১৬৭৬ সালে স্যার
আইজাক নিউটন রবার্ট হুককে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন,
“যদি আমি কিছু বেশি দেখে থাকি, তবে সেই দেখা হয়েছে দৈত্যদের কাঁধে দাঁড়িয়ে।“
(If I have seen farther, it is by standing on the shoulders of giants.)
(If I have seen farther, it is by standing on the shoulders of giants.)
নিউটন যেসকল অতিমানব
বা দৈত্যদের কথা ভেবেছিলেন, জোহানেস
কেপলার তাদের অন্যতম। কোপারনিকাসের
সূর্যকেন্দ্রিক বিশ্ব
প্রতিরূপটি টলেমীর
প্রতিরূপের চেয়ে অনেকগুন ভালো হলেও সেটি সঠিক ছিল না। মডেলটি সঠিক না
হওয়ায়, দীর্ঘ সময় ধরে
গ্রহদের অবস্থানের
সঠিক ভবিষ্যদ্বাণী দিতে পারত না।
তখনকার প্রথামত, ঘন ঘন গ্রহদের
অবস্থার পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন
হত। প্রায় এক’শ
বছর পরে, সঠিক
মডেলটি দেন জার্মান
গণিতজ্ঞ ও জ্যোর্তিবিদ
জোহানেস কেপলার
(২৭ ডিসেম্বর
১৫৭১-১৫ নভেম্বর
১৬৩০)। গ্রহদের বৃত্তাকার গতি, এরিষ্টটলের এই মতবাদে বিশ্বাসী প্রাচীন বিজ্ঞানীরা, বৃত্তাকার গতির বাইরে কিছু ভাবতে পারতেন না। নিকোলাস কোপারনিকাসের মডেলেও তাই গ্রহরা
সূর্যকে বৃত্তাকারেই প্রদক্ষিণ করত। চিন্তা জগতে বিপ্লব ঘটিয়ে জোহানেস
কেপলার প্রথম গ্রহদের উপবৃত্তাকার কক্ষে স্থাপন করে সৌরজগতের সঠিক মডেল
দিয়েছিলেন।
জোহানেস কেপলার
জন্মগ্রহণ করেন একটি অভিজাত কিন্তু দরিদ্র
জার্মান প্রটেষ্টান্ট
পরিবারে। পিতা হাইনরিখ কেপলার (Heinrich
Kepler) ভাড়াটে সৈন্য হিসাবে কাজ করতেন। কেপলারের পাঁচ বছর বয়সে যুদ্ধে যান, এবং
খুব সম্ভবত হলান্ডে মারা যায়। মাতা
ক্যাথরিনা গুল্ডেনমান (Katharina Guldenmann ) ছিলেন এক সরাইমালিকের কন্যা। কেপলার তার মায়ের সাথে পিতামহের বাসায় বসবাস করতেন
এবং সরাই খানার নানাবিধ কাজে
সাহায্য করতেন। অকালে জন্মগ্রহণ করার জন্য কেপলার কখনই সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন না, কিন্তু তিনি অত্যন্ত
মেধাবী ছিলেন, বিশেষ করে গণিতে তার
দক্ষতা ছিল অসাধারণ। অনেক সময়ই গণিতের পারদর্শিতা দেখিয়ে, সরাইখানার যাত্রীদের অবাক করে দিতেন।
খুব ছোটবেলাতেই কেপলার জ্যোর্তিবিজ্ঞানে আকৃষ্ট হন।
১৫৭৭ খ্রীষ্টাব্দে,
ইউরোপের আকাশে
একটি ধূমকেতু
দেখা দেয়।
লক্ষ লক্ষ ইউরোপীবাসীর
সঙ্গে কেপলারও সেই অবিস্মরণীয়
দৃশ্য দেখেন এবং
জ্যোর্তিবিজ্ঞানের প্রেমে পড়েন। ১৫৮০ খ্রীষ্টাব্দের
চন্দ্রগ্রহণের দৃশ্যে
সেই প্রেম
আরও গাঢ় হয়। কেপলারের প্রাথমিক শিক্ষা হয় স্থানীয় এক স্কুলে। মেধাবী
কেপলার টুবিনজেন (Tuebingen)
বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তি পান। বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি গণিত, জ্যোর্তিবিদ্যা, ধর্মশাস্ত্র এবং দর্শন অধ্যয়ন করেন। সেইসময় বিশ্ববিদ্যালয়ে কোপারনিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক মডেলের শিক্ষা নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু, টুবিনজেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক
