক্রিয়া নয়,  কারণ এমন কোনও সংখ্যা নেই যা ০ দ্বারা গুণিত হয়ে একটি নির্দিষ্ট মান দেয়।  (একটি ≠ 0 ধরে ধরে) যাইহোক, কখনও কখনও এটি  (ক/০) অসীম বা অনন্ত  হিসাবে ভাবা দরকারী, ইংরেজীতে বলা হয় ইনফিনিটি। যদিও ব্রহ্মগুপ্ত পরম শূন্যতা বা অবিদ্যমানতার প্রতীক ধারণা করতে পেরেছিলেন, কিন্তু অসীম বা অনন্তর ধারণাটি কল্পনা করতে পারেন নি। অসীম বা অনন্তের ধারণাটি খুবই বিমূর্ত, এটি এমন কিছু যা সীমাহীন,   অন্তহীন ও আবদ্ধ না  অসীম বা ইনফিনিটির কিছু ধারণা আমরা করতে পারি,  কল্পনা করুন, আপনি সংখ্যা গণনা করছেন, ১,২,৩,৪ …….., এর কোনও শেষ নেই; আপনি একের পর এক সংখ্যা গণনা করে যেতে পারেন, কখনই শেষ হবে না। আপনি যে সংখ্যাটি গণনা করতে পারেন, আমি সর্বদা 1 যোগ করে আরেকটি উচ্চতর সংখ্যা গণনা করতে পারি। ন্যাচারাল বা প্রাকৃতিক সংখ্যার সংখ্যাটি তাই সীমাহীন, অন্তহীন, আবদ্ধহীন। এটা অসীম বা ইনফিনিটি (infinity)। আপনি যদি আবার কোনও সংখ্যা শূন্য দ্বারা ভাগ করেন আবার আপনি অসীম পাবেন। কোন এক সংখ্যাকে ক্রমহ্রাসমান সংখ্যা দিয়ে  সাথে বিভাজন করতে থাকুন, ফলাফলটি আবারও বাধা ছাড়াই বাড়তে থাকবে।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে অসীম বা অনন্ত অন্য কোনও সংখ্যার মতো নয়, অন্যান্য সাধারণ সংখ্যার সাথে অসীমের একটি নীতিীগত পার্থ্ক্য আছে । অসীমের সাথে কোন সংখ্যা যোগ হলে ফলাফলটি ও অসীম হবে। একটি সাধারণ সংখ্যা এবং অসীমের মধ্যে পার্থক্যটি বোঝাতে বিখ্যাত  জার্মান গণিতবিদ ডেভিড হিলবার্ট (২৩ জানুয়ারী 1862 - 14 ফেব্রুয়ারি 1943) ছাত্রদের নিম্নের উদাহরণটি দিতেন:

মনে করা যাক একটি হোটেল, যার কক্ষসংখ্যা সীমিত বা  সীমাবদ্ধ,    পুরোপুরি অতিথিদের দখলে (প্রতিটি কক্ষেই অতিথি আছে) সেখানে ম্যানেজারকে নতুন অতিথিকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। তবে হোটেলের কক্ষ সংখ্যা অসীম হলে, এবং পুরোপুরি ভর্তি হলেও ম্যানেজার নতুন অতিথিকে নিতে পারবেন। কি করে?  মনে করুন,হোটেলের কক্ষ গুলো ১, ২, ৩, ৪, ৫… এইভাবে চিহ্নিত এবং প্রতিটি কক্ষ অতিথিপূর্ণ। ম্যানেজার নতুন অতিথিকে কিভাবে নেবেন।  তিনি কেবল বিদ্যমান অতিথিকে তার পাশের কক্ষে স্থানান্তরিত করবেন, যথা,

১ নম্বর কক্ষের অতিথিকে ২ নম্বর কক্ষে,

২ নম্বর কক্ষের অতিথিকে ৩ নম্বর কক্ষে,

৩ নম্বর কক্ষের অতিথিকে ৪ নম্বর কক্ষে,

৪ নম্বর কক্ষের অতিথিকে ৫ নম্বর কক্ষে,

৫ নম্বর কক্ষের অতিথিকে ৬ নম্বর কক্ষে,

……………………

ইত্যাদি। এই প্রক্রিয়ায় তিনি নতুন অতিথির জন্য ১ নম্বর কক্ষটি খালি করবেন। যদি একজন  অতিথির পরিবর্তে অসীম সংখ্যক নতুন অতিথি আসে? তবুও কোন সমস্যা নেই। ম্যানেজার নিম্নলিখিতটি প্রক্রিয়াটি করতে পারেন;

