ই টি এইচ জুরিখে আইনস্টাইন তার সহপাঠিনী মিলেভা মারিকের প্রেমে পড়েছিলেন এবং তাকে বিবাহের জন্য মনস্থির করেছিলেন। হাঙ্গেরির নোভাসাড অঞ্চলের এক সমৃদ্ধ পরিবারে মারিকের জন্ম। অত্যন্ত মেধাবী মারিক বিজ্ঞানী হতে চেয়েছিলেন। মারিকের বুদ্ধিমত্তা, ভদ্রতা ও ভিন্ন সংস্কৃতি আইনস্টাইনকে আকৃষ্ট করে, মারিকও আইনস্টাইনের প্রতি আকৃষ্ট হন। বিয়ের আগে লিসেরেল নামে তাদের এক কন্যা সন্তানের জন্মও হয়। লিসেরেল সম্বন্ধে বিশেষ জানা নেই। সম্ভবত খুব অল্প বয়সেই তার মৃত্যু হয়। প্রধানত মারিকের গ্রীক ক্যাথলিক ধর্ম বিশ্বাসের জন্য আইনস্টাইনের পিতা-মাতা এই আইনস্টাইন-মারিকের বিবাহের বিরুদ্ধে ছিলেন। এই বিবাহ নিয়ে আইনস্টাইন ও তার মা পাউলিনের মধ্যে মনোমালিন্যও হয়। ইতিমধ্যে বারবার ব্যাবসায় অকৃতকার্যতায় আইনস্টাইনের পিতা হারমানের স্বাস্থ্যের অবনতি হয়, এবং তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। শেষ সময়ে পিতার কাছে থাকার জন্য আইনস্টাইন বার্ন থেকে মিলানে আসেন। ১০ অক্টোবর ১৯০২ হারমানের মৃত্যু হয়। মৃত্যুশয্যায় হারমান আইনস্টাইন ও মিলেভার বিয়েতে সম্মতি দিয়ে যান। জানুয়ারী ৬, ১৯০৩, কিছু ঘনিষ্ঠ বন্ধুর উপস্থিতিতে আইনস্টাইন ও মিলেভার বিবাহ হয়। ১৫ মে ১৯০৪ তাদের প্রথম পুত্র সন্তান, হানস আইনস্টাইন জন্মগ্রহণ করেন। ২৮ জুলাই ১৯১০ সালে তাদের দ্বিতীয় পুত্র সন্তান এডওয়ার্ডের জন্ম হয়।
পেটেন্ট অফিসের চাকুরীটি প্রথমে অস্থায়ী
ছিল, প্রায় দুবছর পরে অধিকর্তা হেলারের সুপারিশে চাকুরীটি স্থায়ী হয়
এবং বেতন বেড়ে হয় ৩৯০০ ফ্রাংক। সুপারিশে
হেলার লিখেছিলেন ‘আইনস্টাইন নিজেকে খুব দরকারী প্রমাণিত করেছেন।‘ তিনি অবশ্য পদোন্নতির সুপারিশ করেন নি কারন ‘আইনস্টাইন
এখনও মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পুরোপুরি অভ্যস্ত নন।‘ আরও দুবছর পরে, হেলারের
সুপারিশে আইনস্টাইনের পদোন্নতি হয়, সুপারিশে
হেলার লিখেছিলেন, ‘আইনস্টাইন অফিসের
অন্যতম বিশ্বস্ত ও বিশেষ সম্মানিত বিশেষজ্ঞদের একজন।‘
আইনস্টাইন পেটেন্ট অফিসের চাকুরীতে
খুশি ছিলেন, কাজের চাপ থাকলেও নিজস্ব পড়াশুনোর জন্য যথেষ্ট সময় পেতেন। পেটেন্ট
অফিসে আইনস্টাইন কাজের সম্বন্ধে কিছু বলা দরকার। আইনস্টাইনের কাজ ছিল অফিসে জমা
পড়া পেটেন্টের আবেদনপত্রগুলোর প্রাথমিক তদন্ত করে উর্ধতন কতৃপক্ষকে রিপোর্ট দেওয়া।
পেটেন্ট আবেদনকারীরা অধিকাংশই হতেন
অপেশাদার। সাধারণত তারা নিজের ভাবনা-চিন্তাকে পরিষ্কার ও প্রাঞ্জল ভাবে প্রকাশ
করতে অক্ষম হতেন। কিছু পেশাদারও এই দোষে দুষ্ট ছিলেন। পেটেন্ট অফিসের কাজ হল
আবিষ্কারকদের আবিষ্কারের আইনি সুরক্ষা
দেওয়া। সেই জন্য প্রয়োজন ছিল প্রত্যেকটি আবিষ্কারের মূলগত দিকগুলি সম্বন্ধে
পরিষ্কার ও প্রাঞ্জল বক্তব্য, যেটি বেশিরভাগ সময়ই পেটেন্ট আবেদনকারীরা করতে অক্ষম
হত। আবেদনপত্রগুলি হত অস্পষ্ট ও অপ্রাঞ্জল। আইনস্টাইনের কাজ ছিল সেইসব অস্পষ্ট ও অপ্রাঞ্জল আবেদনপত্র থকে একটি স্পষ্ট,
সংজ্ঞায়িত গঠন বার করে নেওয়া, আবিষ্কারগুলির মূল ধারনা নির্ণয় করে নেওয়া। কাজটা মোটেও সহজ ছিল না। দীর্ঘদিন
ধরে এই কাজটি করায় অনেক অস্পষ্ট বক্তব্যের মধ্যেও মূল বক্তব্যটি ধরার ব্যাপারে
আইনস্টাইনের একটি বিশেষ দক্ষতা জন্মায়। অনেক বৈজ্ঞানিক আলোচনায় মূল বক্তব্যটি ধরার
ব্যাপারে আইনস্টাইনের বিশেষ দক্ষতা অন্যান্য অনেক বিজ্ঞানীকে বিস্মিত করে।
১৯০৫ সাল পর্যন্ত আইনস্টাইনের জীবনে
এমন কোন ব্যতিক্রমি বৈশিষ্ট্য ধরা পড়েনি যা থেকে তার ভবিষ্যতের কার্যকলাপ সম্বন্ধে
আভাস পাওয়া যেতে পারে। তিনি স্ত্রী মিলেভা মারিকের সাথে সংসার করেছেন, পেটেন্ট অফিসে নিয়মমাফিক কাজ করেছেন,
অফিসের পরে স্ত্রী-পুত্র নিয়ে নিয়ে পার্কে ঘুরে
বেরিয়েছেন, এবং অবশ্যই বেহালা বাজিয়েছেন। পদার্থবিদ্যা
নিয়ে পড়াশুনো চালিয়ে গিয়েছেন এবং গুরুত্ত্বহীন কয়েকটি গবেষণা পত্রও তিনি প্রকাশ করেছিলেন। পদার্থবিজ্ঞানের
ইতিহাসে ১৯০৫ সাল মিরাকল ইয়ার বা অলৌকিক বছর হিসাবে
পরিচিত। সেই বছর পদার্থবিদ্যার বিখ্যাত জার্মান পত্রিকা,
আনালেন ডার ফিজিকে চারটি গবেষণাপত্র প্রাকাশিত হয়েছিল, লেখক ছিলেন আলবার্ট
আইনস্টাইন, আকাদেমিক
জগতে একটি অজানা, অপরিচিত নাম, এবং যার
প্রতিটি পদার্থবিদ্যায় আক্ষরিক অর্থেই বিপ্লব এনে দিয়েছিল। ঘটনাটির
সাথে কিছুটা তুলনা করা যায় ১৬৬৬ সালে আইজ্যাক নিউটনের ক্যালকুলাস, আলোর বিচ্ছুরন ও মহাকর্ষীয় সূত্র আবিষ্কারের। প্লেগের
আক্রমন থেকে বাঁচতে কেমব্রিজ থেকে পালিয়ে উলসথ্রপে তার গ্রামের বাড়িতে বসে নিউটন যা
আবিষ্কার করেছিলেন।
আইনস্টাইনের কার্যকলাপের প্রথম আভাস আমরা পাই
তার বন্ধু কনরাড হাবিচকে লেখা একটি চিঠিতে,
“প্রিয়, হাবিচ,
নীরবতার এমন একটি গম্ভীর হাওয়া আমাদের মধ্যে নেমে এসেছে যে
মনে হয় অপ্রয়োজনীয় বকবক করে নীরবতা ভেঙ্গে আমি একটি অপবিত্র কাজ করছি। তো, একটি হিমায়িত
তিমি, একটি ধূমায়িত স্যামন, তুমি এখন কি
করছ? এখনও কেন তোমার গবেষণাপত্র আমাকে পাঠালে না? তুমি কি জান না যে দেড়জন লোক তোমার লেখা পড়বে, তার একজন
আমি। তোমার একটি গবেষণাপত্রের বিনিময়ে আমি তোমাকে চারটি গবেষণাপত্রের
প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। প্রথমটি
রেডিয়েশন বা বিকিরণ এবং আলোর শক্তির বৈশিষ্ট্য নিয়ে। তুমি দেখতে
পাবে এটি খুবই বৈপ্লবিক গবেষণা। দ্বিতীয় গবেষণাপত্রটি নিরপেক্ষ পদার্থের দ্রবণের বিচ্ছুরণ (ডিফুসন) এবং সান্দ্রতা (ভিসকোসিটি)
থেকে পরমাণুর আকার নির্ধারন করা নিয়ে। তৃতীয়টি প্রমাণ করে যে, তাপের আণবিক তত্ত্ব অনুযায়ী,
তরল পদার্থে ভাসমান ১/১০০০ মিমি মাত্রার দেহগুলিতে
অবশ্যই একটি পর্যবেক্ষণযোগ্য এলোপাথারি গতি সঞ্চালন হবে। শারীর-বৃত্তবিতেরা (ফিজিওলজিস্টরা)
এই ধরনের গতি পর্যবেক্ষণ করেছেন যা "ব্রাউনিয়ান
আণবিক গতি" হিসাবে অবহিত। চতুর্থ