শিক্ষক, মাইকেল ময়েস্টিলিন (Michael Maestlin) কোপারনিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক মডেলে বিশ্বাস করতেন এবং তার প্রিয় ছাত্র কেপলারকে টলেমীর ভূকেন্দ্রিক এবং কোপারনিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক, উভয় মডেলেরই শিক্ষা দিয়েছিলেন। কেপলার উপলব্ধি করেছিলেন যে কোপেরিকাসের মডেলই সঠিক। কোপারনিকাস তার মডেলটি অনুমান করেছিলেন মাত্র, তার অনুমালের কোন গাণিতিক ভিত্তি বা
যথাযথ প্রমাণ দিতে পারেন নি। কোপারনিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক মডেলটির যথাযথ প্রমাণই কেপলার তার জীবনের লক্ষ্য করেন।
কেপলার ধর্মভীরু খ্রীষ্টান ছিলেন, এবং সেই সময়ের প্রথামত আশা করেছিলেন
শিক্ষা সমাপ্তির পর তিনি গীর্জার ধর্মযাজক হবেন। কিন্তু, একটি ছাত্র বিতর্কে সূর্যকেন্দ্রিক
মডেলের পক্ষে যুক্তি দেওয়ায় গীর্জার
কর্তৃপক্ষের মধ্যে তার সম্বন্ধে সন্দেহের
উদ্রেক হয়, তিনি যথেষ্ঠ গোঁড়া খ্রীষ্টান কি না। শিক্ষাসমাপ্তির
পর বাধ্য হয়ে কেপলার
অস্ট্রিয়ার গ্রাজ
(Graz)
শহরে শিক্ষকতার
চাকুরী গ্রহণ
করেন। ১৫৯৭ খ্রীষ্টাব্দে, কেপলার এক কল-মালিকের মেয়ে বারবারা মূয়েলারকে বিয়ে
করেন। প্রধানত দারিত্রতার কারনে বারবারার
সাথে কেপলারের বিবাহিত জীবন খুব সুখের হয়নি। ১৬১১-তে বারবারার মৃত্যুর পর, ১৬১৩-তে
কেপলার দ্বিতীয় বিবাহ করেন সুশানা
রাট্টিঙ্গারকে (Susanna Reuttinger)। দ্বিতীয় বিবাহ অপেক্ষাকৃত সুখের হয়েছিল।
চিত্র-১।
নিয়মিত বহুভুজের কিছু নমুনা।
সেই সময়ে ছয়টি গ্রহ জানা ছিল; বুধ, শুক্র, পৃথিবী, মঙ্গল, বৃহষ্পতি, ও শনি।
জ্যোর্তিবিদ্যা শিক্ষার
শুরু থেকেই
কেপলারের মনে প্রশ্ন
ছিল, গ্রহদের
সংখ্যা ছয় কেন?
কেন দশ, বারো
বা একশ নয়?
শিক্ষক হিসাবে
কেপলারকে নানা বিষয়
পড়াতে হত।
একদিন তিনি ছাত্রদের
নিয়মিত বহুভুজ
(regular polygons) পড়াচ্ছিলেন। বহুভুজ
হল তিন বা
ততোধিক বাহুতে
(সরলরেখায়) আবিষ্ট
সমতলীয় চিত্র। বাহুগুলো সমদৈর্ঘীয়
হলে তাদের
নিয়মিত বহুভুজ
বলা হয়।
নিয়মিত বহুভুজের
কিছু উদাহরণ
(সমবাহু ত্রিভুজ,
বর্গক্ষেত্র, সমবাহু
পঞ্চভূজ ইত্যাদি)
১-নং চিত্রে
দেখান হয়েছে।
ছাত্রদের নিয়মিত
বহুভুজ পড়াতে
গিয়ে হঠাৎই কেপলার
উপলব্ধ করলেন
যে প্রতিটি
বহুভুজ একটি অন্তবৃর্ত্ত
এবং একটি বহিবৃর্ত্ত
দ্বারা আবিষ্ট
থাকে এবং তাদের
মধ্যে একটি নির্দিষ্ট
অনুপাত আছে।
উদাহরণ স্বরূপ
২-নং চিত্রে
একটি সমবাহু
ত্রিভূজ এবং তাকে কেন্দ্র
করে আঁকা অন্তবৃর্ত্ত
ও বহিবৃর্ত্ত
দেখান হয়েছে।
সমবাহু ত্রিভূজে
তিনটি কোনই সমান, প্রতিটিই
৬০০ (ত্রিভূজের তিনটি
কোনের যোগফল
১৮০০)। চিত্রে যেমন
দেখান হয়েছে,
জ্যামিতির সাহায্যে সহজেই প্রমান করা যায় OCD
একটি সমকোণী
ত্রিভূজ (অন্তর্বৃত্তের ব্যাসার্ধ
ত্রিভূজের বাহুর
উপর একটি লম্ব)।
আমরা লিখতে পারি, অন্তবৃর্ত্ত এবং
একটি বহিবৃর্ত্তের
ব্যাসার্ধের অনুপাত,
OD/OC= Sin q= Sin 30o=1/2.
