Sunday, 21 January 2018

বিজ্ঞানের নায়ক ─ নিকোলাস কোপারনিকাস





বিখ্যাত দার্শনিক থমাস কুন (Thomas Kuhn) বিজ্ঞান সম্বন্ধে বলেছিলেন যে দুই প্রকারের বিজ্ঞান হয়; সাধারণ বা নিত্য-নৈমত্তিক বিজ্ঞান এবং অসাধারণ বা বৈপ্লবিক বিজ্ঞান। যে কোন সময়েই প্রকৃতির বিভিন্ন বিষয়ে বিজ্ঞানীদের কিছু তত্ত্ব থাকে এবং সাধারণত বিজ্ঞানীরা সেই তত্ত্বের সীমার মধ্যে থেকেই তত্ত্বের ফাঁকফোকরগুলো পূরণ করবার চেষ্টায় ব্যস্ত থাকেন এবং সেটা হল সাধারণ বা নিত্যকার বিজ্ঞান। দৈবাত কখনো কোন বিজ্ঞানী নূতন কোন তত্ত্ব আবিষ্কার করেন যা কি না পুরনো তত্ত্বকে পুরোপুরি বদলে দেয়। সেটাই হয় অসাধারণ বা বৈপ্লবিক বিজ্ঞান। মানুষের ইতিহাসে অসাধারণ বা বৈপ্লবিক বিজ্ঞানের ঘটনা খুব কমই ঘটেছে। একটি বৈপ্লবিক বিজ্ঞানের ঘটনা ঘটেছিল আজ থেকে প্রায় ৫০০ বছর আগে এবং সেই বৈপ্লবিক বিজ্ঞানের হোতা ছিলেন, নিকোলাস কোপারনিকাস। 

১৯ ফেব্রুয়ারী ১৪৭৩ খ্রীষ্টাব্দে পোলান্ডের টরুন সহরে নিকোলাস কোপারনিকাস জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মিকোলাস ছিলেন পোলান্ডের রাজধানী ক্রাকো (Krakow) সহরের একজন তামার  ব্যবসায়ী, মাতা বারবারা ছিলেন গৃহবধূ। জন্মের সময় পিতার নামে তার নাম রাখা হয়েছিল মিকোলাস, কিন্তু, পরে তিনি বদলে করেন নিকোলাস। খুব অল্প বয়সেই কোপারনিকাসের পিতা ও মাতার মৃত্যু হয়। কোপারনিকাস ও তার তিন ভাইবোনের দায়িত্ত্ব নেন বারবারার ভাই লুকাস জেনরোদ। লুকাস জেনরাদ ছিলেন ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের এক জন পাদ্রী। তিনি ট্রুন সহরে কোপারনিকাসের প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির পরে কোপারনিকাস ক্রাকো বিশ্ববিদ্যালয়ে ল্যাটিন, ভূগোল, দর্শনশাস্ত্র, গণিত, জ্যোর্তিবিদ্যা অধ্যয়ন করেন। গণিতে তিনি বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেন, যে দক্ষতার পরিচয় আমরা পরবর্তি জীবনে তার জ্যোর্তিবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখতে পাই। ক্রাকো বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠক্রমের পর তিনি তার মামা ফাদার লুকাসের সহায়তায় টরুন সহরে, ক্যাথলিক চার্চের পাদ্রীর চাকরিতে যোগ দেন। পরে, মামা লুকাসের পরামর্শ অনুযায়ী, কোপারনিকাস, চার্চ থেকে ছুটি নিয়ে,  ইতালীর বোলোগনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্ত্তি হন ধর্মীয় আইন শিক্ষা করার জন্য। আইন শিক্ষা সমাপ্তির পর নিকোলাস  কোপারনিকাস  কোপারনিকাস পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্ত্তি হন চিকিৎসাবিদ্যা শিক্ষার জন্য। চিকিৎসাবিদ্যা শিক্ষা তিনি সম্পূর্ন করতে পারেন নি, ছুটি শেষ হওয়ার দরুন, শিক্ষা অসমাপ্ত রেখেই তাকে গীর্জার কাজে যোগ দিতে হয়।
বোলোগনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ডোমেনিক মারিয়া নোভারা জ্যোর্তিবিদ্যা শিক্ষা দিতেন। তার শিক্ষায় কোপারনিকাস জ্যোর্তিবিদ্যায় বিশেষভাবে আকৃষ্ট হন। সেই সময়ের জ্যোর্তিবিদ্যার পাঠ্যক্রম অনুযায়ী কোপারনিকাস শিখেছিলেন, পৃথিবী স্থির, এবং পৃথিবীকে কেন্দ্র করে আছে একাধিক স্ফটিকের গোলক, এবং সেই গোলকগুলিতে, পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে,  চাঁদ‌, বুধ, শুক্র, সুর্য্য, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি, এবং সবকিছুর বাইরের গোলকে আছে স্থির  তারার দল, স্থির কারন, গ্রহদের মত তারারা পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে না। গোলকগুলি স্ফটিকের হতেই হবে কারন পৃথিবী থেকে গ্রহ-তারাদের দেখতে পাওয়া যায়। বিশ্বব্রম্বান্ডের এই প্রতিরূপটি (model) দিয়েছিলেন প্রখ্যাত গ্রীক দার্শনিক এরিস্টটল (৩৮৪-৩২২ খ্রী।পূ।)। প্রতিরূপটি সবাইকে, বিশেষ করে তদানীন্তন ধর্মীয় সমাজকে খুশি করেছিল। বাইরের গোলকটিকে তারা স্থির করেছিলেন বিভিন্ন দেব-দেবতাদের বাসস্থান হিসাবে। এরিস্টটলের এই প্রতিরূপটি পরিচিত জিওসেন্ট্রিক মডেল বা ভূকেন্দ্রিক প্রতিরূপ নামে। এরিস্টটলের জিওসেন্ট্রিক মডেলটি ১-নং চিত্রে দেখান হয়েছে।