১ নম্বর কক্ষের অতিথিকে ২ নম্বর কক্ষে,

২ নম্বর কক্ষের অতিথিকে ৪ নম্বর কক্ষে,

৩ নম্বর কক্ষের অতিথিকে ৬ নম্বর কক্ষে,

৪ নম্বর কক্ষের অতিথিকে ৮ নম্বর কক্ষে,

৫ নম্বর কক্ষের অতিথিকে ১০ নম্বর কক্ষে,

৬ নম্বর কক্ষের অতিথিকে ১২ নম্বর কক্ষে, ইত্যাদি।

এই প্রক্রিয়ায় ম্যানেজারের কাছে অসীম সংখ্যক বেজোড় সংখ্যাযুক্ত কক্ষ গুলি অসীম সংখ্যক অতিথির জন্য থাকবে।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে গ্রীক দার্শনিক আনাক্সিম্যান্ডার (আনুমানিক ৬২০-৫৪৬ খ্রীস্টপূর্বাব্দ) প্রথম  অসীম বা অনন্তের ধারণাটি কল্পনা করতে পেরেছিলেন। তিনি এর নাম দিয়েছিলেন  আপিওরন। তিনি মনে করতেন আপিওরন ও অনন্ত গতিই বিশ্বজগত উদ্ভবের কারন।

ব্রহ্মগুপ্তের শূন্যকে শূন্য দ্বারা বিভাজনের নিময়টিও ভুল ছিল। যেহেতু শূন্য দ্বারা গুণিত যে কোনও সংখ্যা শূন্য, তাই ০/০-র কোনও সংজ্ঞায়িত মান হয় না। প্রকৃতপক্ষে, নিচে দেখানো হিসাবে, গণনার পদ্ধতির উপর নির্ভর করে, দুটি সমানভাবে বৈধ উত্তর আসতে পারে,


শূন্যের উদ্ভাবক ব্রহ্মগুপ্ত শূন্য দ্বারা বিভাজনের সঠিক নিয়মটি দিতে পারেননি। প্রায় ৪০০ বছর পরে ভারতীয় গণিতবিদ দ্বিতীয় ভাস্কর দ্বিতীয় বা ভাস্করাচার্য (১১১১-১১৮৬ খ্রীষ্টাব্দ) সঠিক নিয়মটি   দিয়েছিলেন। ভাস্করাচার্য গাণিতিক গ্রন্থগুলির মধ্যে একটির নাম লীলাবতী, যে নামটি রাখা হয়েছিল তাঁর মেয়ের নামে। ভাস্করাচার্য একটি সংখ্যা হিসাবে শূন্যের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি শূন্য সম্পর্কিত নিম্নলিখিত আটটি বিধি দিয়েছেন;

যদি  a  শূন্য নয় এমন একটি সংখ্যা, তবে

ভাস্করাচার্য্য অসীমকে একটি ভগ্নাংশ হিসাবে ভাবতেন যার হর বা দিভাজক ০।   তিনি এর নাম দিয়েছিলেন কহর।   লীলাবতীতে কহর বা অসীমের প্রকৃতি সম্পর্কে তিনি লিখেছেন,

"যদি কহরের সাথে কিছু যোগ করা হয় বা কহর থেকে কিছু বিয়োগ করা হয় তবে কহরের কোনও পরিবর্তন হবে না।"

তিনি অসীমের তুলনা করেছিলেন সর্বশক্তিমান বিষ্ণুর সাথে, বিষ্ণুর যেমন কোন পরিবর্তন হয় না, তেমনি কহরেরও কোন পরিবর্তন হয়না।

৮৭৬ খ্রীষ্টাব্দে ভারতে শূন্য ব্যাবহারের নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। গোয়ালিয়রের একটি বিষ্ণু মন্দিরে একটি পাথরের ট্যাবলেট আছে। পাথরের ট্যাবলেটে খোদাই করা আছে যে গোয়ালিয়েরের বাসিন্দারা বিষ্ণু উপাসনার জন্য প্রতিদিন ৫০ টি মালা তৈরি নিশ্চিত করার জন্য মন্দিরকে ১৮৭×২৮০ হাত মাপের  একটি উদ্যান উপহার দিয়েছিলেন।   ট্যাবলেটে লেখা ০ আজকের ০ থেকে বিশেষ আলাদা নয়।