গবেষণাপত্রটি বর্তমানে একটি খসড়া মাত্র। এটি চলমান
দেহগুলির তড়িৎগতিবিদ্যা বা ইলেক্ট্রোডাইনামিক সম্বন্ধিত। গবেষণাপত্রটিতে
স্থান এবং সময়ের বর্তমান তত্ত্বের একটি পরিবর্তন করা হয়েছে। এই গবেষণাপত্রটির
গতিসংক্রান্ত (কাইনেমেটিক্স) অংশ অবশ্যই
তোমাকে আগ্রহী করবে। আলবার্ট আইনস্টাইন”
আইনস্টাইন যে চারটি গবেষণাপত্রের কথা বলেছিলেন তা হল,
১। আলোর উৎপাদন এবং রূপান্তর সম্পর্কিত একটি অনুসন্ধানমূলক দৃষ্টিভঙ্গি;
আনালেন ডার ফিজিক ১৭(১৯০৫)১৩২-১৪৮
১৯০৫ সালে প্রকাশিত প্রথম গবেষণাপত্র। ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের ব্ল্যাক বডি বিকিরণ আইন দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে এই গবেষণাপত্রে
আইনস্টাইন প্রথম শক্তি কোয়ান্টার ধারণা প্রস্তাব করেছিলেন; এবং ফটো ইলেকট্রিক এফেক্ট ঘটনাটির
বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। উল্লেখ্য যে শেষ পর্যন্ত, এই গবেষণাপত্রটির জন্যই আইনস্টাইন পদার্থবিজ্ঞানে
তার একমাত্র নোবেল পুরস্কারটি পেয়েছিলেন।
২। তাপের আণবিক তত্ত্ব অনুযায়ী স্থির তরলে ভাসমান ক্ষুদ্র কণার গতিবিধি সম্বন্ধে; আনালেন ডার ফিজিক, ১৭ (১৯০৫)৫৪৯-৫৬০।
এটি ব্রাউনিয়ান গতির উপর আইনস্টাইনের
প্রথম গবেষণাপত্র। গবেষণাপত্রটিতে আইনস্টাইন ব্রাউনিয়ান
গতির ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, ডিফিউশন সহগ এবং সান্দ্রতার মধ্যে সম্পর্ক বার করেছিলেন, ডিফিউশন সমীকরণ নতুন করে বার করেছিলেন এবং সর্বোপরি অ্যাভোগাড্রো
সংখ্যা নির্ধারন করার সূত্র বার করেছিলেন।
৩। চলমান বস্তুর তড়িতগতিবিদ্যার উপর; আনালেন দার ফিজিক, ১৭ (১৯০৫)৮৯১-৯২১।
এটি স্পেশাল থিয়োরী অফ রিলেটিভিটি বা বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্বের উপর প্রথম গবেষণাপত্র। আইনস্টাইন স্থান ও সময়ের নতুন সংজ্ঞা দেন এবং স্থান ও সময় সম্পর্কে শতাব্দী প্রাচীন ধারণায় আমূল
পরিবর্তন আনেন। আপেক্ষিকতাবাদে স্থান এবং সময় পৃথক
সত্তা নয় বরং একটি সত্তা যাকে স্থান-কাল কন্টিনিয়াম বা ধারাবাহিকতা বলা হয়। ধারাবাহিকতা কারণ আমাদের অভিজ্ঞতায় স্থান বা সময়ের কোনো ফাক বা শূন্যতা নেই। আপেক্ষিকতাবাদ অনুযায়ী, চলমান বস্তুর গতি যদি আলোর গতির কাছাকাছি হয়, তাহলে নিউটনীয় বলবিদ্যা বা মেকানিক্সের
বদলে আপেক্ষিক মেকানিক্স বা বলবিদ্যা কার্যকারী হয়। আপেক্ষিক বলবিদ্যায়
স্থান এবং সময়ের সংমিশ্রন কিছু বিস্ময়
তৈরি করে, যেমন একটি চলমান ঘড়ির ধীরে চলা (সময়ের প্রসারণ), একটি চলমান যষ্টির দৈর্ঘ্য সংকোচন, বেগ সংযোজনের অদ্ভুত নিয়ম ইত্যাদি।
৪। বস্তুর জাড্য বা জড়তা কি তার শক্তি ধারণের ক্ষমতার উপর নির্ভরশীল? আনালেন ডার ফিজিক, ১৭ (১৯০৫) ৬৩৯-৬৪১।
বিশেষ আপেক্ষিকতার উপর দ্বিতীয় গবেষণাপত্র। এখানে তিনি প্রমান করলেন, ভর ও শক্তি সমার্থক । এই গবেষণাপত্রেই তিনি বিশ্বের সবচেয়ে
সুপরিচিত গাণিতিক সমীকরণ প্রমাণ করলেন, E=mc2, ভর গুনিত আলোর বেগের স্কোয়ার বা বর্গ
হচ্ছে শক্তি।
উপরে উল্লিখিত চারটি গবেষণাপত্র ছাড়াও, ৩০ এপ্রিল, ১৯০৫ সালে, আইনস্টাইন জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি ডিগ্রির জন্য তার থিসিসও জমা দেন;
“আনবিক মাত্রা বা মাপ নির্ধারনের নতুন সংকল্প (A NEW DETERMINATION OF MOLECULAR DIMENSIONS)”
প্রফেসর আলফ্রেড ক্লাইনার থিসিসটির তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। থিসিসটি ছিল ছোট, মাত্র ২৪ পৃষ্ঠার। আইনস্টাইন বলেছেন যে তার তত্ত্বাবধায়ক, ক্লাইনার থিসিসটি খুব ছোট বলে ফিরিয়ে
দিয়েছিলেন। আইনস্টাইন একটিমাত্র নতুন বাক্য যোগ
করে থিসিসটি পুনরায় জমা দিয়েছিলেন এবং সেটি আর কোন মন্তব্য ছাড়াই গৃহীত হয়েছিল।
বিজ্ঞানের ইতিহাসে এই গবেষণাগুলির গুরুত্ব অসীম। তার চারটি গবেষণাপত্র ও থিসিসটি মূলত পদার্থবিদ্যার তিনটি গুরুত্ত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর আলোকপাত করেছে,
(১) প্রথম গবেষণাপত্রটি কোয়ান্টাম বলবিদ্যার উপর
দ্বিতীয় বৈপ্লবিক গবেষণা (প্রথমটি ছিল ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের ব্ল্যাক বডি সংক্রান্ত
গবেষণা)। আইনস্টাইন আলোর কোয়ান্টা তত্ত্ব দিয়ে ফটো ইলেকট্রিক এফেক্ট ব্যাখ্যা করে
কোয়ান্টাম তত্ত্বের ভিত্তি শক্ত করলেন।
(২) দ্বিতীয়
গবেষণাপত্রটি ও থিসিস ব্রাউনিয়ান গতি ব্যাখ্যা করে ও পরীক্ষাগারে অ্যাভোগাড্রো
নাম্বার বার করার সূত্র আবিষ্কার করে, অণু, পরমাণুর বাস্তবতা সম্বন্ধে বিজ্ঞানীদের
মনে তখনো যে দ্বিধা ছিল, তা দূর করে। বিখ্যাত জার্মান তত্ত্ব বিজ্ঞানী ম্যাক্স
বর্নের মতে, আইনস্টাইনের এই গবেষণা পরমাণু এবং অণুর বাস্তবতা সম্পর্কে পদার্থবিদদের বোঝাতে সবচাইতে বেশি কাজ করেছে, যা শত খানেক গবেষণাপত্র করতে পারেনি।।
(৩) তৃতীয় ও চতুর্থ গবেষণাপত্র বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদের উপর। আইনস্টাইনের গবেষণা
স্থান ও সময়, শক্তি ও বস্তু সম্বন্ধে চিরন্তনী ধারনার আমূল পরিবর্তন ঘটায়।
প্রথমে আমরা দ্বিতীয় গবেষণাপত্রটি ও থিসিস নিয়ে কিছু বক্তব্য রাখব। আদিকাল
থেকেই মানুষের মনে প্রশ্ন ছিল, আমাদের এই বিশ্ব কি বিযুক্ত অর্থাৎ পৃথক পৃথক কনা (অণু, পরমাণু, ইলেকট্রন ইত্যাদি)
দিয়ে তৈরী, না কি এই বিশ্ব যুক্ত বা অবিচ্ছিন্ন
যেমন মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র বা তড়িত-চৌম্বকীয় ক্ষেত্র। অষ্টাদশ
শতাব্দীর গোড়ার দিকে ব্রিটিশ রসায়নবিদ জন ডালটন পরমাণুর অস্তিত্ত্ব প্রমান করলেও আইনস্টাইনের
সময়ে বিজ্ঞানীদের, বিশেষ করে পদার্থবিজ্ঞানীদের বৃহদংশ অনু, পরমাণুর বাস্তবতা নিয়ে
সন্দিহান ছিলেন। তারা অণু, পরমাণুকে পরীক্ষা প্রাপ্ত ফলাফলকে সহজভাবে বোঝবার উপকরণ
হিসাবে দেখতেন। অস্ট্রিয়ান বিজ্ঞানী লুডউইগ বোল্টজমান