চিত্র ১। জিওসেন্ট্রিক বা ভূকেন্দ্রিক মডেলে সূর্য, পৃথিবী ও গ্রহদের অবস্থান।

এটা অবশ্য মনে রাখা উচিত যে কিছু গ্রীক দার্শনিক অন্য রকম চিন্তা করেছিলেন। দার্শনিক   ফিলোলাস (Philolaus) (৪৭০ খ্রী পূ ৪৭০-৩৮৫) ছিলেন গ্রীসের ক্রটন সহরের বাসিন্দা।  তিনি ছিলেন প্রখ্যাত গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিসের সমসাময়িক। ফিলোলাস একটি বিশ্বের প্রতিরূপ দিয়েছিলেন যেখানে এক বিশাল আগুনের গোলককে কেন্দ্র করে, দশটি সমকেন্দ্রিক বৃত্তে পাচটি গ্রহ, সূর্য, পৃথিবী, চাঁদ, স্থির তারামণ্ডলী এবং একটি রহস্য জনক বস্তু, ফিলোলাস যার নাম দিয়েছিলেন পাল্টা-পৃথিবী (counter-Earth) ঘুরছে। ফিলোলাস ছিলেন গ্রীক দার্শনিক পীথাগোরাসের শিষ্য এবং পীথাগোরাসের শিষ্যদের কাছে ১০ ছিল একটি পবিত্র সংখ্যা। ঘূরণীয়মানদের সংখ্যা ১০ করার জন্য ফিলোলাস তার প্রতিরূপে পাল্টা-পৃথিবী রেখেছিলেন। অনুরূপ একটি মডেল দিয়েছিলেন গ্রীক দার্শনিক  এরিষ্টাকাস (খ্রী পূ ৩১০-২৫০)।  এরিষ্টাকাস থাকতেন গ্রীসের সামোস সহরে।   তার মডেলে তিনি কেন্দ্রস্থলে অগ্নিগোলককের বদলে সূর্যকে বসিয়েছিলেন।

