চিত্র ১-ইভানজেলিস্তা টরিসেলী
(১৫ অক্টোবর ১৬০৮- ২৫ অক্টোবর, ১৬৪৭)
(১৫ অক্টোবর ১৬০৮- ২৫ অক্টোবর, ১৬৪৭)
পৃথিবীর ইতিহাসে ১৭’শ শতাব্দী বিজ্ঞানের বৈপ্লবিক যুগ বলে
পরিচিত। অংক, পদার্থবিদ্যা, রসায়নবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, শরীরতত্ত্ববিদ্যা প্রভৃতি বিষয়ে দ্রুত
উন্নতি বিজ্ঞানকে অভাবনীয় উচ্চতায় পৌছে দেয়। তর্কসাপেক্ষে, ১৫৪৩ খ্রীষ্টাব্দে
নিকোলাস কোপারনিকাসের “অন দী রিভ্লুশন অফ হেভেনলি স্ফেয়ারস (On the revolution of the Heavenly
Spheres)”, বৈপ্লবিক বিজ্ঞানের
যুগের সূচনা করে। এই বিপ্লব চলাকালীনই
১৬৩২ খ্রীষ্টাব্দে প্রকাশিত হয় গ্যালিলিও গ্যালিলির “ডায়ালগ কনসারনিং দী টু চীফ ওয়ার্ল্ড সিস্টেমস
(Dialogue
concerning the two chief World’s systems)”, এবং,
জ্ঞানীদের
মতে, বিপ্লবের সমাপ্তি ঘটে ১৬৮৭ খ্রীষ্টাব্দিতে স্যার আইজাক নিউটনের বিখ্যাত “প্রিন্সিপিয়া (Principia)” প্রকাশণার পর। এই ১৭’শ শতাব্দীতেই ইভানজেলিস্তা টরিসেলী আবিষ্কার করেছিলেন
‘ব্যারোমিটার,’ বায়ুর চাপ মাপবার যন্ত্র। ‘ব্যারোমিটার’ নামটি অবশ্য দিয়েছিলেন
আরেক বিখ্যাত বিজ্ঞানী, রবার্ট বয়েল, দুটো গ্রীক শব্দ, ‘ব্যারো’ ও ‘মেট্রন’
মিলিয়ে। গ্রীক ভাষায় ‘ব্যারো’ মানে ওজন, ও ‘মেট্রন’ মানে ‘মাপ’।
আজকের দিনে, টরিসেলীর ‘ব্যারোমিটার’ আবিষ্কারের গুরুত্ব
উপলব্ধি করা সম্ভব নয়, কিন্তু, ১৭’শ শতাব্দীতে, ব্যারোমিটার আবিষ্কার ছিল একটি
যুগান্তকারী ঘটনা। যেকোন আবিষ্কারের দুটো উপযোগিতা থাকতে পারে; (১) আবিষ্কারটি বিজ্ঞানকে
সমৃদ্ধ করে, জ্ঞান ভাণ্ডার বিস্তারিত হয়, এবং, (২) আবিষ্কারটি সমকালীন ধ্যানধারণা
বদলে দেয়। ব্যারোমিটার আবিষ্কার অবশ্যই বিজ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেছিল। এর
দ্বারা আবহাওয়ার পূর্বাভাস পাওয়া সম্ভব হওয়ায় জলপথ ভ্রমণ অনেক নিরাপদ হয়। নাবিকরা
এই আবিষ্কারকে স্বাগত জানিয়েছিল কারন আবহাওয়ার পূর্বাভাস পাওয়ায় তারা প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল। কিন্তু,
ব্যারোমিটার আবিষ্কার শুধুই যদি বিজ্ঞানকে সমৃদ্ধ করত,
তাহলে এটা অন্য অনেক আবিষ্কারের মতই একটি সাধারন আবিষ্কার হয়ে থাকত। ব্যারোমিটার
আবিষ্কার শূন্যস্থান সম্বন্ধে সমকালীন ধ্যানধারণা বদলে দিয়েছিল।