পরমাণুর বাস্তবতা স্বীকার করে এবং তারা র্যানডম মোশন বা এলোপাথাড়ি ঘুরে বেড়ায় ধরে তার গতিবিজ্ঞানের পরিসংখ্যানগত
তত্ত্ব খাড়া করেছিলেন। তার পরিসংখ্যানগত তত্ত্ব গ্যাসের ব্যবহার ও ধর্ম ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হলেও তদানীন্তনকার অনেক বিজ্ঞানীই তার তত্ত্ব
মানতে অস্বীকার করেছিলেন। যেমন, নোবেল জয়ী বিজ্ঞানী উইলহেম অসওয়াল্ড পরমাণুর অস্তিত্ব ও বোল্টজমানের তত্ত্ব বিশ্বাস করতেন না। তিনি বলেছিলেন,
“সমস্ত প্রাকৃতিক ঘটনাবলীকে শেষ পর্যন্ত বলবিজ্ঞানের সমীকরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে
এমন একটি প্রস্তাব একটি কার্যকর অনুমান হিসাবেও নেওয়া যায় না; এটি সম্পূর্ন ভুল।
অসওয়াল্ডের যুক্তি ছিল, প্রাকৃতিক ঘটনাবলী অপরিবর্তনীয়, অথচ বলবিজ্ঞানের সমীকরণগুলো পরিবর্তনীয়। উদাহরণ স্বরূপ, গ্যাস ভরা বোতলের মুখ খুলে দিলে, গ্যাস বোতল থেকে বেরিয়ে যাবে, কিন্তু, উলটো ঘটনা, বোতলের বাইরের গ্যাস নিজে থেকে বোতলে
ঢুকে যাবে এটা কখনই হয় না। টেবিল থেকে কাঁচের গ্লাস পড়লে ভেঙ্গে
টুকরো টুকরো হয়ে যায়, কিন্তু, কাঁচের টুকরোগুলি টেবিলে উঠে জোড়া লেগে আবার কাঁচের গ্লাসে রূপান্তরীত হবে কখনই
হবে না। বলবিজ্ঞানের সমীকরণ কিন্তু উলটো ঘটনা অস্বীকার করে না।
পরমাণুর অস্তিত্ব স্বীকারে বিজ্ঞানীদের
প্রধান বাধা ছিল প্রত্যক্ষ প্রমাণের অভাব। ১৯০৫-এ প্রকাশিত দ্বিতীয় গবেষণাপত্রে আইনস্টাইন সেই অভাব পূর্ণ করলেন।
১৮২৮ সালে স্কটিশ উদ্ভিদবিজ্ঞানী রবার্ট ব্রাউন
জলের উপর ভাসমান পরাগ কণার লক্ষ্যহীন বা এলোপাথাড়ি ঘুরে বেড়ানো নিয়ে তার
বিশদ পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করেছিলেন। এই
পর্যবেক্ষণ ব্রাউনিয়ান গতি বা ব্রাউনিয়ান মোশন নামে পরিচিত। পরাগ কণা
যেহেতু জীবিত পদার্থ, প্রথমে মনে করা হয়েছিল ব্রাউনিয়ান মোশন ক্ষুদ্র জীবিত বস্তুর
(যথা পরাগ কণা) বৈশিষ্ট, কিন্তু পরে
বিভিন্ন পরীক্ষায় তরল পদার্থে ভাসমান যে কোন ক্ষুদ্র, আনুবীক্ষণিক কণাতেই ব্রাউনিয়ান মোশন দেখা যায়। প্রায় আশি বছর পরেও
বিজ্ঞানীরা ব্রাউনিয়ান মোশনের ব্যাখ্যা করতে পারেন নি। কিছু বিজ্ঞানী মলিকুলার
কাইনেটিক থিয়োরি বা আণবিক গতিবিজ্ঞানের তত্ত্ব দিয়ে ব্রাউনিয়ান মোশন ব্যাখ্যা করার
চেষ্টা করেছিলেন। আণবিক গতিবিজ্ঞানের তত্ত্বে তরল পদার্থের অণুগুলি সর্বদাই র্যান্ডম
মোশন বা লক্ষ্যহীন, এলোপাথাড়ি ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু, জলের অণুর তুলানায় একটি পরাগ কণা প্রায় ১০০০০ গুণ বড়।
একটি ক্রিকেট বলের পক্ষে যেমন ধাক্কা দিয়ে আধা মাইল আয়তনের কোন বস্তু সরান সম্ভবপর
নয়, তেমনি একটি জলের অণুর পক্ষেও ধাক্কা
দিয়ে পরাগ কণার স্থান পরিবর্তন করানো অসম্ভব। আইনস্টাইন ঘটনাটির ব্যাখ্যা এইভাবে
করলেন,
যে কোন মুহূর্তে লক্ষ লক্ষ জলের
অণু একটি পরাগ কণাকে চারদিক দিয়ে ধাক্কা দিয়ে যাচ্ছে। এটা অবশ্যই সম্ভব যে কোন
একদিকে ধাক্কার সংখ্যা কিছু বেশি পরিমাণ বেশি। একটি বিশেষ দিকে বেশি পরিমাণ ধাক্কা
পরাগ কণার স্থান পরিবর্তন করাতে সক্ষম হতে পারে। আর, যেহেতু জলের অণুরা র্যানডম বা এলোপাধাড়ি ঘুরে
বেড়াচ্ছে, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দিকে বেশি পরিমাণ ধাক্কা লাগবে ও পরাগ কণাও লক্ষ্যহীনভাবে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দিকে ছুটে
যাবে। আইনস্টাইন আরও একটি কাজ করলেন, অংক
কষে প্রতি সেকেন্ডে ভাসমান কণার আয়তন ও তরল পদার্থের তাপমানে ভাসমান কণা কতটা স্থান পরিবর্তন করবে তা বার
করলেন।। যেমন, তিনি বললেন, এক মিলিমিটারের একহাজার ভাগের একভাগ আয়তনের কণা ১৭
ডিগ্রী তাপমান জলে এক মিনিটে গড়ে ৬ মাইক্রোন স্থানচ্যুত হবে। খুব শীঘ্রই এক
জার্মান বিজ্ঞানী খুব শক্তিশালী মাইক্রোস্কোপ ব্যাবহার করে তার গণনা সত্য বলে
প্রামানিত করলেন। আইনস্টাইন আরও একটি কাজ করেছিলেন, ব্রাউনিয়ান মোশন থেকে অ্যাভোগাড্রো
নাম্বার বার করেছিলেন। বিজ্ঞানী আব্রাহাম পায়াস
লিখেছিলেন, একটি মাইক্রোস্কোপ ব্যাবহার করে অ্যাভোগাড্রো নাম্বার বার করা যেতে
পারে ভাবলে আবাক হতে হয়। বিখ্যাত জার্মানতত্ত্ব বিজ্ঞানী ম্যাক্স বর্নের মতে,
আইনস্টাইনের এই গবেষণা পরমাণু এবং অণুর বাস্তবতা সম্পর্কে পদার্থবিদদের বোঝাতে সবচাইতে বেশি কাজ করেছে।
১৯০৫-এ প্রকাশিত আইনস্টাইনের প্রথম
গবেষণাপত্রটি ছিল কোয়ান্টাম মেকালিক্স বা বলবিদ্যার উপর। সেইসময় বিজ্ঞানীদের সামনে
একটি সমস্যা ছিল। আমরা জানি, লোহাকে গরম করলে প্রথমে তা থেকে লাল আলো বিচ্ছুরিত হয়, আরও বেশি
গরম করলে লাল আলো কমলা হয়ে সাদা আলোতে পরিবর্তিত হয়। আলোর এই বিচ্ছুরণ বা বিকিরণ
বিশদভাবে জানার জন্য জার্মান বিজ্ঞানী গুস্তাফ কিরচফ অতি ক্ষুদ্র ছিদ্র সহ একটি
ধাতুর গোলক বানিয়ে, বিভিন্ন তাপমানে গরম করে
ক্ষুদ্র ছিদ্র থেকে বিভিন্ন তরঙ্গ দৈর্ঘ্যে (ওয়েভ লেংথ) বিকিরিত আলোর তীব্রতা (ইনটেনসিটি) মাপলেন ও তার একটি
চিত্রলেখ বা গ্রাফ বানালেন। তিনি দেখলেন
গ্রাফের আকৃতি ও প্রকৃতি কেবলমাত্র গোলকের
তাপমানের উপর নির্ভর করে, তার আয়তন,
আকৃতির উপর নয়। বিকিরত আলোর বেশির ভাগ
অংশই দৃশ্যমান নয়, তাই এই বিকিরণকে ব্ল্যাকবডি রেডিয়েশন বা কৃষ্ণবস্তু বিকিরণ বলা
হয়। ১৮৬০ সালে কিরচফ তার ব্ল্যাকবডি
রেডিয়েশন সংক্রান্ত গবেষণা প্রকাশ করেছিলেন। বিজ্ঞানীরা ব্ল্যাক বডি রেডিয়েশনের
চিত্রলেখ বা গ্রাফের যথাযত ব্যাখ্যা করতে
অপারগ ছিলেন। জার্মান বিজ্ঞানী ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক শুরুতে বোল্টজমানের পরিসংখ্যানগত
তত্ত্ব বিশ্বাস না করলেও ১৯০০ সালে সেই তত্ত্ব ব্যবহার করে একটি গাণিতিক সূত্র
আবিষ্কার করলেন যা ব্ল্যাক বডি রেডিয়েশনের
চিত্রলেখ বা গ্রাফের ব্যাখ্যা করতে সক্ষম
হল। সূত্রটির একটি সমস্যা ছিল। অতি ক্ষুদ্র মানের একটি ধ্রুবক ব্যবহার করা আবশ্যক