উল্লেখ্য ব্যাপার এই
যে, এই
অনুপাত ত্রিভূজের
আয়তনের উপর নির্ভরশীল
নয়। ছোট বা
বড়, যে আকারেরই
ত্রিভূজ হোক না
কেন, অন্তবৃর্ত্তের ব্যাসার্ধ
এবং বহিবৃর্ত্তের
ব্যাসার্ধের অনুপাত
১/২।
একই ভাবে, বর্গক্ষেত্রের
জন্য, অন্তবৃর্ত্ত
এবং বহিবৃর্ত্তের
ব্যাসার্ধের অনুপাত
একটি নির্দিষ্ট
সংখ্যা, ০.৭০৭১ । প্রকৃতপক্ষে, একটি সাধারণ ফলাফল প্রমাণ করা যায় যে একটি N- বাহুযুক্ত নিয়মিত বহুভুজের জন্য, অন্তবৃর্ত্ত এবং বহিবৃর্ত্তের
ব্যাসার্ধের অনুপাত
Cos (p/N)।
চিত্র ২।একটি
ত্রিভূজকে কেন্দ্র করে অন্তবৃর্ত্ত এবং
বহিবৃর্ত্ত দেখান হয়েছে।
কেপলার লক্ষ করেলেন যে, শনি গ্রহ ও বৃহষ্পতি
গ্রহের কক্ষপথের অনুপাত
এবং
একটি
ত্রিভুজের অন্তবৃর্ত্ত এবং বহিবৃর্ত্তের
ব্যাসার্ধের
অনুপাত
সমান। কেপলার
বিশ্বাস করতে পারেন নি যে এই মিল
একটি
কাকতালিয়
ঘটনা
বরং
তিনি
ভেবেছিলেন
যে
এই
মিল বিশ্ব-ব্রম্বাণ্ডের জ্যামিতিক
ভিত্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে। তিনি চিন্তা করলেন যে শনি ও বৃহষ্পতি (বাইরের
দিক
থেকে)
প্রথম
দুটি
গ্রহ, তারা
সরলতম
বহুভুজ, ত্রিভুজের অন্তবৃর্ত্ত
এবং
বহিবৃর্ত্তে
সূর্যকে
প্রদক্ষিণ
করে। সেই নিয়ম মেনে বৃহষ্পতি
ও
মঙ্গল
গ্রহের
কক্ষপথের
অনুপাত
একটি
বর্গভূজের অন্তবৃর্ত্ত
এবং
বহিবৃর্ত্তের
ব্যাসার্ধের
অনুপাতের
সমান
হওয়া
উচিত। কিন্তু,
কেপলারের
এই
চিন্তা
ভূল
প্রমানিত
হল। একটি বর্গভূজের অন্তবৃর্ত্ত
এবং
বহিবৃর্ত্তের
ব্যাসার্ধের
অনুপাত ০.৭০৭১ বৃহষ্পতি ও মঙ্গল গ্রহের
কক্ষপথের
অনুপাতের (০.০৫) চাইতে, অনেক অনেক বেশি।
কেপলার
নানা
ভাবে
চেষ্টা
করলেন, গ্রহদের পর্যবেক্ষণ সম্বন্ধীয়
তথ্যগুলি
তার
বিশ্ব-ব্রম্বাণ্ডের
জ্যামিতিক
মডেলের
সাথে
মেলাবার, কিন্তু পারলেন
না। যখন তিনি হতাশ, তখন তার একটি
অনুপ্রেরণা এল। নিয়মিত
বহুভূজ হলো দ্বিমাত্রিক
সমতলীয়
চিত্র। কিন্তু
বিশ্ব
তো
দ্বিমাত্রিক
নয়,
বিশ্ব
হলো ত্রিমাত্রিক। বহুদিন ধরেই
দ্বিমাত্রিক
নিয়মিত
বহুভূজের ত্রিমাত্রিক
উপমা
জানা
ছিল। এদের
বলা
হয়
প্ল্যাটনিক
ঘন (Platonic solids)।
গ্রীক
দার্শনিক
প্লেটো
প্রথম
এদের
সম্বন্ধে
আলোচনা
করেন, তাই এদের এই নাম। প্ল্যাটনিক
ঘন
হলো
একটি
বহুতলীয়
ঘন যার
প্রতিটি
মুখ
একই
আকারের
নিয়মিত
বহুভূজ। একটি নিয়মিত
বহুভূজকে
কেন্দ্র
করে
যেমন
একটি
অন্তবৃর্ত্ত
ও
একটি
বহিবৃর্ত্ত
আঁকা
যায়,
একটি
প্ল্যাটনিক
ঘনকে
কেন্দ্র
করেও
একটি
অন্তর্গোলক
ও
একটি
বহির্গোলক
আঁকা
যায়,
এবং
তাদের
ব্যাসার্ধের
অনুপাত
একটি