প্রভাবশালী বিখ্যাত গ্রীক দার্শনিক এরিস্টটল (খ্রীষ্টপূর্ব ৩৮৪-
খ্রীষ্টপূর্ব ৩২২) বিশ্বাস করতেন যে,
শূন্যস্থান থাকতে পারে না, প্রকৃতি শূন্যস্থান ঘৃণাসহকারে পরিহার করে (nature abhors vacuum) । কেন এমন ধারনা করেছিলেন? গ্রীক দার্শনিকরা গতির বিশ্লেষণ করে শূন্যস্থানের ধারণা
পেয়েছিলেন। কোনবস্তু যখন স্থান পরিবর্তন করে, সেটি একটি জায়গা শূন্য করে আরেকটি
শূন্যস্থান পূর্ণ করে, কিন্ত, শূণ্যস্থানটি প্রকৃতই শূন্যস্থান? এরিস্টটল বিশ্বাস
করতেন যে শূণ্যস্থানটি প্রকৃতই শূন্যস্থান নয়। ধরা যাক, একটি পাত্রে জল আছে। এবার
পাত্র থেকে জল আমি ফেলে দিলাম। পাত্রটি কি শূন্য
হয়ে গেল? না, বায়ু পাত্রটির শূন্যস্থান দখল করে নেবে। এরিস্টটল তাই মনে করতেন যে,
দুটো বস্তুর মধ্যে শূন্যস্থান থাকা সম্ভব নয়। ‘প্রকৃতি শূন্যস্থান ঘৃণাসহকারে
পরিহার করে’ ধারনার পিছনে ধর্মীয় যুক্তিও ছিল। প্রকৃত শূন্যস্থান সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের
কল্পনার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। যে স্থানটি
কিছু দিয়ে পূরন করা যায়, ঈশ্বর সেটি করবেন না, তিনি কি এতই অক্ষম? ১৭’শ শতাব্দীতেও
তাই এরিস্টটলের ধারণা, ‘প্রকৃতি
শূন্যস্থান ঘৃণাসহকারে পরিহার করে’ প্রচলিত ছিল। আনবিক
মতবাদীরা অবশ্য এরিস্টটলের এই মতবাদে বিশ্বাস করতেন না। তাদের জন্য প্রকৃত শূন্যস্থান
ছিল অপরিহার্য। অণু ও শূন্যস্থানের ধারনা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।পদার্থ যদি অণু দিয়ে
তৈরী হয়, তাহলে, দুটো অণুর মধ্যে শূন্যস্থান থাকতে হবে। কিন্তু, আনবিকবাদীরা অণুর
বা শূন্যস্থানের কোন প্রমান দিতে পারছিলেন না। টরিসেলীর ব্যারোমিটার আবিষ্কার,
প্রথম, কৃত্রিম উপায়ে শূন্যস্থান তৈরী করে প্রমান করে যে প্রকৃতির কোন বিরোধিতা ছাড়াই শূণ্যস্থান
থাকতে পারে। এই আবিষ্কার প্রচলিত ধারণা “প্রকৃতি শূন্যস্থান ঘৃণাসহকারে
পরিহার করে” বদলে দিয়ে ‘অণুবাদ’কে অভীষ্ট লক্ষ্যে
পৌছে দিতে সাহায্য করেছিল। টরিসেলীর আবিষ্কার আরেকটি প্রচলিত ধারণা বদলে দিয়েছিল।
সেই সময় বায়ুর ওজন একটি বিতর্কিত বিষয় ছিল। সাধারনভাবে ধারনা ছিল, বায়ু ওজন-শূন্য। টরিসেলীর আবিষ্কার চূড়ান্ত ভাবে প্রমাণ করে বায়ুর ওজন আছে।
ইতালীর একটি
দুঃস্থ পরিবারে, ১৬০৮ সালের ১৫ই অক্টোবর, ইভানজেলিস্তা টরিসেলীর জন্ম। পিতা গ্যাসপার