ছিল। এই ধ্রুবকটি বর্তমানে প্ল্যাঙ্ক ধ্রুবক নামে পরিচিত। কেন ধ্রুবকটি ব্যবহার করা আবশ্যক
তার কোন সদুত্তর প্ল্যাঙ্কের কাছ ছিল না। অনেক ভেবে তিনি একটি তত্ত্ব খাড়া করলেন,
যে কোন বস্তু যখন আলো বিচ্ছুরণ বা শোষণ করে (যেমন কৃষ্ণবস্তুর তল) তখন তার অণুগুলি
কম্পিত হতে থাকে এবং কম্পমান অণুগুলিকে আদর্শ দোলক বা হারমোনিক অসিলেটর ভাবা যেতে
পারে। তিনি বললেন এই হারমোনিক অসিলেটরগুলো কেবলমাত্র ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্যাকেট বা
বান্ডিলে আলো বিচ্ছুরণ বা শোষণ করতে পারে।
তিনি আরও বললেন যে আলোর প্যাকেট বা বান্ডিলে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ শক্তিই থাকতে
পারে, যা নির্ধারিত হয় প্ল্যাঙ্ক ধ্রুবক দ্বারা। শক্তি একটি নির্দিষ্ট পরিমানে বিচ্ছুরিত বা শোষিত হতে পারে এই তত্ত্ব
প্রথম দেওয়ার জন্যই প্ল্যাঙ্ককে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের জনক বলা হয়। এখানে উল্লেখ
করা প্রয়োজন যে প্ল্যাঙ্ক নিজে তার তত্ত্বকে নিছক একটি গণনার কৌশল মনে করতেন, আলোর
প্রকৃত প্রকৃতির জন্য নয়।
সেই সময়কার আরো একটি পরীক্ষাও
বিজ্ঞানীদের বিভ্রান্ত করেছিল। জার্মান বিজ্ঞানী হাইনরিখ হার্জ লক্ষ্য করেছিলেন কোন
কোন ধাতব বস্তুর উপর আলো পড়লে তার তল থেকে ইলেকট্রন নির্গত হয়। এই ঘটনাকে ফটো ইলেকট্রিক
এফেক্ট বলা হয়। সেই সময় আলোকে প্রধানত তরঙ্গ মনে করা হত। আলোর তীব্রতা বাড়লে
তার শক্তিও বাড়বে, মনে করা হয়েছিল তীব্রতা বাড়ালে নির্গত ইলেকট্রনের গতিও বাড়বে। জার্মান
প্রফেসর ফিলিপ লেনার্ড ফটো ইলেকট্রিক এফেক্ট বিশদ ভাবে পরীক্ষা করেছিলেন। তিনি
লক্ষ্য করলেন, নির্গত ইলেক্ট্রনের গতি কেবলমাত্র আলোর ফ্রিকোয়েন্সি বা কম্পাঙ্কর
উপর নির্ভরশীল, তার তীব্রতা বা ইন্টেনসিটির
উপর নয়। আলোর তরঙ্গ তত্ত্বে ফটো ইলেকট্রিক এফেক্টের ব্যাখ্যা দেওয়া সক্ষম হয়নি।
১৯০৫-এ প্রকাশিত প্রথম গবেষণাপত্রে
আইনস্টাইন ফোটন বা আলোর কণাতত্ত্ব দিয়ে ফটো ইলেকট্রিক এফেক্টের যথাযথ ব্যাখ্যা
দিলেন। প্ল্যাঙ্ক মনে করতেন কেবল মাত্র বিচ্ছুরণ বা শোষণের সময়
আলোকে বিচ্ছিন্ন প্যাকেট বা বান্ডিল মনে করা যেতে পারে। আইনস্টাইন একধাপ এগিয়ে
বললেন আলো প্রকৃত অর্থেই বিচ্ছিন্ন
প্যাকেট বা বান্ডিল হিসাবে তৈরি। প্ল্যাঙ্ক আবিষ্কৃত সূত্র থেকে তিনি বললেন,
কেবলমাত্র আলোর কম্পাংক ও প্ল্যাঙ্ক ধ্রবক দ্বারা নির্ধারিত হয় প্রতিটি প্যাকেটে
শক্তির পরিমাণ। আলোকে তরঙ্গ হিসাবে না
দেখে বিচ্ছিন্ন বিচ্ছিন্ন প্যাকেট হিসাবে দেখলে ফটো ইলেকট্রিক এফেক্টের সহজেই
ব্যাখ্যা করা যায়। বেশি কম্পাংকের আলো বেশি শক্তি ধরে, তাই কম্পাংক বাড়লে বেশি
শক্তি বা গতির ফটো ইলেকট্রন নির্গত হবে। তীব্রতা বাড়ালে যেহেতু আলোর কম্পাংক বা
শক্তি বাড়ছে না, বেশি সংখ্যায় ফটো
ইলেকট্রন নির্গত হবে, কিন্তু তাদের গতি বৃদ্ধি হবে না। লেনার্ড তার গবেষণায় এই ফলই
দেখতে পেয়েছিলেন।
আইনস্টাইনের তৃতীয় ও চতুর্থ গবেষণা
পত্রদুটি স্পেশাল থিয়োরি অফ রিলেটিভিটি বা বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদের উপর। এই দুটি গবেষণাপত্র
নিয়ে কিছু বিস্তারিত আলোচনার আগে সমসাময়িক পদার্থবিজ্ঞান সম্বন্ধে আরও কিছু বলা প্রয়োজন। বর্তমানে চিরন্তনী পদার্থবিদ্যা বা ক্ল্যাসিকাল ফিজিক্স
বলতে আমরা যা বুঝি, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন স্যার আইজ্যাক নিউটন
(১৬৪২-১৭২৭)। গ্যালিলিও ও তার সমসাময়িকদের আবিষ্কার এবং নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নিউটন
কিছু আইন বা নিয়ম বানিয়েছিলেন যা মহাবিশ্বকে অনেকটাই বোধগম্য করেছিল। তিনি প্রমাণ
করলেন গাছ থেকে আপেল পড়া ও চাঁদের পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করা, একই মহাকর্ষীয় সূত্র
মেনে চলে। মহাকর্ষ, বল, ভর, গতি একই নিয়ম মেনে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রিত করে। চিরন্তনী পদার্থবিদ্যার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট হল
আমাদের এই বিশ্ব, কার্যকারন বা কজালিটী মেনে চলে, যে কোন কার্য বা ঘটনার পিছনে একটি
কারন আছে। যেমন, একটি বল দৌড়েচ্ছে, কারন বলের উপর একটি ফোর্স বা শক্তি প্রয়োগ করা
হয়েছে। গাছ থেকে আপেল পড়ল কারন আপেলের উপর একটি শক্তি (পৃথিবীর আকর্ষন) প্রয়োগ
হয়েছে। নিউটনের গতিবিদ্যার নিয়ম মেনে চলা বিশ্বের ব্যাপারে লাপল্যাস উৎফুল্ল হয়ে
বলেছিলেন,
“কোন মুহুর্তে সমস্ত বস্তুর
অবস্থান ও তাদের উপর প্রয়োগিত শক্তি যদি জানা থাকে তাহলে বিশ্বের কিছুই আর অজানা
থাকবে না।“
মধ্য- অষ্টাদশ শতাব্দীতে মাইকেল
ফ্যারাডে (১৭৯১-১৮৬৭) তড়িত-চৌম্বকীয় শক্তি আবিষ্কার নিউটনীয়ান ফিজিক্সেকে প্রথম
সমস্যার মুখোমুখি করল। ফ্যারাডে প্রমাণ করলেন, তড়িৎ প্রবাহ চৌম্বক শক্তি তৈরি করে
আর, পরিবর্তনশীল চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করে তড়িৎ শক্তি। জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল
(১৮৩১-১৮৭৯) ফ্যারাডের আবিষ্কারের গাণিতিক প্রমান করেন। তিনি আরও প্রমান করেন তড়িৎ ও
চৌম্বক শক্তি একসাথে মিলে তৈরী করে তড়িৎ-চৌম্বকীয় তরঙ্গ বা আলো। তরঙ্গ প্রবাহের
জন্য একটি মাধ্যম প্রয়োজন, যেমন শব্দ তরঙ্গেরও মাধ্যম হল বাতাস বা এয়ার, সমুদ্র
তরঙ্গের মাধ্যম হল জল। একটি পরীক্ষিত সত্য হল আলো শূন্যের মধ্য দিয়ে চলাচল করতে
পারে, সুতরাং প্রশ্ন হল, তড়িৎ-চৌম্বকীয়
তরঙ্গ বা আলোর মাধ্যম কি? চিন্তা-ভাবনা করে বিজ্ঞানীরা ঠিক করলেন বিশ্বব্যাপী একটি
অদৃশ্য মাধ্যম আছে যার মধ্য দিয়ে আলো চলাচল করে। এই মাধ্যমটির নাম দেওয়া হল ইথার।
আলো বা তড়িৎ-চৌম্বকীয় তরঙ্গের বিস্তার হয় ইথারের ঢেউ খেলান স্পন্দনে। ইথারের অস্তিত্ত্ব মেনে নিলে ম্যাক্সওয়েলের তড়িৎ-চৌম্বকীয়