প্রসঙ্গক্রমে,  ভারতীয় গণিতবিদ ব্রহ্মগুপ্ত কেবলমাত্র শূন্যের ধারণা নয়, তিনিই প্রথম গণিতে ঋণাত্মক (নেগেটিভ) সংখ্যার ধারণাটি প্রবর্তনও করেছিলেন। আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রীক গণিতবিদ ডিয়োফ্যান্টাস (২০০-২৮৪ খ্রীস্টাব্দ), যিনি যথার্থই বীজগণিতের জনক, একঘাত সমীকরণের (linear equations)  সমাধানে ঋণাত্মক (নেগেটিভ) সংখ্যার মুখোমুখি হন কিন্তু   তিনি তাদের অবাস্তব, অযৌক্তিক হিসাবে উপেক্ষা করেছিলেন। ইউরোপীয়নরা সংখ্যাকে জ্যামিতিক রূপে ভাবতেন; একটি দৈর্ঘ্য, একটি ক্ষেত্র বা একটি ঘনমান। এগুলি সবই বাস্তব।             ২-১=১ বা  ২-২=০ দৈর্ঘ্য, ক্ষেত্র বা আয়তনের দিক থেকে এটি বোঝা সহজ। কিন্তু ২-৩=-১ জ্যামিতিক ভাবে ভাবা যায় না। কি করে দৈর্ঘ্য  ২ থেকে আমরা দৈর্ঘ্য ৩ বিয়োগ করতে পারি? ঋণাত্মক সংখ্যার বাস্তবতা সম্পর্কে ইউরোপীয়নদের উদ্বিগ্নতা ১৯ শতকের প্রথম দিকেও ছিল। ১৮০৩ সালে বিখ্যাত ফরাসি গণিতবিদ লাজারে কারনট ঋণাত্মক সংখ্যা সম্বন্ধে লিখেছিলেন,

"সত্যই একটি বিচ্ছিন্ন ঋণাত্মক সংখ্যা পাওয়ার জন্য শূন্য থেকে কার্যকর পরিমাণটি অপসারণ করতে হবে। শূন্য, যা কিছু নয়, অবিদ্যমানতার প্রতীক, কি করে তা থেকে কিছু   অপসারণ করা যায়?  একটি বিচ্ছিন্ন ঋণাত্মক পরিমাণ কীভাবে ধারণা করা যায়?"

ভারতীয়রা বিমূর্ত পদ্ধতিতে সংখ্যার কথা ভাবতে পারতেন। ব্রহ্মগুপ্ত ঋণাত্মক সংখ্যাকে ঋণ (বা ধার) হিসাবে গন্য করেছিলেন। ধনাত্মক সংখ্যাকে তিনি ধনদৌলত এবং ঋণাত্মক সংখ্যাকে ঋণ হিসাবে ভেবে  নিম্নলিখিত নিয়মগুলো দিয়েছিলেন (ধনাত্মক সংখ্যাকে (+) ও  ঋণাত্মক সংখ্যাকে (-) দ্বারা চিহ্নিত করে)   ;

(১) ঋণ থেকে শূন্য বিয়োগ করলে ঋণ থাকে   [(-) - ০ =(-)] ।

(২) ধনদৌলত থেকে শূন্য বিয়োগ হলে ধনদৌলত থাকে [(+) - ০ =(+)] ।

(৩) শূন্য থেকে শূন্য বিয়োগ করলে শূন্য থাকে [ ০ - ০ =০] ।

(৪) শূন্য থেকে ঋণ বিয়োগ করলে ধনদৌলত থাকে [০- (-) = (+)] ।

(৫) শূন্য থেকে ধনদৌলত বিয়োগ করলে ঋণ থাকে [০ - (+) = (-)] ।

(৬)ঋণ বা ধনদৌলত শূন্য দিয়ে গুণিত হলে শূন্য হয় [ (-) × ০ =০, (+) × ০ = ০ ] ।

(৭) শূন্যকে  গুণিত শূন্য গুণফল শূন্য [০ × ০ = ০]

(8) দুটি ধনদৌলত গুণিত হলে একটি ধনদৌলত হয় [ (+) × (+) = (+)

(9) দুটি ঋণ গুণিত হলে, বা বিভাজন হলে ধনদৌলত হয়  [(-) × (-) =(+); (-) ÷ (-) = (+) ]    

(10) ঋণ ও  ধনদৌলত গুণিত বা বিভাজন হলে ঋণ হয় [(-) × (+) =(-); (-) ÷ (+) = (-) ]     

(১১) ধনদৌলত ও ঋণ গুণিত বা বিভাজন হলে ঋণ হয় [(+) × (-) =(-); (+) ÷ (-) = (-) ]      

 