 গ্রীকরা অবশ্য এরিষ্টাকাসের সূর্য কেন্দ্রিক (Heliocentric) মডেল গ্রাহ্য করে নি, তারা এরিস্টটলের মডেলই বিশ্বাস করেছিল । প্রথমত, পৃথিবীর গতি তাদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ন ছিল না। আমরা যেমন পৃথিবীর গতি বুঝতে পারি না, সূর্যের গতিই লক্ষ করে থাকি, তেমনি গ্রীকরাও পৃথিবীর গতি বুঝতে পারত না, সূর্যের গতিই লক্ষ করত। দ্বিতীয়ত, এরিস্টটলের ভূকেন্দ্রিক মডেলে বিশ্বাসীরা তর্ক করেছিলেন যে, বিশ্ব  সূর্যকেন্দ্রিক হলে তারাদের উপর প্যারালাক্স প্রভাব দেখতে পাওয়া যেত, কিন্তু সেটা দেখতে পাওয়া যায় না। প্যারালাক্স হল পর্যবেক্ষকের অবস্থান পরিবর্তনের সাথে সাথে লক্ষস্থলের স্থান পরিবর্তন। সহজেই এটা বুঝতে পারা যায়। বাম চোখটি বন্ধ করে ডান চোখ দিয়ে দূরবর্তি কোন বস্তু লক্ষ করুন। এবার,  ডানহাতটি প্রসারিত করে, বুড়ো আঙ্গুলটি দূরবর্তি বস্তুটির সাথে একলাইনে আনুন। ডানচোখ বন্ধ করে বাঁ চোখ দিয়ে বস্তুটি দেখুন। বুড়ো আঙ্গুলের প্রেক্ষিতে দূরবর্তি বস্তুটি বাঁ দিকে সরে গিয়েছে। এটাই হল প্যারালাক্স প্রভাব। পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করলে, তারাদের উপর, ২ নং চিত্রে যেমন দেখান হয়েছে, প্যারালাক্স প্রভাব দেখা যেত।  ছয়মাস অন্তর অন্তর  তারাদের অবস্থান বদলে যেতযেহেতু সেটা হয় না সুতরাং, তারা যুক্তি দিয়েছিল যে পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে না। 


চিত্র ২। একটি তারার উপর প্যারালাক্স প্রভাব দেখান হয়েছে। পৃথিবীর A- অবস্থান থেকে তারাটিকে দেখা যাবে X-অবস্থানে। ছয়মাস পরে পৃথিবীর B- অবস্থান থেকে তারাটিকে দেখা যাবে Y- অবস্থানে।

এরিষ্টটলের জিওসেন্ট্রিক বা ভূকেন্দ্রিক মডেলের একটি গুরুতর সমস্যা ছিল। পৃথিবী থেকে গ্রহদের লক্ষ্য করলে একটি আশ্চর্য জিনিষ দেখা যায়, হঠাৎ করে গ্রহরা গতিপথ বদলায়। একটি গ্রহ পূবের দিকে যেতে যেতে হঠাৎ থেমে যায়, তারপর, গতিপথ বদলে উল্টোদিকে (পশ্চিম দিকে) যাওয়া শুরু করে, আবার থেমে গিয়ে, গতিপথ উল্টে পূবের দিকে যাওয়া শুরু করে।