তরঙ্গ নিউটনীয়ান ফিজিক্স মেনেই চলে। ইথারের অবশ্য কিছু বিশেষ ধর্ম থাকতে হবে, যেমন
হতে হবে অতিশয় হাল্কা ও সূক্ষ্ম যা গ্রহ-তারাদের উপর কোন প্রভাব ফেলবে না, একই
সাথে ইথারকে হতে হবে যথেষ্ঠ দৃঢ় যাতে তড়িত-চৌম্বকীয় তরঙ্গ এর মধ্য দিয়ে চলাচল করতে
পারে। উনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে ইথারের অস্তিত্ব প্রমান করার জন্য অনেক চেষ্টা করার
হয়েছিল। আলো যদি সত্যিই ইথারের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত একটি তরঙ্গ হয়, তাহলে ইথারের
মধ্য দিয়ে আলোর উৎসের দিকে অগ্রসর হলে এবং বিপরীত দিকে অগ্রসর হলে আলোর তরঙ্গের
গতিতে আমরা পার্থক্য দেখতে পাব, দিক যেমন স্রোতের অনুকূলে ও বিপরীত দিকে সাঁতার
দিলে সময়ের পার্থক্য দেখি। মোটামুটি এই তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে বিজ্ঞানীরা
ইথারের অস্তিত্ব প্রমানের চেষ্টা করলেন। আলবার্ট আব্রাহাম মাইকেলসন (১৮৫২-১৯৩১) ও
এডওয়ার্ড উইলিয়াম মোরলে (১৮৩৮-১৯২৩) ইথারের অস্তিত্ব প্রমানের সবচাইতে বিখ্যাত পরীক্ষাটি করেছিলেন। একটি আলোর রেখাকে দুইভাগে
ভাগ করে একভাগ পৃথিবীর গতির দিকে
অপরটি পৃথিবীর গতির ৯০ ডিগ্রী কোনে পাঠান
হয়। দু’টি রেখাকেই আয়নায় বারবার প্রতিফলিত করে পুনরায় যুক্ত করা হয়। ইথারের
অস্তিত্ব সত্যি হলে আলোর রেখার গতিপথের পার্থক্যের জন্য ব্যতিচার বা ইন্টারফারেন্স প্যাটার্ন দেখা যাবে।
কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও মাইকেলসন ও মোরলে কোন ইন্টারফারেন্স প্যাটার্ন দেখতে পারলেন না এবং ইথারের অস্তিত্বের কোন
প্রমান পাওয়া গেল না। ইথারের অস্তিত্বের প্রমান না পেয়ে কিছু বিজ্ঞানীর চেষ্টা
করলেন কেন ইথারের অস্তিত্বের প্রমান পাওয়া যাবে না তার ব্যাখ্যা দেবার। ডাচ
বিজ্ঞানী হেন্ড্রিক লরেঞ্জ ও আইরিশ বিজ্ঞানী জর্জ ফিটজেরাল্ড একটি ব্যাখ্যা দিলেন যা
লরেঞ্জ-ফিটজেরাল্ড কনট্রাকসন নামে পরিচিত। এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী ইথারের মধ্য দিয়ে কোন
কঠিন পদার্থ গেলে তার দৈর্ঘের সংকোচন হয়, সেই সংকোচনের কারনেই মাইকেলসন ও মোরলে কোন ইন্টারফারেন্স
প্যাটার্ন দেখতে পারেন নি।
আইনস্টাইন ইথারজনিত সমস্যা সম্বন্ধে
যথেষ্ট ওয়াকিবহাল ছিলেন। আমরা জানি তার প্রথম গবেষণাপত্রটি ছিল
ইথারের উপর। ১৯০১ সাল পর্যন্ত আইনস্টাইন ইথারের
অস্তিত্বে বিশ্বাসী ছিলেন। জুরিখের ই টি এইচ-এ ছাত্রাবস্থায় ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ
করার জন্য তিনি কিছু পরীক্ষা করার কথা ভেবেছিলেন, কিন্তু প্রফেসর ওয়েবারের আপত্তিতে করতে
পারেন নি। আইনস্টাইন একবার বলেছিলেন, হঠাৎ করেই, অন্তর্দৃষ্টি থেকেই নতুন ধারণা বা চিন্তা
আসে। একই সাথে বলেছিলেন, অন্তর্দৃষ্টি অবশ্য অনেকদিনের বুদ্ধিগত অভিজ্ঞতা ছাড়া অন্য কিছু নয়।
আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদ
আবিষ্কারের পিছনেও ছিল অনেকদিনের বুদ্ধিগত অভিজ্ঞতা, দীর্ঘদিনের ক্লাসিক সাহিত্য, হিউম, কান্ট ইত্যাদি পড়া, সর্বোপরি তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে
জ্ঞান ও দক্ষতা। এর সাথে যুক্ত হয়েছিল থট এক্সপেরিমেন্ট বা মানসিক বা চিন্তা-পরীক্ষা
করার বিশেষ ক্ষমতা, যেটা সম্ভবত আরাউর স্কুলে উৎসাহ পেয়েছিল।
রিলেটিভিটি বা আপেক্ষিকতাবাদের মূল ধারণা খুব সহজ; অবস্থা
নির্বিশেষে পদার্থ বিজ্ঞানের নিয়মগুলি সবার জন্যই এক। একটি বিশেষ ক্ষেত্রে ধারণাটি
সহজগম্য। মনে করা যাক, একজন মাটিতে বসে আছে, আরেকজন রেলগাড়ির কামরায় বসে আছে ও
রেলগাড়িটি কোন ঝাঁকুনি ছাড়া একই গতিতে একই দিকে ছুটে যাচ্ছে। দুজনেই একই ভাবে
ফ্লাস্ক থেকে ঢেলে চা খেতে পারবে, বল উপরে ছুড়ে দিয়ে লুফে নিতে পারবে, অবস্থার
তারতম্যের জন্য কোন বিঘ্ন ঘটবে না। সত্যি বলতে কোন পরীক্ষা করেই বলা যাবে না কোন
লোকটি স্থির আর কোন লোকটি গতিশীল। মাটিতে বসে থাকা ব্যক্তি ভাবতে পারে তিনি স্থির,
রেলগাড়ির লোকটি গতিশীল আছেন। উল্টোদিকে,রেলগাড়ির লোকটি ভাবতে পারেন তিনি স্থির
আছেন, বসে থাকা লোকটি গতিতে আছেন। আইনস্টাইন তাই বললেন, পরম বা সার্বভৌম স্থির বলে
কিছু নেই। একজন অন্যজনের পরিপ্রেক্ষিতে গতিশীল। আর অবশ্যই দুজনেই, গ্রহ, তারা
ইত্যাদির পরিপ্রেক্ষিতে গতিশীল। ১৯০৫
সালে আইনস্টাইন যে আপেক্ষিকতার যে তত্ত্ব দিয়েছিলেন সেটা এই বিশেষ অবস্থার জন্য,
যেখানে পর্যবেক্ষকরা একজন আরেকজনের প্রেক্ষিতে গতিশীল, একই গতিতে একই দিকে (বা
সরলরেখায়)। পর্যবেক্ষকের এই বিশেষ অবস্থার জন্যই স্পেশাল থিয়োরী অফ রিলেটিভিটি
বা বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদ বলা হয়। এই ধরনের পর্যবেক্ষকদের বলা হয় ইনারসিয়াল ফ্রেম
পর্যবেক্ষক।
আইনস্টাইনের সময় আলোকে তরঙ্গ হিসাবেই ভাবা হত, ইথার
মাধ্যমের কম্পন। আমরা জানি শব্দও তরঙ্গ, হাওয়ার কম্পন। মনে করা যাক, শব্দ তরঙ্গ
১০০ মাইল গতিতে আমার দিকে ছুটে আসছে। আমি যদি শব্দের উৎসের দিকে ১০ মাইল গতিতে
ছুটে যাই, তাহলে, দেখব শব্দ আমার দিকে ১১০ মাইল গতিতে ছুটে আসছে। যদি শব্দের উৎসের
বিপরীতে ১০ মাইল গতিতে ছুটি, তবে শব্দের গতি দেখব ৯০ মাইল। আইনস্টাইনের মনে প্রশ্ন
এসেছিল, আলোর ক্ষেত্রেও কি একই কি ব্যবহার দেখা যাবে? অনেক অল্প বয়সেই তার মনে
একটা প্রশ্ন আসে, যদি কেউ আলোর সমান গতিতে দৌড়ায় তো সে কি দেখবে? শব্দ তরঙ্গের
সাথে তুলনা করলে, একটি হিমায়িত বা জমাট তড়িৎচুম্বকীয় ক্ষেত্র দেখা উচিত। কিন্তু ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ বা অভিজ্ঞতা কোনটাই হিমায়িত, জমাট তড়িৎচুম্বকীয় ক্ষেত্রের পক্ষে সায়
দেয় না। তিনি অনুভব করলেন আলোর তরঙ্গ অন্য সব তরঙ্গের চাইতে আলাদা।
বিজ্ঞানীরা সাধারণত দুইটি নিয়ম মেনে তাদের তত্ত্ব বা থিয়োরী
করেন, (১) ইন্ডাক্টিভ বা আবেশক পদ্ধতি ও