আরব ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে ভারতীয় শূন্য আরবে যায়। ৮০০-১৫০০ খ্রীস্টাব্দ ইসলামের স্বর্ণযুগ বলা হয়। সেই সমইয় ইসলামী পন্ডিতগণ গণিত এবং জ্যোতির্বিদ্যায় দর্শনীয় অগ্রগতি করেছিলেন। খলিফা হারুন-আল-রশিদের রাজত্বে (আনুমানিক ৭৮৬-৮০৯ খ্রীস্টাব্দ)    বাগদাদে বয়েত-এল-হিকাম বা "হাউজ অফ উইজডম” নামে একটি একাডেমী বা বৌদ্ধিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। হারুন-আল-রশিদের পুত্র আল-মামুনের শাসনাকালে সেটি বিশেষ উন্নতি করেছিল। আল-মামুন বিজ্ঞান, চিকিৎসা, দর্শন, জ্যোতির্বিজ্ঞান ইত্যাদিতে পারদর্শী ছিলেন। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় খিলাফত জ্ঞানান্বেষণে ও জ্ঞানের আরাধনায়  বিশেষ মনোযোগ দিয়েছিল। হাউজ অফ উইজডমে মধ্যযুগীয়  মনীষীদের রচনাগুলি আরবী ভাষায় অনুদিত  করতে বিশেষ উৎসাহ দেওয়া হত। দর্শন, গণিত, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান এবং চিকিৎসা সম্পর্কিত প্রচুর গ্রীক এবং ভারতীয় সাহিত্য আরবি ভাষায় অনুদিত হয়েছিল। প্রখ্যাত আরব গণিতবিদ আল খোয়ারিজমি  ( Al Khwarizmi) (আনুমানিক ৭৮০-৮৫০) হাউজ অফ উইজডমে পড়াশোনা করেছিলেন এবং পরে এটির পরিচালক হয়েছিলেন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “কিতাব অ্যাল-জাবর ওয়া ল-মুকাবালা (Kitab al-jabr wa l-muqabala) থেকে আধুনিক বিশ্ব অ্যালজেবরা  শব্দটি পেয়েছে। বাগদাদের আদালত ব্রহ্মগুপ্তের বইটি উপহার পেয়েছিল এবং আল খোয়ারিজমি সেটির অনুবাদের তত্ত্বাবধান করেছিলেন। তিনি সংখ্যা এবং স্থানধারক হিসাবে শূন্যের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলেন। শূন্যকে তিনি বললেন   "সিফর" (sifr), আরবী ভাষায় যার অর্থ খালি। আরবীয় ও ভারতীয় জ্ঞান সংশ্লেষিত করে 8২৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি  “হিন্দু সংখ্যা নিয়ে গণনা” (On the Calculation with Hindu Numerals) শিরোনামে একটি বই প্রকাশ করেছিলেন।


চিত্র-৫। সংস্কৃত, আরবী এবং ইংরেজিতে দশমিক গণনা পদ্ধতির দশটি সংখ্যা সংস্কৃত, আরবী এবং ইংরেজিতে।

দ্বাদশ শতাব্দীতে আল খোয়ারিজমির “হিন্দু সংখ্যা নিয়ে গণনা” বইটি লাতিন ভাষায় অনুদিত হয় "আল-খোয়ারিজমি ভারতীয় সংখ্যার উপর" (al-Khwarizmi on the Numerals of the Indians) এই শিরোনামে, এবং ইউরোপে ভারতীয় শূন্যের ইউরোপ প্রবেশ ঘটে।  ইতালীয় গণিতবিদ লিওনার্দো ফিবোনাচি (আনুমানিক ১১৭০-১২৫০ খ্রীষ্টাব্দ), যিনি পিসার লিওনার্দো নামেও পরিচিত, ইউরোপে শূন্যের ব্যবহারকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। ফিবোনাচি অবশ্য নিচের পূর্ণসংখ্যা ক্রমটি (integer sequence ) প্রবর্তন করার জন্য বেশি পরিচিত,

      ০,১,১,২,৩,৫,৮,১৩,২১,৩৪,৫৫,………

এই পূর্ণসংখ্যা ক্রমটি ফিবোনাচি ক্রম বা ফিবোনাচি সিরিজ নামে পরিচিত, যেখানে ক্রমটির যে কোন সংখ্যা বা টার্ম পূর্ববর্তি দুইটি সংখ্যা বা টার্মের যোগফল।  

১২০২ সালে, ফিবোনাচি “গণনার বই” (Liber Abaci) শিরোনামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন। ইউরোপে শূন্যের ব্যবহার ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে বইটি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল। বইটি শুরু হয় এইভাবে,

“নয়টি ভারতীয় সংখ্যা হল: ৯, ৮, ৭, ৬, ৫, ৪, ৩, ২, এবং ১ । এই নয়টি সংখ্যা এবং ০ চিহ্ন, আরবরা যাকে ‘জেফির’ বলে, নীচে যে ভাবে প্রদর্শিত হয়েছে, যে কোন সংখ্যা সহজে লিখতে পারা যায়।"