রুবার্তি ও মাতা জিকামার তিন সন্তানের প্রথম সন্তান টরিসেলী। গ্যাসপার ছিলেন বস্ত্র কারখানার শ্রমিক। মানবসমাজের সৌভাগ্য যে গ্যাসপার
বুঝতে পেরেছিলেন যে টরিসেলী বিরল প্রতিভার অধিকারী এবং ছোটভাই ফাদার জ্যাকাপোর হাতে
টরিসেলীর শিক্ষার দায়িত্ব সমর্পন করেন। ফাদার
জ্যাকাপো ছিলেন ইতালীয় ফেনজা সহরে বেনেডিকটাইন সম্প্রদায়ের একটি গীর্জার পাদ্রী।
তার তত্তাবধানে, ফেনজা ,পারদর্শী হন। ১৩০৩ খ্রীষ্টাব্দে স্থাপিত রোমের সাপিয়েঞ্জা বিশ্ববিদ্যালয়
বিশ্বের অন্যতম পুরাতন বিশ্ববিদ্যালয়। ১৬২৬-এ ফাদার জ্যাকাপোর উদ্যোগে টরিসেলী
বিজ্ঞানশিক্ষার জন্য সাপিয়েঞ্জা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বেনডিতো কাস্তেলীর কাছে
যান। টরিসেলীর অভূতপূর্ব প্রতিভা দেখে, কাস্তেলী তাকে নিজের সহকারী নিযুক্ত করেন।
১৬২৬ থেকে ১৬৩২ খ্রীষ্টাব্দ
পর্যন্ত টরিসেলী কাস্তেলীর সহকারী হিসেবে কাজ করেন। বেনডিতো কাস্তেলী গ্যালিলিও গ্যালিলির
ছাত্র ছিলেন এবং তার সাথে নিয়মিত চিঠিতে যোগাযোগ রাখতেন। একবার, কাস্তেলীর অনুপস্থিতিকালে
গ্যালিলিওর চিঠি আসে এবং টরিসেলী সেই চিঠির উত্তর দেন। সেই সুযোগে টরিসেলী নিজের
পরিচয় দেন যে তিনি একজন অংকবিদ, পুরাতন ও আধুনিক অংকশাস্ত্র মনোযোগ সহকারে অধ্যয়ন
করেছেন। তিনি গ্যালিলিওর সদ্য প্রকাশিত বই,
‘ডায়ালগ কনসারনিং দী টু চীফ ওয়ার্ল্ড
সিস্টেমস’ অধ্যয়ন করেছেন এবং কোপারনিকাসের তত্ত্বে বিশ্বাস করেন।
টরিসেলীর চিঠি পড়ে বুঝতে পারা যায়
তিনি জ্যোতির্বিদ্যার চর্চ্চা করতে উৎসাহী ছিলেন। কিন্তু, টরিসেলী উচ্চাকাংক্ষী যুবকও ছিলেন। গ্যালিলিওর কোপারনিকাসের তত্ত্বকে সমর্থন করা তদানিন্তন
ধর্মীয় সমাজ ভালভাবে দেখেনি এবং ধর্মীয় প্রধান পোপ তাকে শাস্তি দেন। বিতর্কিত জ্যোতির্বিদ্যা চর্চ্চা করলে শাস্তি পেতে হতে পারে, সেই ভয়ে
টরিসেলী জ্যোতির্বিদ্যার
চর্চ্চা ছেড়ে অবিতর্কিত অংক এবং গতিশাস্ত্রের
চর্চ্চা শুরু করেন। অংকশাস্ত্রে তার অবদান অনেক। আবিষ্কার
করেছিলেন টরিসেলীর ট্রাম্পেট, একটি জ্যামিতিক চিত্র যার আয়তন সসীম (finite) কিন্তু অসীম
পৃষ্ঠতল অসীম (infinite)। শুরু
করেছিলেন অংকশাস্ত্রে অসীম সিরিজের প্রবর্তনা, আবিষ্কার করেছিলেন ‘মেথড অফ ইনডিভিসিবল,’ ইন্টিগ্রাল ক্যাল্কুলাসের প্রথম ধাপ। টরিসেলী