(২) ডীডাক্টিভ বা আনুমানিক পদ্ধতি। ইন্ডাক্টিভ পদ্ধতিতে বিজ্ঞানী যথেষ্ট পরিমাণ
পরীক্ষালব্ধ ফলাফল বিশ্লেষণ করে তত্ত্ব খাড়া করার চেষ্টা করেন যা পরীক্ষালব্ধ
ফলাফলকে ব্যাখ্যা করতে পারে এবং আগামী কোন পরীক্ষাতে কি ফলাফল হবে পারে তার
পূর্বাভাস দিতে পারে। ডীডাক্টিভ পদ্ধতিতে বিজ্ঞানী কিছু মূল অনুমান করেন, এবং সেই
অনুমানের ভিত্তিতে তত্ত্ব খাড়া করেন। আইনস্টাইনের পছন্দ ছিল ডীডাক্টিভ পদ্ধতি।
তিনি দুটি অনুমান করলেন,
(১) একই দিকে একই গতিতে চলন্ত সমস্ত পর্যবেক্ষকের (বা
ইনারসিয়াল ফ্রেম) জন্য পদার্থ বিজ্ঞানের নিয়ম বা আইনগুলি সমান। উদাহরণ হিসাবে
পৃথিবীর প্রেক্ষিতে স্থির পর্যবেক্ষক এবং সরলরেখায়
একই গতিতে ছুটে যাওয়া মহাকাশযানের পর্যবেক্ষক, দুজনের জন্যই বিজ্ঞানের একই নিয়ম।
(২) শূন্যে আলোর গতিবেগের একটি নির্দিষ্ট মান আছে, যা আলোর
উৎসের অবস্থার উপর নির্ভর করে না।
আইনস্টাইন এখন একটি সমস্যায় পড়লেন, দ্বিতীয় অনুমানটি প্রথম
অনুমানের বিরুদ্ধে যায়। ধরা যাক, দুইজন পর্যবেক্ষক আলোর গতি মাপছে,
একজন রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন, অন্যজন, রেলগাড়িতে। রেলগাড়িটি আলোর উৎসের দিকে
সরলরেখা বরাবর ১০০০ মাইল গতিতে ছুটে যাচ্ছে। দাঁড়িয়ে থাকা পর্যবেক্ষক আলোর গতি
মাপবে প্রতি সেকেন্ডে ১৮৬০০০ মাইল। রেলগাড়ির পর্যবেক্ষক (যেহেতু তিনি আলোর উৎসের
দিকে ১০০০ মাইল প্রতি সেকেন্ডে এগিয়ে যাচ্ছেন) কিন্তু মাপবে ১৮৭০০০ মাইল প্রতি
সেকেন্ডে। কিন্তু প্রথম অনুমান অনুযায়ী, যেহেতু বিজ্ঞানের নিয়ম দুই জনের কাছেই এক,
আলো চলাচলের নিয়ম ও এক। দুজনেরই আলোর গতিবেগ ১৮৬০০০ মাইল প্রতি সেকেন্ডে মাপা উচিত
ছিল। আইনস্টাইন অনেক চেষ্টা করেও এই
অসঙ্গতি দূর করতে পারলেন না। তিনি তার বন্ধু বেসোর সাথে এই অসঙ্গতি নিয়ে অনেক
আলোচনাও করেছেন, কিন্তু কোন সুরাহা হয়নি। প্রায় এক বছর ধরে আইনস্টাইন এই সমস্যা
নিয়ে চিন্তা করেছেন, তারপর হঠাত করেই তার মাথায় এর উত্তর এল। তিনি বুঝতে পারলেন,
সময় সম্বন্ধে আমাদের ধারনার পরিবর্তন করা দরকার। আদিকাল থেকে স্থান ও সময়কে পরম,
নিশ্চিত বলে ধরা হয়, মনে করা হয় স্থান ও সময়ের আলাদা আলাদা স্বত্ব বা পরিচয় আছে। স্থান ও সময় সম্বন্ধে নিউটন বলেছিলেন,
“স্থান, পরম ও নির্ভেজাল, তার নিজস্ব প্রকৃতিতে, বাহ্যিক কিছুর সাথে সম্পর্ক ছাড়াই, সর্বদা একই এবং স্থাবর থাকে। “
এবং,
“সময়, পরম, নির্ভেজাল ও
গাণিতিক, তার নিজস্ব প্রকৃতি থেকে বাহ্যিক কিছুর
সাথে সম্পর্ক ছাড়াই সমানভাবে প্রবাহিত হয়।“
আইনস্টাইনের পূর্বে কেউ স্থান ও সময়ের
এই চিরন্তন ধারনাকে বদলানোর দরকার বলে মনে করেন নি। তিনি একটি মানসিক পরীক্ষা করলেন। ধরা যাক রাম রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে
আছে। তার দুপাশে সমান দূরত্বে ব্জ্রপাত হল। রাম দেখবে দুই জায়গায় একই সাথে ব্জ্রপাত
হল। এখন মনে করা যাক ঠিক রামের সামনেই একটি রেলগাড়ির কামরায় শ্যাম আছে। রেলগাড়িটি যদি স্থির থাকে তবে শ্যামও দেখবে দুই জায়গায় একই সাথে ব্জ্রপাত হল। কিন্তু রেলগাড়িটি যদি চলতে থাকে তাহলে শ্যামের কাছে ব্জ্রপাত দুটি একসাথে হয়েছে
মনে হবে না, কারন যে সময়ে আলো শ্যামের কাছে পৌছবে, সেই সময়ের মধ্যে শ্যাম কোন একদিকে এগিয়ে
গেছে। আইনস্টাইন বললেন, দুটি ঘটনা একজন স্থির পর্যবেক্ষকের কাছে এককালে ঘটেছে মনে হলেও একজন গতিশীল পর্যবেক্ষকের
কাছে এককালে ঘটেছে মনে হবে না। তিনি তাই চিরন্তন ধারণার বিরুদ্ধে গিয়ে
বললেন, পরম বা বিশুদ্ধ সময় বলে কিছু নেই। সময় আপেক্ষিক, প্রত্যেক পর্যবেক্ষকের আছে নিজস্ব
সময়। সময় সম্বন্ধে চিরন্তন ধারণা বদলানোর সাথে সাথে আইনস্টাইনকে স্থান সম্বন্ধে ধারণাও
বদলাতে হল। সময় যদি আপেক্ষিক হয়, স্থানকেও আপেক্ষিক হতে হবে। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদে, স্থান এবং সময় পৃথক সত্তা নয় বরং একটি সত্তা যাকে স্থান-কাল কন্টিনিয়াম বা ধারাবাহিকতা বলা
হয়। ধারাবাহিকতা কারণ আমাদের অভিজ্ঞতায় স্থান বা সময়ের কোনো ফাক বা শূন্যতা নেই। বন্ধু হাবিচকে লিখেছিলেন এই গবেষণার গতিবিদ্যা সংক্রান্ত অংশ তোমাকে আগ্রহী করবে। তৃতীয় গবেষণাপত্রের বেশিরভাগ জুড়েই ছিল আপেক্ষিকবাদ অনুযায়ী গতিবিদ্যা সংক্রান্ত
বিভিন্ন ফলাফল, যা নিউটনীয়ান গতিবিদ্যার থেকে অনেকটাই ভিন্ন। আপেক্ষিক গতিবিদ্যায়
স্থান এবং সময়ের সংমিশ্রন কিছু বিস্ময়
তৈরি করে, যেমন একটি চলমান ঘড়ির ধীরে চলে (সময়ের প্রসারণ বা টাইম ডাইলেশন), একটি চলমান যষ্টির দৈর্ঘ্য সংকোচন, বেগ সংযোজনের অদ্ভুত নিয়ম (যেমন আলোর গতি+ আলোর গতি=আলোর গতি) ইত্যাদি। প্রশ্ন উঠতে পারে দৈনন্দিন কার্যকলাপে কেন নিউটনীয়ান গতিবিদ্যা সফল, কেন আমরা আপেক্ষিকবাদ অনুযায়ী গতিবিদ্যার
প্রতিফলন দেখতে পাই না? এর উত্তর সহজ। আপেক্ষিক গতিবিদ্যার সূত্রগুলি এমন
ভাবে তৈরী যে কেবলমাত্র চলমান বস্তুর গতি যদি আলোর গতির কাছাকাছি হয়, তাহলেই নিউটনীয় গতিবিদ্যা বা মেকানিক্সের
বদলে আপেক্ষিক গতিবিদ্যা প্রযোজ্য হয়। আলোর গতিবেগ প্রচণ্ড বেশি, দৈনন্দিন জীবনে এর কাছাকাছি গতিবেগ উপলন্ধি করা অসম্ভব।
আইনস্টাইনের চতুর্থ গবেষণাপত্রটি
আপেক্ষিকতাবাদের একটি পরিণাম। কনরাদ হাবিচকে লিখেছিলেন,
“ইলেক্ট্রোডায়নামিক পেপারের একটা
পরিণাম আমার মাথায় এসেছে। আপেক্ষিকতা ও ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ একসাথে প্রমাণ করে কোন
বস্তুর ভর, বস্তুর সামগ্রিক শক্তির সরাসরি
পরিমাপ।“ তিন পাতার একটি গবেষণাপত্রে তিনি প্রমাণ করেন পৃথিবীর সবচাইতে বিখ্যাত
সমীকরণ,
E=mc2,
ভর গুনিত আলোর বেগের স্কোয়ার বা বর্গ
হচ্ছে শক্তি; একটি বস্তুর ভর তার শক্তির পরিমাপ। যেহেতু আলোর গতিবেগ খুবই বেশি (১৮৬০০০ মাইল
প্রতি সেকেন্ড) তাই খব অল্প পরিমাণ ভরকে যদি শক্তিতে বদলান যায় তাহলে বিশাল পরিমাণ