ফিবোনাচির “গণনার বই” ইউরোপে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল এবং ১২২৮ সালে দ্বিতীয় সংস্করণটি প্রকাশিত হয়েছিল। ধীরে ধীরে ইউরোপীয়ানরা শূন্যকে একটি সংখ্যা এবং স্থানধারক হিসাবে গ্রহণ করলেন এবং  শূন্যর প্রতীক  "জেফির" ইংরেজী জিরোতে রূপান্তরিত হল।  ভারত থেকে আরব, আরব থেকে ইউরোপে দশমিক সংখ্যা কীভাবে বিবর্তিত হয়েছে তা চিত্র-৫-এ  দেখানো হয়েছে। ভারতীয় চিহ্নের অবশিষ্টাঙ্গ এখনও কয়েকটি ইউরোপীয় সংখ্যায়  দেখতে পাওয়া যায়। ইউরোপীয় ঋণাত্মক সংখ্যা  গ্রহণ করতে অবশ্য ইউরোপীয়ানরা অনেক বেশি সময় নিয়েছিলেন। ১৫-১৬  শতাব্দীতে ইউরোপীয়ানরা অনিচ্ছাকৃতভাবে ঋণাত্মক সংখ্যার ব্যবহার শুরু করে। ইংরেজ গণিতবিদ জন ওয়ালিস (১৬১৬-১৭০৩ খ্রীষ্টাব্দ) "সংখ্যা রেখা[4]" (Number line) ধারণাটির  প্রবর্তন করেন। এর পরেই ইউরোপীয়ানরা আন্তরিকভাবে ঋণাত্মক সংখ্যা  গ্রহণ করেছিলেন।  প্রসঙ্গক্রমে জন ওয়ালিস অসীম বা ইনফিনিটির বর্তমান চিহ্নটি  ( )দিয়েছিলেন।  চিহ্নটি একটি অশেষ বা অবিরত বক্ররেখার প্রতিনিধিত্ব করে।

 

 

 



[1] গণিত এবং পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা ফরাসি গণিতবিদ পিয়ের-সাইমন মারকুইস ডি ল্যাপলাসের (Pierre-Simon marquis de Laplace) (১৭৪৯-১৮২৭ খ্রীষ্টাব্দ) সাথে ভালভাবে পরিচিত। ল্যাপলাস রূপান্তর (Laplace   transform) Laplacian ল্যাপলাস ডিফারেনশিয়াল অপারেটর (Laplacian differential operator), গণিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। তিনি সম্ভাবনা তত্ত্বের (probability theory) সূচনা করেছিলেন। তিনিই প্রথম কৃষ্ণগহ্বরের (black hole) অস্তিত্বের কথা বলেছিলেন।  

 [2] আর্কিমিডিস, (আনুমানিক ২৯০-২১২/২১১ খ্রীষ্টপূর্ব) প্রাচীন গ্রীকের সর্বাধিক বিখ্যাত গণিতবিদ এবং উদ্ভাবক ছিলেন। তিনি আবিষ্কার করেছিলেন, লিভার, পুলি, স্ক্রু পাম্প, যুদ্ধের সরঞ্জাম ইত্যাদি। তবে তিনি তার নামে পরিচিত হাইড্রোস্ট্যাটিক নীতির (hydrostatic principle),    জন্য সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত।

 [3] পার্গার অ্যাপোলোনিয়াস (আনুমানিক ২৪০-১৯০ খ্রীস্টপূর্ব) একজন গ্রীক গণিতবিদ এবং জিওমিটার ছিলেন অ্যাপোলোনিয়াস 'কনিক সেকশনের (Conic sections)   উপর অনেক কাজ করেছিলেন এবং পরবর্তিকালে  টলেমি, কোপারনিকাস, নিউটন এবং অন্যান্যদের বিশেষ প্রভাবিত করেছিলেন।

 [4] গণিতে, সংখ্যা রেখা একটি অসীম প্রসারিত সরলরেখা যার প্রতিটি বিন্দুকে (পয়েন্ট) একটি বাস্তব সংখ্যার চিহ্নিত করা যায়। সরলরেখার যে কোনও বিন্দুকে শূন্যের সাথে চিহ্নিত করা যায়। তাহলে শূন্যের ডানদিকে বিন্দুগুলি হবে ধনাত্মক সংখ্যা আর বাম দিকের বিন্দুগুলি ঋণাত্মক সংখ্যা।

 

No comments:

Post a Comment