চিত্র ৩। গ্রহদের বিপ্রতীপ গতি। কালো বিন্দুগুলো গ্রহর অবস্থান দেখাচ্ছে।

গ্রহদের এই গতিকে বলা হয় রেট্রোগ্রেড (retrograde) বা বিপ্রতীপ গতি। এরিস্টটলের জিওসেন্ট্রিক মডেলে  গ্রহদের এই বিপ্রতীপ গতি ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয় না, গ্রহরা ক্রমাগত একই দিকে ঘুরতে থাকে। মিসরীয় গাণিতিক ও জ্যোর্তিবিদ ক্লডিয়াস টলেমী (৯০-১৬৮ খ্রীষ্টাব্দ) গ্রহদের বিপরীতমুখী গতি ব্যাখ্যা করার জন্য এরিস্টটলের জিওসেন্ট্রিক মডেলের কিছু উন্নতি করেন.৪ নং চিত্রে যেমন  দেখান হয়েছে, টলেমীর এই উন্নত মডেলে, প্রতিটি গ্রহ একটি ছোট বৃত্তে (যার নাম দিলেন এপিসাইকল (epicycle) )  ঘুরছে।   এপিসাইকলটি আরও বড় একটি বৃত্তে (যার নাম দিলেন ডেফারেন্ট (deferent)), পৃথিবীকে প্রদক্ষিন করছে। পৃথিবী কিন্তু    ডেফারেন্টের কেন্দ্র নয়। ডেফারেন্টের কেন্দ্র হল পৃথিবী ও ইকোয়ান্ট (equant) বলে একটি কাল্পনিক বিন্দুর মধ্যবিন্দু। পাঠক একটু চিন্তা করলে বুঝতে পারবেন যে টলেমীর এই প্রতিরূপে  পৃথিবীর প্রেক্ষিতে গ্রহটির গতিপথ উল্টে যাবে এবং রেট্রোগ্রেড গতির ব্যাখ্যা করা সম্ভব হবে। টলেমীর এই মডেলটি এতই ভালো হয়েছিল যে   ১৬’শ শতাব্দী পর্যন্ত এর কোন বিকল্প ছিল না।

চিত্র ৪। বিপ্রতীপ গতি ব্যাখ্যা করার জন্য টলেমীর মডেল।

গ্রহদের গাতিবিথির সাথে তার মডেলটিকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার জন্য টলেমী কাল্পনিক বিন্দু ইকোয়ান্ট  ব্যবহার করতে  বাধ্য হয়েছিলেন কিন্তু, তিনি এর জন্য অসন্তুষ্ট  ছিলেন। পৃথিবীকে কেন্দ্র করে গ্রহদের  বৃত্তাকার গতি ছিল গ্রীকদের কাছে একটি পবিত্র ব্যাপার, ইকোয়ান্ট  ব্যবহারে সেই পবিত্র ব্যাপার লঙ্ঘন হয়েছিল।
ইকোয়ান্ট ব্যবহার কোপারনিকাসেরও পচ্ছন্দ হয়নি। মারিয়া নোভারার কাছে তিনি জেনেছিলেন   ফিলোলাসের মডেলের কথা  ফিলোলাসের মডেলে, পৃথিবী একটি  আগুনের গোলককে প্রদক্ষিণ করেকোপারনিকাস এরিষ্টাকাসের কথা, যিনি প্রথমে সূর্যকে বিশ্বের কেন্দ্রস্থলে বসিয়েছিলেন, জানতেন কি না জানা নাই। তার বইতে ফিলোলাসের উল্লেখ আছে, কিন্তু এরিষ্টাকাসের কোন উল্লেখ নাই।