নির্দিষ্ট
সংখ্যা, প্ল্যাটনিক ঘনকের আয়তন নিরপেক্ষ।
আর
মজার
ব্যাপার
হলো,৩-নং চিত্রে
যেমন
দেখান
হয়েছে, প্ল্যাটনিক ঘন কেবলমাত্র পাঁচ প্রকারের
হতে
পারে, অক্ট্যাহেড্রন, আইকোসাহেড্রন, ডোডেকাহেড্রন,
টেট্রাহেড্রন, ও ঘন। কেপলারের
কাছে
ব্যাপারটা
আকর্ষণীয়
মনে
হলো;
ছয়টি
গ্রহের
মধ্যবর্তি
পাঁচটি
স্থান
পাঁচটি
প্ল্যাটনিক
ঘন
অধিকার
করতে
পারবে।
চিত্র-৩। পাঁচ
প্রকারের
প্ল্যাটনিক
ঘন।
অনেক চেষ্টার পরে কেপলার
পাঁচটি প্ল্যাটনিক
ঘনকের সঠিক পর্যায়, অক্ট্যাহেড্রন, আইকোসাহেড্রন, ডোডেকাহেড্রন,
টেট্রাহেড্রন, ও ঘনক্ষেত্র, বের
করতে পারলেন।
প্ল্যাটনিক
ঘনক গুলোকে
এই পর্যায়ে
বসালে, তাদের
মধ্যবর্তি স্থানে
বুধ, শুক্র,
পৃথিবী, মঙ্গল,
বৃহষ্পতি ও শণি
গ্রহকে বসানো
যায়, আর আশ্চর্যজনকভাবে,
গ্রহগুলির গতিপথের
অনুপাত, প্ল্যাটনিক
ঘনকগুলিকে কেন্দ্র
করে আঁকা অন্তর্গোলক
ও বহির্গোলকের
অনুপাতের সাথে মিলে
যায়। ১৫৯৬ খ্রীষ্টাব্দে,
কেপলার “মহাবিশ্ববিবরণের
রহস্য (Mysterium Cosmographicum)”
বইতে তার তত্ত্বানুসন্ধানের
ফল প্রকাশ
করলেন। প্ল্যাটনিক
ঘনক ভিত্তি
করে কেপলারের
সূর্যকেন্দ্রিক
মডেলটি ৪-নং চিত্রে
দেখান হয়েছে।
চিত্র-৪। প্ল্যাটনিক
ঘন দিয়ে বানানো কেপলারের সূর্যকেন্দ্রিক বিশ্বের
মডেল।
বর্তমানে আমরা জানি গ্রহদের গতিবিধি সূর্যের মহাকর্ষক শক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কেপলারের সময় এই তথ্য জানা ছিল না। কেপলারই প্রথম এই দিকে পদক্ষেপ নেন।
বইটির প্রথম সংস্করণে কেপলার সূর্যের মর্টিচেম আনিমাম (motricem animam) বা চলন্ত
আত্মার কথা বললেন। অ্যারিস্টটল মর্টিচেম
আনিমাম (motricem animam) একটি জীবন্ত জিনিসের "আত্মা"
বা প্রাণ সম্বন্ধে ব্যবহার করেছিলেন, যে আত্মা জীবন্ত জিনিসটিকে তার নিজের কাজ
করতে সক্ষ্মম করায়, যেমন একটি উদ্ভিদকে বৃদ্ধি করায়, একটি কুকুরকে চলতে সক্ষম
করায়, ইত্যাদি। সেই একই ধারায় কেপলার মনে
করলেন সূর্যেরও আত্মা বা প্রান আছে, যা গ্রহদের চালায়। বইটির দ্বিতীয় সংস্করণে
কেপলার বর্তমান ধারনার আরও কাছাকাছি এলেন, বললেন, একটি শক্তি, যা দৈহিক কিন্তু অলীক
(corporeal
but immaterial) সূর্য থেকে নির্গত হয় এবং সেই
শক্তিই গ্রহদের চালনা করে।
“মহাবিশ্ববিবরণের রহস্য” কেপলারকে
একজন সম্মানিত জ্যোতির্বিদ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করল। কিন্তু, কেপলার একটি ভূল সমস্যা
নিয়ে চিন্তা করছিলেন। আমরা জানি গ্রহদের সংখ্যা ছয়ের চাইতে বেশি এবং তারা সূর্য