আলো সম্বন্ধেও উৎসাহী ছিলেন এবং লেন্স বানাতে পারদর্শি ছিলেন। টাসকানীর ডিউক,
টরিসেলীর লেন্স বানাবার পারদর্শিতা দেখে তাকে একটি সোনার পদক উপহার দিয়েছিলেন।
১৬৩২ থেকে ১৬৪১ খ্রীষ্টাব্দ টরিসেলী জিওভানি কাম্পালির
সহকারী হিসেবে কাজ করেন। জিওভানি কাম্পালি ছিলেন একজন পাদ্রী, কবি এবং মানবতাবাদী।
তিনি গ্যালিলিও গ্যালিলির ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। জিওভানি পোপকে বুঝাবার চেষ্টা
করেছিলেন যে, গ্যালিলিও কোন অন্যায় করেন নি এবং গ্যালিলিওর বই, ‘ডায়ালগ কনসারনিং দী টু চীফ ওয়ার্ল্ড সিস্টেমস’ পোপের
কথামতনই লেখা হয়েছে। পোপ যখন গ্যালিলিওকে শাস্তি দেন, তখন জিওভানিকেও রোম থেকে
নির্বাসন করেন। টরিসেলী জিওভানির সাথে দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ান এবং সেই সময়
গতিবিদ্যার চর্চ্চা করেন। সেই চর্চ্চার ফল প্রকাশিত হয় “দী মতু গ্রাভিয়াম” নামক
বইতে। পরে, দী মতু গ্রাভিয়াম টরিসেলীর তিন খন্ডের বই, “অপেরা জিওমেট্রিকা”র প্রথম খন্ড
হিসাবে প্রকাশিত হয়। কাস্তেলি একখন্ড “দী মতু গ্রাভিয়াম” গ্যালিলিওকে পাঠান। গতিশাস্ত্রে
টরিসেলীর জ্ঞান গ্যালিলিওকে মুগ্ধ করে। ১৬৪১ সালে টরিসেলী রোম ফিরে আসেন এবং
চাকরির চেষ্টা করেন। কাস্তেলি
গ্যালিলিওকে টরিসেলীর চাকরির জন্য অনুরোধ করেন। গ্যালিলিও সেইসময় ফ্লোরেন্সে
গৃহবন্দী ছিলেন। কাস্তেলির অনুরোধমতো টরিসেলীকে নিজের সহকারী হিসেবে নিযুক্ত করেন।
টরিসেলী ১৬ই অক্টোবর, ১৬৪১ সালে গ্যালিলিওর সহকারী হিসেবে যোগ দেন। জানুয়ারী
১৬৪২’এ গ্যালিলিওর মৃত্যু পর্যন্ত টরিসেলী গ্যালিলিওর সহকারী হিসেবে কাজ করেন। গ্যালিলিওর
মৃত্যুর পর, তার শূণ্যস্থানে ডিউক অফ টাসকানী টরিসেলীকে নিযুক্ত করেন। টরিসেলী
মৃত্যু পর্যন্ত সেই পদে ছিলেন।
টরিসেলী বিখ্যাত হয়েছিলেন ব্যারোমিটার আবিষ্কার করার জন্য।
আবিষ্কারটি হয়েছিল একটি পুরাতন সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে। অনেকদিন ধরেই পাম্পের
ব্যবহার মানুষের জানা ছিল। গ্রীক দার্শনিক আর্কিমিডিস ২২০০ বছর আগে, নদী থেকে সেচের জল
উপরে তুলবার জন্য স্ক্রু পাম্প আবিষ্কার
করেছিলেন। সমস্যা হচ্ছিল, পাম্পের সাহায্যে ৩২ ফুটের উপরে জল তোলা
যাচ্ছিল না। কিন্তু কেন? সমস্যাটি গ্যালিলিওকে জানানো হয়েছিল। গ্যালিলিও