চিত্র ৫। কোপারনিকাসের মডেলে গ্রহদের অবস্থান।

কোপারনিকাসের মনে হল, হয়তো বা সূর্যকেন্দ্রিক মডেলে কাল্পনিক বিন্দু ইকোয়ান্ট ব্যবহার প্রয়োজন হবে না। ফিলোলাসের মডেলটি ছিল নেহাতই একটি মানসিক পরিকল্পনা, গ্রহদের গতি বিধির সাথে কোন সম্পর্ক ছিল না। তিনি বুঝতে পারলেন, সূর্যকেন্দ্রিক মডেলকে গ্রহণযোগ্য হতে হলে গ্রহদের গতিবিধির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। তার মডেলকে গ্রহদের বর্তমান ও ভবিষ্যত গতিবিধি নিখুঁত ভাবে গণনা করতে হবে। গীর্জা থেকে কিছু চুন, পাথর নিয়ে কোপারনিকাস একটি ছোট পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র বানিয়ে, অল্প কিছু জ্যোতির্বিদ্যার যন্ত্র নিয়ে, ধৈর্যর সাথে আকাশের গ্রহ-তারাদের পর্যবেক্ষন করতে লাগলেন।  তার পর্যবেক্ষণ থেকে তিনি উপলব্ধি করেন যে পৃথিবীর পরিবর্তে যদি সূর্য মহাবিশ্বের কেন্দ্রস্থল হয়, তাহলে কাল্পনিক বিন্দু ইকোয়ান্টের দরকার হয় না।  কোপারনিকাস জানতেন রোমান ক্যাথলিক চার্চের কর্তৃপক্ষ  সূর্যকেন্দ্রিক   মডেলটি পছন্দ করবেন না। ১৫১৪ খ্রীষ্টাব্দে, কোপারনিকাস,  বেনামে, “ক্ষুদ্র ভাষ্য (Little Commentary)” নামে একটি হাতে লেখা পুস্তিকা প্রকাশ করেন এবং কিছু বন্ধুকে বিতরণ করেন। কোপারনিকাসএর মডেলটি সাতটি “স্বয়ংসিদ্ধ সত্যর  (axioms)” উপর ভিত্তি করে ছিল;

১। বিশ্বের সমস্ত গ্রহদের কক্ষপথের জন্য কোন একক কেন্দ্র নেই।
২। পৃথিবীর কেন্দ্রটি মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়,  কেবলমাত্র চন্দ্রের কক্ষপথের কেন্দ্র।
৩। মহাবিশ্বের কেন্দ্র সূর্যের কাছাকাছি।
৪। পৃথিবী থেকে তারাদের দূরত্ব পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্বের  তুলনায় অনেক অনেক বেশি।
৫। নক্ষত্রগুলির আপাত দৈনিক ঘূর্ণন পৃথিবীর দৈনিক ঘূর্ণনের  জন্য। তারারা নিজেরা স্থিতিশীল।
৬। পৃথিবী বছরে একবার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে।  আপাত দৃশ্যমান সৌর গতি পৃথিবীর ঘূর্ণনের জন্যই। সূর্য নিজে স্থিতিশীল।
 ৭। গ্রহদের বিপরীতমুখী গতি সূর্যের চারিপাশে পৃথিবীর গতির কারণে ঘটে।


চিত্র ৬। কোপারনিকাসের মডেলে বিপ্রতীপ গতির ব্যাখ্যা।

চতুর্থ, পঞ্চম এবং ষষ্ঠ স্বয়ংসিদ্ধ সত্যগুলো হল  সূর্যকেন্দ্রিক  এবং ভূকেন্দ্রিক প্রতিরূপের মধ্যেকার  মৌলিক পার্থক্য। চার নম্বর সূত্রে কোপারনিকাস সূর্যকেন্দ্রিক প্রতিরূপে প্যারালাক্স প্রভাব না দেখবার কারণ ব্যাখ্যা করলেন। দূরত্ব বাড়লে প্যারালাক্স প্রভাব কমে,  কোপারনিকাস তারাদের পৃথিবী থেকে বহু  বহুদূরে পাঠিয়ে প্যারালাক্স প্রভাব ভীষন ভাবে কমিয়ে দিলেন। পাঁচ নম্বর সূত্রে তিনি বললেন পৃথিবী ঘুরছে। ছয় নম্বর সুত্রে বললেন সূর্য স্থির কিন্তু গতিশীল মনে হয় পৃথিবীর গতির জন্য, পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে। এটা লক্ষ্যনীয় যে কোপারনিকাস সূর্যকে বিশ্বের কেন্দ্রে স্থাপন করেন নি। কোপারনিকাস ক্যাথলিক গীর্জার প্রতিক্রিয়া নিয়ে যথেষ্ট চিন্তিত ছিলেন। তিনি নিজেও ছিলেন ধর্মভীরু। বাইবেলে আছে পৃথিবী স্থির। তাই কোপারনিকাস তার পর্যবেক্ষণ প্রকৃতির সত্য হিসাবে উপস্থাপন না করে, একটি মডেল হিসাবে উপস্থাপন করেছিলেন। সাত নম্বর সূত্রে কোপারনিকাস বললেন যে গ্রহদের বিপ্রতীপ গতি সূর্যের চারিপাশে পৃথিবীর ঘূর্ণনের কারণে ঘটে।  সূর্যকেন্দ্রিক মডেলে গ্রহদের বিপ্রতীপ গতি সহজেই ব্যাখ্যা করা যায়। ৬ নং চিত্রতে সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথবী ও একটি গ্রহের ক্রমবর্ধমান অবস্থানগুলি দেখানো হয়েছে। পৃথিবী নিজের কক্ষপথটি গ্রহটির চেয়ে দ্রুতগতিতে সমাপ্ত করলে একসময় পৃথিবী থেকে গ্রহটিকে উল্টোদিকে যেতে দেখা যাবে।