শক্তি পাওয়া যেতে পারে। অংক কসে দেখা যেতে পারে ১ কিলোগ্রাম ভর শক্তিতে পরিবর্তিত
হলে তার পরিমাপ হবে প্রায় ২৫ বিলিওন কিলোওয়াট ঘণ্টা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের
সময় হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে এর উদাহরণ আমরা দেখেছি ।
১৯০৫ সালে আইনস্টাইন তার গবেষণায় অবিশ্বাস্য
রকম উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় দিয়েছিলেন, আলোর কোয়ান্টা তত্ত্ব, অণুর অস্তিত্বর প্রমান ও ব্রাউনিয়ান
গতির ব্যাখ্যা,
সময় ও কাল সম্বন্ধে চিরন্তন ধারণা বদলে
দেওয়া আপেক্ষিকতাবাদ ও বিজ্ঞানের সবচাইতে সুপরিচিত সমীকরণ। তার বোন মাজার কথা অনুযায়ী আইনস্টাইন ভেবেছিলেন, সুপরিচিত জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাগুলি
অচিরেই আকাদেমিক জগতে স্বীকৃতি পাবে। কিন্তু খুব অল্প বিজ্ঞানীই আইনস্টাইনের
গবেষণার সত্যিকার মূল্য বুঝতে পেরেছিলেন।এদের মধ্যে ছিলেন উইলহেম ওয়েন (আনালেন ডার ফিজিকের সম্পাদক )। ১৭ তম সংখ্যা প্রকাশিত হওয়ার পরপরই
তিনি জোহান লাউবের কাছে আসেন এবং পরের সেমিনারে
আইনস্টাইনের গবেষণা নিয়ে আলোচনা করতে বলেন। বার্লিনে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক আইনস্টাইনের
গবেষণার গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন। আপেক্ষিকতাবাদ প্রকাশনার পরপরই তিনি
আপেক্ষিকতার উপর একটি সেমিনার দেন। তিনি ছিলেন সেই সময় আপেক্ষিকতা বুঝতেন
এমন খুব অল্প কয়েকজনের একজন। অন্য ব্যক্তিটি ছিলেন পোলিশ প্রফেসর
উইটকোস্কি আপেক্ষিকতাবাদের গুরুত্ত্ব বুঝেছিলেন। আইনস্টাইনের গবেষণা পড়ার পর তার সহকর্মীদের কাছে ঘোষণা করেছিলেন, "একজন নতুন কোপার্নিকাসের জন্ম হয়েছে! আইনস্টাইনের গবেষণা পড়ুন।"
অল্প কয়েকজন বিজ্ঞানী তার গবেষণার মর্ম
বুঝলেও আইনস্টাইন আকাডেমিক জগতের কাছে অনেকটাই অজানা থেকে গিয়েছিলেন, এমনকি ১৯০৭ সালেও ম্যাক্স বর্ন আইনস্টাইনের গবেষণা সম্বন্ধে সচেতন ছিলেন না। আইনস্টাইন অবশ্য তার গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছিলেন, ১৯০৬ সালে ছয়টা ও ১৯০৭ সালে ১০ গবেষণাপত্র
প্রকাশ করেন। ১৯০৭ সালে আইনস্টাইন বার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে
প্রাইভেটডোজেন্টশিপের জন্য আবেদন করেন। প্রাইভেটডোজেন্ট কোন বেতন পায় না, শুধুমাত্র শিক্ষা দেবার অধিকার পায়। নিয়ম অনযায়ী আবেদন পত্রের সাথে ‘হাবিলিটেশন থিসিস’ বলে একটা অপ্রকাশিত গবেষণা পত্র দিতে হয়। কিন্তু বিশেষ ক্ষেত্রে, আবেদনকারী বিশিষ্ট কৃতিত্ত্বর আধিকারী হলে, সেই নিয়ম অগ্রাহ্য করা হয়। আইনস্টাইন
হাবিলিটেশন থিসিস’ জমা দেন নি।সেই ত্রুটির কারণে তার আবেদন পত্র প্রত্যাখ্যান করা হয়। সেই ত্রুটি সংশোধন করে হাবিলিটেশন থিসিস’ জমা দেবার পরেই আইনস্টাইনকে প্রাইভেডোজেন্টশিপ
দেওয়া হয়েছিল এবং আনুষ্ঠানিকভাবে আইনস্টাইন আকাডেমিক জগতের সদস্য হয়েছিলেন। আমি ঘটনাটি বিবৃতি করলাম এইজন্য যে মিরাকল ইয়ারের দুবছর পরে ১৯০৭ সালেও বার্ন বিশ্ববিদ্যালয় আইনস্টাইনকে যথেষ্ট কৃতিত্বর
অধিকারী মনে করেন নি।
ধীরে ধীরে অবশ্য বিজ্ঞানীরা আইনস্টাইনের
গবেষণার গুরুত্ত্ব বুঝতে পারলেন এবং একজন গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানী হিসাবে আইনস্টাইনের
খ্যাতি বাড়তে লাগল। এই রকম গুণী লোক আকাডেমিক জগতের বাইরে, পেটেন্ট অফিসে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন, অনেক কাছেই তা দৃষ্টকটু মনে হল। অবশেষে, প্রধানত আইনস্টাইনের থিসিস
সুপারভাইসর আলফ্রেড ক্লাইনারের উদ্যোগে, আইনস্টাইনের জন্যই জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের
সহযোগী অধ্যাপকের (অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর) পদ তৈরী করা হয়। আইনস্টাইন পেটেন্ট অফিসের চাকরি ছেড়ে
১৫ অক্টোবর, ১৯০৯ সালে জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। এরপর তিনি আর ফিরে তাকান নি। ১৯১১ সালে, তিনি একজন পূর্ণ অধ্যাপক হিসাবে প্রাগ
বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান, এক বছর পরে, তিনি ইটিএইচ, জুরিখ, তার আলমা-মাটার (যেখান থেকে তিনি ডিপ্লোমা পেয়েছিলেন) পূর্ণ অধ্যাপক হিসাবে নিযুক্ত হন। ১৯১৪ সালে, তিনি কায়সার উইলহেম ইনস্টিটিউট ফর ফিজিক্সের পরিচালক (১৯১৪-১৯৩) এবং বার্লিনের হামবোল্ট ইউনিভার্সিটির একজন অধ্যাপক নিযুক্ত হন, তার চুক্তিতে একটি বিশেষ ধারা ছিল যা
তাকে শিক্ষাদানের দায়িত্ব থেকে মুক্তি দেয়।
আইনস্টাইনের খ্যাতি বৃদ্ধির সাথে
সাথে তার স্ত্রীর সাথে দূরত্ব বাড়তে থাকে, তাদের সম্পর্কের অবনতি হয়। সম্ভবত নিজের
বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন ভেঙ্গে যাওয়ায় মিলেভার বিষন্নতা বাড়তে থাকে। মরিস সলোভাইন
পরে স্মৃতিচারনে বলেছেন, তাদের অলিম্পিয়া আসরে কচ্চিৎ মিলেভা অংশগ্রহণ করতেন।
মিলেভার বিষন্নতা তারাও অনুভব করতেন। সম্পর্ক ঠিক করার জন্য আইনস্টাইন নিজেও বিশেষ
কোন উদ্যোগ নেন নি। মিলেভা তার বন্ধুর কাছে অনুযোগ করেছিলেন, আইনস্টাইন তার
বিজ্ঞান নিয়েই ব্যস্ত, সংসারে বিন্দুমাত্র মন নেই। ১৯১২ সালে কিছুদিনের জন্য আইনস্টাইন বার্লিনে
যান। সেখানে তার মাসতুতো বোন এলসার সাথে
নতুন করে পরিচয় হয়। বাল্যকালে এলসা আইনস্টাইনের খেলার সঙ্গিনী ছিলেন। এলসার বিয়ের
পর যোগাযোগ কমে যায়। স্বামীর মৃত্যুর পর এলসা দুই কন্যা ইলসে ও মারগটকে নিয়ে বার্লিনে
তার পিতার কাছে থাকতেন। মিলেভার বিষন্নতা, নৈরাশ্য ও নানাবিধ অভিযোগ আইনস্টাইনকে
তিক্ত করে তুলেছিল। সহজেই এলসা ও আইনস্টাইনের মধ্যে একটি সম্পর্ক গড়ে উঠল। এলসাকে
আইনস্টাইন লিখেছিলেন,
“কিন্তু আমার ভালবাসার জন্য কাউকে থাকতে হবে, নইলে জীবন দুর্বিষহ। আর এই কেউ তুমি, তুমি এই সম্পর্কে কিছু করতে পারবেন না, যেহেতু আমি তোমার কাছে অনুমতি চাইছি