থেকে কতদূরে থাকবে তার কোন জ্যামিতিক কারন নেই।
জ্যোতির্বিজ্ঞানে তার প্রধান অবদান আরও কয়েক বছর পরে এসেছিল। কেপলার ছিলেন প্রটেস্ট্যান্ট গোষ্টির খ্রীষ্টান। ১৬০০ খ্রীস্টাব্দে
তার ধর্মীয় বিশ্বাসের জন্য কেপলার গ্র্যাজ ছাড়তে বাধ্য হন। তিনি প্রাগ সহরে আসেন।
তৎকালীন বিখ্যাত, ড্যানিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী টাইকো
ব্রাহে (Tycho Brahe) (১৪ ডিসেম্বর ১৫৪৬-২৪ অক্টোবর
১৬০১) প্রাগে থাকতেন। তিনি ছিলেন ড্যানিশ
সম্রাট রুডলফের রাজগনিতবিদ। ব্রাহে কেপলারকে তার
সহকারীর কাজে নিযুক্ত করেন। অভিজাত বংশীয় টাইকো ব্রাহের জীবনযাত্রা ছিল চমকপ্রদ। তার বয়স যখন দুই, তার
কাকা তাকে অপহরণ করে নিয়ে যান, আরও আশ্চর্য যে,এই
অপহরণে ব্রাহের পিতা ও মাতা বিশেষ ক্ষুব্ধ হন নি। ছোটবেলা থেকেই ব্রাহে
জ্যোতির্বিজ্ঞানে আগ্রহী ছিলেন। ১৫৬০
খ্রীষ্টাব্দের ২১ আগষ্ট ব্রাহে সূর্যগ্রহণ দেখেন। সূর্যগ্রহণের দৃশ্যতো তাকে মুগ্ধ
করেই, তিনি আরও মুগ্ধ হয়েছিলেন এই জেনে যে বিজ্ঞানীরা এর পূর্বাভাস আগেই
দিয়েছিলেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানে আগ্রহী হলেও ব্রাহে কাকার ইচ্ছেমতো কোপেনহেগেন
বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন শিক্ষা করেন। তার বিশ বছর বয়সে, এক দ্বন্দ্বযুদ্ধে ব্রাহের নাক
কাটা যায় এবং পরবর্তি জীবনে তিনি একটি কৃত্রিম নাক ব্যবহার করতেন। শোনা যায়
দ্বন্দ্বের কারন ছিল গণিতের কিছু সূক্ষ্ম বিষয়ে এক ড্যানিশ অভিজাতের সাথে ব্রাহের
উত্তপ্ত আলোচনা।
ব্রাহে কোপারনিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক মডেলের বিশ্বাসী ছিলেন না (যুক্তিছিল তিনি পৃথিবীর
গতি অনুভব করতে পারেন না!)। তিনি একটি বিকল্প মডেলের প্রস্তাব দেন, যেখানে পৃথিবী স্থির, সূর্য ও চাঁদ পৃথিবীকে প্রদক্ষিন করে এবং অন্যান্য গ্রহরা সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে।
ব্রাহে বুঝতে পেরেছিলেন যে তার মডেল সকলের কাছে তখনই গ্রহণযোগ্য হবে যখন একমাত্র
তার মডেলই গ্রহদের গতিবিধির সঠিক পূর্বাভাস দিতে পারবে কিন্তু টলেমী বা
কোপারনিকাসের মডেল দিতে পারবে না এবং সেইজন্য চাই গ্রহদের অবস্থানের যথাযথ,
নির্ভুল পরিমাপ। গ্রহদের অবস্থানের নির্ভুল যথাযথ পরিমাপই
ব্রাহে তার জীবনের লক্ষ্য করেন। ড্যানিশ রাজা
দ্বিতীয় রুডলফের সহায়তায়,তিনি সেই সময়কার
শ্রেষ্ঠ মানমন্দির তৈরী করেন, যেখানে গ্রহদের অবস্থান ১ আর্কমিনিট সূক্ষতায় মাপা