কোপারনিকাসের দ্বিতীয় বই “স্বর্গীয় গোলকের  আবর্তনের উপর (On the revolution of the celestial spheres)” প্রকাশিত হয় ১৫৪৩ খ্রীষ্টাব্দে, তখন তিনি মৃত্যু শয্যায়।  বইটি প্রকাশিত হয় এপ্রিল মাসে, এবং কোপারনিকাস মারা যান ২৪ মে, ১৫৪৩। কোপারনিকাস ইচ্ছে করেই বইটির প্রকাশনায় বিলম্ব করেছিলেন। তার সূর্যকেন্দ্রিক বিশ্বের প্রতিরূপ তদানীন্তন ক্যাথলিক গীর্জার মতের বিরুদ্ধে যাচ্ছে, এতে তিনি খুবই দুঃখিত ছিলেন। তার মনের অশান্তির প্রতিফলন পাওয়া যায় বইটির মুখবন্ধে। মুখবন্ধ থেকে কিছু অংশ নিচে উধৃত করছি,

“পবিত্র পিতা, আমি সহজেই কল্পনা করতে পারি, যেই মাত্র কিছু লোক এই বইটির  কথা জানবে, জানবে আমি স্বর্গীয় গোলকদের আর্বতনের কথা লিখেছি, জানবে আমি পৃথিবীর গতির কথা বলেছি,  তারা চিৎকার করবে আমাকে এবং আমার মতবাদকে পরিত্যাগ করবার জন্য। আমি নিজের মতবাদের উপর এত আসক্ত নই যে অন্যদের মতবাদ পুরোপুরি অগ্রাহ্য করব। কিন্তু, আমি সচেতন যে একটি দার্শনিক মতবাদ সাধারণ ব্যক্তিদের রায় সাপেক্ষে নয়। একজন দার্শনিকের প্রচেষ্টা হল, ঈশ্বর যতটা  অনুমোদন করেন, সত্যকে প্রতিষ্টা করা। আমি এও নিশ্চিত যে পুরোপুরি  ভ্রান্ত ধারনা পরিত্যাগ করা উচিত। পৃথিবী স্বর্গের মাঝখানে স্থিতিশীল আছে,  যারা বহু শতাব্দীর এই ঐক্যমতে বিশ্বাসী, আমার বিপরীত মত, পৃথিবী গতিশীল, ভ্রান্ত ও পাগলের প্রলাপ মনে করবেন। তাই আমি পৃথিবীর গতি প্রমাণ করার জন্য যে বইটা লিখেছি সেটার প্রকাশনা নিয়্‌ দীর্ঘদিন ধরে, অনেক চিন্তাভাবনা, বিতর্ক করেছি।“