এরিষ্টটলের ‘প্রকৃতি শূন্যস্থান ঘৃণাসহকারে পরিহার করে’ মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন।
তিনি ভেবেছিলেন যে, শূন্যস্থানের শক্তিই জলকে উপরে তোলে। সেই শক্তির একটি পরিমাপ আছে, যার জন্যই নির্দিষ্ট উচ্চতার বেশি উচ্চতায় জল তোলা যায়
না। উপমা দিয়েছিলেন, একটি দড়িতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ওজন চাপান যায়, তার বেশি
চাপালে, দড়িটি ছিঁড়ে যায়।
গ্যালিলিওর ব্যাখ্যা টরিসেলীর পছন্দ হয়নি। টরিসেলী
এরিষ্টটলের মতবাদেও বিশ্বাসী ছিলেন না। মাইকেলাঞ্জেল রিচ্চি ছিলেন রোমান ক্যাথলিক
গির্জার উচ্চপদস্থ পাদ্রী এবং একজন
অংকবিদ। রিচ্চিও ছিলেন কাস্তেলীর ছাত্র ও
টরিসেলীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বন্ধু রিচ্চিকে টরিসেলী
লিখেছিলেন,
“অনেকেই যুক্তি দিয়েছেন যে শূণ্যস্থানের অস্তিত্ব নাই,
অনেকেই যুক্তি দিয়েছেন যে শূণ্যস্থান থাকলেও, প্রকৃতির ঘৃণার জন্য, অনেক
প্রতিকুলতার মধ্যে থাকে। কিন্তু, শূণ্যস্থান সহজেই, প্রকৃতির কোন প্রতিকুলতা ছাড়াই
থাকতে পারে, এমনটি কেউ বলেছেন বলে আমার জানা নাই।“
ঠিক সেই কাজটিই টরিসেলী করেছিলেন, কৃত্রিম উপায়ে শূণ্যস্থান তৈরী করে প্রমান
করেছিলেন, শূণ্যস্থান সহজেই তৈরী করা সম্ভব এবং শূণ্যস্থান প্রকৃতির কোনরূপ
প্রতিকুলতা ছাড়াই থাকতে পারে।
চিত্র ২-টরিসেলীর পরীক্ষা।
অনেক অধ্যয়নের পরে টরিসেলী নিজের পরীক্ষার নকশা তৈরী করেন।
জলের পরিবর্তে তিনি পারদ ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেন। অনেক চিন্তা করে এই
সিদ্ধান্ত। টরিসেলী বুঝেছিলেন, জল ব্যবহার করলে তার যন্ত্রপাতি বিশাল আকারের হবে,
উচ্চতাও ৩২ ফুটের বেশি হবে। পারদ জলের তুলনায় ১৩.৬ গুন ভারী, তাই, পারদ ব্যবহার করলে যন্ত্রপাতির আকার অনেক-অনেক ছোট
হবে। আরও একটি কারন ছিল। সেইসময় ইতালীবাসী খুবই কুসংস্কারাচ্ছন্ন ছিলেন। ডাইনি
অপবাদ দিয়ে মহিলা ও পুরুষকে হত্যা করা নিত্য-নৈমত্তিক ঘটনা ছিল। টরিসেলীর ভয় ছিল, জল
নিয়ে পরীক্ষা করলে, বিশাল আকারের
যন্ত্রপাতি দেখে প্রতিবেশীরা তিনি ডাইনিবিদ্যার চর্চ্চা করছেন এমন অপবাদ না দেন। তিনি
একটি ৪ ফুট লম্বা কাচের নল বানালেন এবং নলের একটি দিক বন্ধ করে দিলেন। খোলামুখ