যেত। আর্কমিনিট হলো কোন পরিমাপের একক, ৬০
আর্কমিনিটে ১ ডিগ্রী হয়। মনে রাখতে
হবে, তখনও দূরবীক্ষণ বা টেলিস্কোপ আবিষ্কার হয় নি। নগ্ন চোখ মানমন্দিরে আর্কমিনিট
সূক্ষতায় গ্রহদের অবস্থান পরিমাপ খুবই দূরূহ ব্যাপার ছিল। সময় পরিমাপের জন্য নির্ভুল
ঘড়ি আবিষ্কারও এই সূক্ষ্ম পরিমাপে সাহায্য করেছিল। তার নিজের মডেলের নানাবিধ গণনার জন্য ব্রাহে কেপলারকে সহকারী হিসেবে
নিযুক্ত করেন। যদিও তাদের মধ্যে কাজের সম্পর্ক ছিল, কেপলার ব্রাহেকে পছন্দ করতেন
না তার বিলাসবহুল জীবন যাত্রার জন্য। ব্রাহেও কেপ্লারকে বিশ্বাস করতেন না। তার ভয়
ছিল, গ্রহদের গতিবিধির যে বিপুল তথ্য তিনি সারা জীবন ধরে সংগ্রহ করেছেন, কেপলার তা
চুরি করতে পারে। ১৬০১ সালের অক্টোবর মাসে ব্রাহের মৃত্যু হয়। ব্রাহের মৃত্যুর পরেই কেপলার, কিছুটা
বেআইনি ভাবে, ব্রাহের সংগ্রহীত গ্রহদের
গতিবিধির বিপুল পরিমাণ তথ্য নিজের দখলে
নেন। ড্যানিশ সম্রাট রুডলফ কেপলারকে
ব্রাহের শূন্যপদে নিযুক্ত করেন। রাজ গণিতবিদ হিসাবে কেপলারের প্রধান কাজ ছিল,
সম্রাটকে জ্যোতিষ শাস্ত্রে পরামর্শ দেওয়া। কেপলারের সময়
জ্যোর্তিবিদ্যা ও জ্যোতিষবিদ্যার মধ্যে পার্থক্য করা হত না। কেপলারের জ্যোতিষবিদ
হিসাবে বিশেষ খ্যাতি ছিল। গ্রাজে, শিক্ষকতার সাথে তার একটি দ্বায়িত্ব ছিল পঞ্জিকা
বানানো। প্রথম পঞ্জিকাতে কেপলার ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে সেই বছর প্রচন্ড ঠান্ডা
পড়বে এবং তুরস্ক জার্মান আক্রমণ করবে। ভাগ্য ক্রমে দুইটি ভবিষ্যদ্বাণীই মিলে যাওয়ায় কেপলারের জ্যোতিষবিদ
হিসাবে বিশেষ খ্যাতি হয়। সম্রাট রূডলফ ছাড়াও ইউরোপের অনেক রাজা-রাজড়া জ্যোতিষ
গণনার জন্য কেপলারের শরণাপন্ন হতেন। কেপলার যিনি বলতেন, ‘জ্যোতিষ হলো জ্যোর্তিবিজ্ঞানের সত-কন্যা’ নিজে
অবশ্য জ্যোতিষ বিদ্যায় বিশেষ বিশ্বাসী ছিলেন না। জ্যোতিষকে তিনি “ভয়ঙ্কর অন্ধবিশ্বাস” মনে করতেন। রাজ গণিতবিদ হিসাবে কেপলারের অরেকটি দায়িত্ব ছিল; গ্রহ-তারাদের একটি নূতন তালিকা
তৈরী করা। সেই সময় টলেমীর ভূকেন্দ্রিক
মডেল ভিত্তি করে বানানো তারকা তালিকা চালু
ছিল। টাইকো ব্রাহের সংগ্রহীত বিপুল তথ্যের সাহায্যে, সূর্যকেন্দ্রিক মডেল ভিত্তি
করে কেপলার একটি অনেক নিখুঁত একটি তারকা তালিকা বানিয়েছিলেন যেটি ১৬২৭ সালে
প্রকাশিত হয়। এই তারকা তালিকা “রূডলফের তারকা তালিকা (Rudolphine Tables)” নামে খ্যাত।