প্রচুর চিন্তাভাবনা করে কোপারনিকাস বইটি প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেন। বইটি তিনি ক্যাথলিক গীর্জার প্রধান, পোপ তৃতীয় পলকে    বইটি উৎসর্গ  করেছিলেন। সম্ভবত আশা করেছিলেন পোপকে উৎসর্গ করলে, পোপ ও চার্চ বইটির বিরোধিতা করবেন না। কিন্তু তা হয়নি। কোপারনিকাস ক্যাথলিক গীর্জার সম্মানীয় যাজক ছিলেন। চার্চের উচ্চপদস্থ কর্মচারী, নিকোলাস সোয়েবার্গ (Nicholas Schoeberg) বইটি প্রকাশনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন, ব্যয়ভারও বহন করেছিলেন। এইসব কারণেই হয়তো প্রথম কিছুদিন চার্চ কোন পদক্ষেপ নেয়নি। কিন্তু, শীঘ্রই ক্যাথলিক চার্চের উপর  প্রোটেস্টান্ট সংস্কারীদের চাপ এলো। প্রোটেস্টান্ট সংস্কারের মুখ্য প্রবক্তা, মার্টিন লুথার, কোপারনিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক মডেলের বিরোধিতা করলেন। অবশ্য, কোপারনিকাসের মতবাদ বিশ্বাস করা সহজ ছিল না। আমরা বহুদিন ধরে  এই মতের সঙ্গে পরিচিত বলে বিস্মিত হইনা, কিন্তু ভেবে দেখলে বিস্মিত  হওয়ারই কথা। বিষুবরেখা বরাবর পৃথিবীর পরিধি হল ৪০০৭৫ কিলোমিটার। বিষুবরেখায় অবস্থিত যে কোন জায়গা, পৃথিবীর দৈনিক ঘূর্ণনের কারনে, ঘণ্টায় ১৬৭০ কিলোমিটার বেগে পাক খাচ্ছে, এটা বিশ্বাস করা খুব সহজ নয়।  আরও কঠিন বিশ্বাস করা পৃথিবীর সূর্যকে প্রদক্ষিণ। পৃথিবী এবং সূর্যের মধ্যকার গড় দূরত্ব হল ১৪৯৫৯৭৮৯০ কিলোমিটার। এক বছরে পৃথিবী ২*৩.১৪* ১৪৯৫৯৭৮৯০=৯৩৯,৯৫০,৪৭০ কিলোমিটার ভ্রমণ করে। এক বছরে আছে 8760 ঘন্টা। পৃথিবী ঘন্টায় ১০৭৩০০ কিলোমিটার বেগে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে। কল্পনা করুন তো আমাদের পৃথিবী, বাড়িঘর, গাছপালা, পাহাড় পর্বত, নদী সমুদ্র, বাতাস নিয়ে, ঘণ্টায় ১৬৭০ কিলোমিটার বেগে বনবন করে ঘুরছে, এবং একই সাথে, ঘণ্টায় ১০৭৩০০ কিলোমিটার বেগে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে। আজও এটা বিশ্বাস হতে চায় না। আজ থেকে কয়েক শতাব্দী আগে পৃথিবীর গতি বিশ্বাস করা নিতান্তই কঠিন ছিল।  মার্টিন লুথার তাই কোপারনিকাসকে উপহাস করেছিলেন,

“এই বোকা (কোপারনিকাস) সমস্ত জ্যোতির্বিজ্ঞানকে উল্টে দিতে চায়। কিন্তু শাস্ত্রে (বাইবেল) আছে যে যোশূয়া সূর্যকে স্থির রাখতে আদেশ দিয়েছেন, পৃথিবীকে নয়।"

প্রটেষ্টান্টদের চাপে, ক্যাথলিক চার্চ ১৬১৬ খ্রীষ্টাব্দে কোপারনিকাসের বই নিষিদ্ধ করে। ২০০ বছরের উপর এই নিষেধাজ্ঞা  বহাল ছিল। ১৮৩৫ খ্রীষ্টাব্দে নিষেধাজ্ঞা  উত্তোলন করা হয়।


বি.দ্র. চিত্রে ব্যবহৃত ইংরেজী শব্দগুলো বাংলা করতে পারিনি বলে দুঃখিত।