দিয়ে নলটি পারদে ভর্ত্তি করলেন, তারপর পারদ ভর্ত্তি একটি বড় পাত্রে নলটি উলটে দিলেন। উপরের কিছু অংশ ফাঁকা করে
কিছু পারদ নল থেকে বেরিয়ে বড় পাত্রে মিশে গেল। বাকি পারদ নলে রয়ে গেল। টরিসেলী
পারদ স্তম্ভের উচ্চতা মেপে দেখলেন, উচ্চতা ৩০ ইঞ্চি। নলটি হেলিয়ে দেখলেন, উচ্চতার
কোন তারতম্য হলো না। কিন্তু, পারদ স্তম্ভের উপরের ফাঁকা জায়গটা কি? টরিসেলী অনুমান
করলেন, পারদ স্তম্ভের উপরের ফাঁকা জায়গটা শুধুই শূন্যস্থান, আর কিছুই নয়।
শূন্যস্থানের আকর্ষনেই কি পারদ স্তম্ভ দাঁড়িয়ে আছে ৩০ ইঞ্চি উচ্চতায়? টরিসেলী তা বিশ্বাস করেন না। তিনি বিশ্বাস করেন
পারদ স্তম্ভ দাঁড়িয়ে আছে বায়ুমন্ডলের চাপে। যদি, শূন্যস্থানের আকর্ষনে পারদ স্তম্ভ
দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে, শূন্যস্থানের আকার, আয়তনের উপর নির্ভর করবে পারদ স্তম্ভের
উচ্চতা। টরিসেলী আরেকটি কাচের নল তৈরী করলেন যার বন্ধ দিকে একটি কাচের বল লাগান।
দুটি নলেই পারদে ভর্তি করে বড় পাত্রে উলটে দিলেন। দুটি নলেই পারদ স্তম্ভ দাঁড়িয়ে
থাকল ৩০ ইঞ্চি উচ্চতায়।
এই পরীক্ষার পর টরিসেলী বলতে
পারলেন যে, তার নলে পারদ স্তম্ভের উচ্চতের সঙ্গে শূন্যস্থানের কোন সম্পর্ক নাই।
বন্ধু রিচিকে লিখেছিলেন,
“আমি দাবি করছি যে শক্তি পারদকে
দাঁড় করিয়ে রাখে, পড়তে দেয় না, সেই শক্তি বাহিরের শক্তি, কাচের নলের মধ্যকার কোন
শক্তি নয়। বড় পাত্রের পারদের উপর পড়ছে ৫০ মাইল উঁচু বায়ুস্তম্ভের ওজন। এটি কি
আশ্চর্যজনক যে পাত্র থেকে পারদ নলের মধ্যে ঢুকবে, উপরে উঠবে যতক্ষণ না নলের পারদের
ওজন ৫০ মাইল উঁচু বায়ুস্তম্ভের ওজনের সমান না হয়?”
টরিসেলী আরও লক্ষ করেছিলেন যে পারদ স্তম্ভের উচ্চতা নির্ভর করে আবহাওয়ার উপর, আবহাওয়া বদলালে পারদ স্তম্ভের
উচ্চতাও বদলায়। ঝড়ের আগে স্তম্ভের উচ্চতা কমে, ভাল আবহাওয়ায় স্তম্ভের
উচ্চতা বাড়ে। তিনি সঠিক অনুমান করলেন যে বায়ুমন্ডলে বায়ুচাপ বাড়া-কমার
সাথে পারদ স্তম্ভের উচ্চতা বাড়া-কমার সম্পর্ক আছে। সেই অনুমান থেকেই আবিষ্কার হলো
ব্যারমিটার।
এই প্রসিদ্ধ বিঞ্জানী ২৫ অক্টোবর, ১৬৪৭ সালে, মাত্র ৩৯ বছর
বয়সে মারা যান। তার সম্মানে ‘চাপ’ পরিমাপের একক রাখা হয় ‘টর’। ১ টর হলো ১/৭৬০ সাধারণ বায়ুমন্ডলের চাপের সমান। এই
বিঞ্জানীর সম্মানে একটি গ্রহাণু ও চাঁদের একটি গর্তের নামও রাখা হয়েছে টরিসেলী।