ব্রাহের সংগ্রহীত গ্রহ-তারকাদের গতি-বিধির তথ্য নিয়ে কঠোর পরিশ্রম, বিস্তর গবেষণার কেপলার কোপারনিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক মডেলের মূল সমস্যা ধরতে পারলেন। কোপারনিকাসের মডেলে গ্রহরা
সূর্যকে বৃত্তাকার কক্ষে প্রদক্ষিণ করত। বৃত্ত হল
সবচাইতে সহজ একটি বক্ররেখা যা একটি জায়গাকে সীমাবদ্ধ করতে পারে। ৫-নং চিত্রে যেমন
দেখান হয়েছে, এর একটি কেন্দ্র (O) আছে। কেন্দ্র থেকে বৃত্তের উপর যে কোন বিন্দুর দূরত্ব এক, যেমন OP=OP’। উপবৃত্ত (Ellipse ) হল
বৃত্তের সাধারণীকরণ। চিত্রে যেমন দেখান হয়েছে , উপবৃত্তের দুইটি কেন্দ্র আছে, এদের
বলা হয় ফোকাস। উপবৃত্তের যেকোন বিন্দু থেকে
ফোকাসদুটির দূরত্বের যোগফল একটি নির্দিষ্ট
মান বা ধ্রুবক, OP’+P’O’=OP+PO’। সূর্যকেন্দ্রিক মডেলের সব সমস্যার সমাধান হয় যদি গ্রহরা সূর্যকে বৃত্তাকার
পথে প্রদক্ষিণ না করে, উপবৃত্তাকার পথে প্রদক্ষিণ করে। কেপলার তার মডেলে বৃত্তকে
উপবৃত্ত করলেন এবং সূর্যকে উপবৃত্তের একটি ফোকাসে বসালেন। ১৬০৯ খ্রীষ্টাব্দে,
কেপলার তার সারা জীবনের গবেষণার ফল, তার
বিখ্যাত বই, ‘নূতন জ্যোর্তিবিজ্ঞান (Astronomia
Nova)’ –তে প্রকাশ করলেন। তিনি
দেখালেন যে, পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিকোণ থেকে, টলেমীর মডেল, কোপারনিকাসের মডেল
এবং টাইকো ব্রাহের মডেল এক।
চিত্র-৫। একটি বৃত্ত ও উপবৃত্ত দেখান হয়েছে।
আমরা জানি
কেপলার জ্যোতির্বিজ্ঞানের তিনটি সূত্র দিয়েছিলেন। ‘নূতন জ্যোর্তিবিজ্ঞান’ গ্রন্থে
কেপলার তাঁর তিনটি সূত্রের প্রথম দুটি সূত্র প্রকাশ করেন। আজ থেকে ৪০০ বছর আগে প্রকাশিত সূত্রদুটি এখনও বৈধ। প্রথম সূত্রে কেপলার বললেন,
সূত্র ১।
গ্রহরা সূর্যকে উপবৃত্তাকার পথে প্রদক্ষিণ করে এবং উপবৃত্তের একটি কেন্দ্রে সূর্য
অবস্থান করে।
দ্বিতীয়
সূত্রে কেপলার বললেন,
সূত্র ২।
সূর্য ও গ্রহ সংযোগকারী (কল্পিত) সরলরেখাটি সমান সময়ে সমান আয়তনের ক্ষেত্র
পরিক্রমা করে।
বর্তমান সময়ে এটা এখন উপলব্ধি করা কঠিন, কিন্তু প্রথম সূত্রটি সেই সময়ের মানুষের পক্ষে এক বৈপ্লবিক
চিন্তা। অনাদিকাল থেকে মানুষ ভেবে এসেছে
যে গ্রহরা বৃত্তাকার পথে ভ্রমণ করে। গ্রহদের বৃত্তাকার ভ্রমণ প্রায় পবিত্র ব্যাপার
বলে গণ্য করা হত। সেই চিন্তাধারা থেকে
বেরিয়ে আসা একটি অপবিত্র কাজ করার মতনই ছিল। এই বলিষ্ঠ পদক্ষেপ কেপলারের পক্ষেই
সম্ভব ছিল, যিনি বলেছিলেন, “সত্য সময়ের কন্যা, তার ধাত্রী হতে আমার লজ্জা বোধ হয়
না (Truth is
daughter of time and I feel no shame in being her midwife )”। কেপলারের দ্বিতীয় সূত্রটি ও খুবই
গুরুত্বপূর্ন। দ্বিতীয় সূত্রে কেপলার বললেন, গ্রহরা সবসময় একই গতিতে চলে না। ৬-নং চিত্রে
যেমন দেখান হয়েছে, সূর্যের কাছকাছি এলে তাদের গতি বেড়ে যায় আর দূরে গেলে গতি কমে
যায়।
চিত্র-৬।
কেপলারের দ্বিতীয় সূত্রের ছবি।
প্রায় এক দশক পরে, ১৬১৯ খ্রীষ্টাব্দে, কেপলার তার
দ্বিতীয় গ্রন্থ “বিশ্বের ঐকতান (The
Harmony of the World)” প্রকাশ করেন। সেইখানে আমরা পাই কেপলারের তৃতীয় সূত্র। তৃতীয় সূত্রটি বুঝতে
হলে আমাদের দুটি জিনিষ জানতে হবে,
(১) উপবৃত্তের প্রধান অক্ষ - উপবৃত্তের উপর দুটি বিন্দুর
মধ্যে সর্বাধিক দূরত্ব, এর অর্ধেককে বলা
হয় অর্ধ-প্রধান অক্ষ।
(২) গ্রহদের আবর্তন কাল- যে সময়ে একটি গ্রহ সূর্যকে
একবার প্রদক্ষিণ করে।
তৃতীয়
সূত্রে কেপলার বললেন,
সূত্র ৩। দুইটি গ্রহের আবর্তনকালের বর্গের অনুপাত
এবং অর্ধ-প্রধান অক্ষের ঘনাংকের অনুপাত সমান।
মনে করা যাক, P1
এবং P2
যথাক্রমে দুইটি গ্রহের আবর্তন কাল এবং, R1 ও R2
তাদের অর্ধ-প্রধান অক্ষ। কেপলারের তৃতীয় সূত্র অনুযায়ী,
জ্যোর্তিবিজ্ঞানে সাধারনত পৃথিবী থেকে সূর্যের
দূরত্বের এককে দূরত্ব মাপা হয়, এই একককে বলা হয় এষ্ট্রোনমিকাল ইউনিট (AU) । গ্রহদের আবর্তনকাল যদি পৃথিবীর আবর্তনকালের (১ বৎসর) এককে, এবং গ্রহদের অর্ধ-প্রধান অক্ষ যদি এষ্ট্রোনমিকাল
ইউনিটে মাপা যায়, তাহলে, তৃতীয় সূত্র খুব সহজে লেখা যায়,
মঙ্গল গ্রহকে ধরা যাক। ৬৮৬.৯৭ দিনে বা
১.৮৮ বছরে সূর্যকে একবার প্রদক্ষিন করে। কেপলারের তৃতীয় সূত্র অনুযায়ী মঙ্গলগ্রহের অর্ধ-প্রধান অক্ষ সহজেই গণনা করা যায়, ১.৫২ AU। যা প্রকৃতপক্ষেই মঙ্গলগ্রহ এবং সূর্যের গড় দূরত্ব।
১৬১২ খ্রীষ্টাব্দে, সম্রাট রূডলফের মৃত্যুর পর, রাজনৈতিক ও ধর্মনৈতিক কারনে
কেপলার লিঁজ সহরে স্থানান্তরিত হন, এবং মৃত্যু পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন। লিঁজে কেপলার শিক্ষকতা, জ্যোর্তিবিজ্ঞানের
গবেষণা সাথে সাথে রাজ গণিতবিদের দায়িত্বও
পালন করতেন। মৃত্যুর কিছুদিন আগে কেপলার রিজেন্সবার্গে যান এবং অসুস্থ হন। ১৫ নভেম্বর
১৬৩০, অল্প কিছুদিনের অসুস্থতার পর এই অসামান্য
ব্যক্তিটি মারা যান। রিজেন্সবার্গে তাকে সমাধিস্থ করা হয়। তার সমাধিস্তম্ভের লেখা কেপলার নিজেই লিখেছিলেন,
“আগে আমি স্বর্গ পরিমাপ করতাম, এখন আমি পৃথিবীর
ছায়া পরিমাপ করব।“
জ্যোতির্বিজ্ঞানের তাঁর অবদানের জন্য চাঁদের একটি গর্তের নাম কেপলার রাখা হয়েছে, নাসা তার গ্রহ
সন্ধানের টেলিস্কোপটি নামকরণ করেছে কেপলার।