না। “
এলসার সাথে সম্পর্ক আইনস্টাইন গোপন
করার চেষ্টা করলেও মারিক জানতে পারে, তাদের তিক্ত
সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়। মারিকের অনিচ্ছা সত্ত্বেও ১৯১৪ সালে আইনস্টাইন
বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। এলসার সান্নিধ্যে আইনস্টাইন ও মারিকের সম্পর্কে
আরও ভাঙ্গন ধরে। অবশেষে আইনস্টাইনের বিবাহবিচ্ছেদের প্রস্তাব মারিক মেনে নেন।
আইনস্টাইন তখন পর্যন্ত নোবেল প্রাইজ পান নি, কিন্তু সকলেই জানত তার নোবেল প্রাইজ
পাওয়াটা সময়ের ব্যাপার। বিবাহ-বিচ্ছেদের একটি সর্ত ছিল, আইনস্টাইন নোবেল প্রাইজ পেলে তার
সমস্ত টাকা মারিক পাবেন। ৯ নভেম্বর ১৯২২ আইনস্টাইন ফটো ইলেকট্রিক এফেক্টের জন্য
নোবেল প্রাইজ পান। বিবাহবিচ্ছেদের সর্ত মত প্রাইজের টাকা মারিককে পাঠিয়ে দেন।
বিবাহ বিচ্ছেদের কিছুদিন পর আইনস্টাইন এলসাকে বিয়ে করেন। এই বিবাহ সুখের হয়েছিল। ২০
নভেম্বর ১৯৩৬ এলসার মৃত্যু হয়।
বিজ্ঞানে আইনস্টাইনের একটি বিশিষ্ট
অবদান হল মহাকর্ষের একটি জ্যামিতিক তত্ত্ব যা তিনি সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ বলে অবহিত
করেছিলেন। ১৯০৭ সালে সম্ভবত নভেম্বর মাসে, আইনস্টাইনের এক উপলব্ধি হয় যা তিনি “আমার জীবনের সবচাইতে সুখকর চিন্তা” বলে অভিহিত করেছিলেন। জাপানে একটি লেকচারে সেই সুখকর চিন্তার
কথা বলেছিলেন,
“বার্নের পেটেন্ট অফিসে চেয়ারে বসে ছিলাম, হঠাত করেই উপলব্ধি করলাম, কারুর যদি মুক্ত-পতন (ফ্রি ফল) হয়, সে তার ওজন অনুভব করবে না।“
এই সুখকর চিন্তা থেকেই তৈরী হল ‘সমতা নীতি” বা প্রিন্সিপল অফ ইকুইভ্যালেন্স,
“মহাকর্ষ এবং ত্বরণের স্থানীয় প্রভাব সমান”
প্রিন্সিপল অফ ইকুইভ্যালেন্সের উপর
ভিত্তি করে গড়ে ওঠে আইনস্টাইনের মহাকর্ষ তত্ত্ব। সমতা নীতি বোঝবার জন্য আইনস্টাইন একটি
মানসিক পরীক্ষা করেন। মনে করা যাক রামকে একটি বন্ধ চেম্বারে
রেখে চেম্বারটি মহাশূন্যে গ্রহ, তারাদের থেকে অনেকদূরে রেখে দেওয়া হল। গ্রহ, তারাদের থেকে অনেক দূরে থাকার জন্য রামের উপর কোনপ্রকার মহাকর্ষীয় বল প্রয়োগ হবে
না, রাম নিজের ওজন বুঝতে পারবে না। যদি তার পকেট থেকে চাবির গোছা পড়ে যায়, তবে চাবির গোছা নিচে পড়বে না, ভাসতে থাকবে। তাকে দড়ি দিয়ে নিজেকে বেঁধে রাখতে হবে মেঝের সাথে, না হলে মেঝের সাথে সামান্যতম ধাক্কায়
সে উপরে উঠে যাবে। এখন মনে করা যাক চেম্বারটিকে একটি দড়ি
বেঁধে উপরদিকে, একটি শক্তি দিয়ে সমানভাবে টানা হচ্ছে। তখন রাম কিন্তু তার ওজন অনুভব করবে। যদি তার পকেট থেকে চাবির গোছা পড়ে যায়, তবে চাবির গোছা নিচেই পড়বে। রাম মনে করবে তার উপর কোন অভিকর্ষীয় বল কাজ করেছে, কোন অবস্থাতেই সে বুঝতে পারবে না তার
উপর
অ্যাকসিলারেসন বা ত্বরণ কাজ করছে, অভিকর্ষীয় বল নয়।
আইনস্টাইন সমতা নীতি” বা প্রিন্সিপল অফ ইকুইভ্যালেন্স
আরও একটি সমস্যার সমাধান করল। আমরা জানি প্রতিটি বস্তুর একটি অভিকর্ষীয় ভর (গ্রাভিটেশনাল মাস) আছে, যা তার ওজন নির্ণয় করে। প্রতিটি বস্তুর একটি
জাড্য ভরও (ইনারশিয়াল মাস) আছে যা নির্ণয় করে বস্তুটিকে স্থানচ্যুত
করতে নূন্যতম বল কত প্রয়োগ করা প্রয়োজন। নিউটন দেখেছিলেন অভিকর্ষীয় ভর ও জাড্য ভর সবসময়ই সমান, কিন্তু তার কোন ব্যাখ্যা তিনি দেন
নি। এটি কি কেবলই সমাপতন না অন্য কিছুর অভিব্যক্তি। উপরের মানসিক পরীক্ষাটি প্রমাণ
করে অভিকর্ষীয় ভর ও জাড্য ভর সমান এটা সমতা নীতির
অভিব্যক্তি।
আইনস্টাইন তার মহাকর্ষ তত্ত্বের নামকরণ করেছিলেন সাধারণ আপেক্ষিকতার
তত্ত্ব বা জেনারাল থিয়োরী অফ রিলেটিভিটি। সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদে বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদের সীমাবদ্ধতা (কেবলমাত্র ইনারসিয়াল ফ্রেমে প্রযোজ্য)
নেই। ১৯০৭ সালে তিনি সাধারন আপেক্ষিকতাবাদের উপর প্রথম গবেষণাপত্রটি প্রকাশ
করলেন। তিনি দেখালেন অভিকর্ষীয় বল যত বৃদ্ধি
পাবে, ঘড়ির কাঁটা তত আস্তে চলবে। সেই সাথে আইনস্টাইন অনেক ভবিষ্যদ্বাণী
করতে সক্ষম হলেন, যেমন আলোর বেঁকে যাওয়া। আলো সরল রেখায় যায়। গণনা করে আইনস্টাইন দেখালেন অভিকর্ষীয় বলের প্রভাবে আলো বেঁকে যেতে পারে।
তার আরেকটি ভবিষ্যদ্বাণী হল, সূর্য জাতীয় বিশাল ভরের বস্তু থেকে
যদি আলো নির্গত হয়, মহাকর্ষীয় বলের প্রভাবে সেই আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পাবে। এই ঘটনা গ্রাভিটেশনাল রেড সিফট নামে পরিচিত। দুইটি ভবিষ্যদ্বাণীই
পরে পরীক্ষাগারে প্রমানিত হয়েছিল। তিনি মহাকর্ষীয় তরঙ্গেরও
ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, বিজ্ঞানীরা অতি সম্প্রতি যার প্রমাণ করলেন।
১৯০৭ সালে শুরু হলেও সাধারন আপেক্ষিকতাবাদ সম্পূর্ণ হতে আরও আট বছর লেগেছিল, ১৯১৫ সালের নভেম্বর মাসে আইনস্টাইন সাধারন আপেক্ষিকতাবাদের তত্ত্ব সম্পূর্ন করতে পারলেন। সাধারণ আপেক্ষিকতায়, আইনস্টাইন মহাকর্ষের একটি জ্যামিতিক চিত্র দিয়েছেন: মহাকর্ষ স্থান-কালের বক্রতা ছাড়া আর কিছুই নয়। ভরের উপস্থিতিতে, স্থান-কাল বেঁকে যায়। এখানে উল্লেখ্য যে, বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদের জন্য প্রয়োজনীয়
গণিত খুবই সাধারনস্তরের, হাই স্কুল পড়ুয়ারাও করতে পারে। কিন্তু সাধারন আপেক্ষিকতাবাদের গণিত
খুব উচ্চস্তরের। বিশেষ শিক্ষার প্রয়োজন।
আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ থেকেই
শুরু হয় বর্তমানে যা আমরা সৃষ্টিতত্ত্ব বা মহাকাশবিজ্ঞান (কসমোলজি) বলে জানি।
১৯১৫ সালে জার্মান বিজ্ঞানী কার্ল সোয়ারসচাইল্ড সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের জটিল সমীকরণের একটি সমাধান করে আইনস্টাইনকে
পাঠিয়েছিলেন। সোয়ারসচাইল্ড পোস্টডাম মানমন্দির বা অবজারভেটরির অধিকর্তা বা ডিরেক্টর
ছিলেন, কিন্তু সেই সময় তিনি যুদ্ধে ছিলেন। আইনস্টাইন সোয়ারসচাইল্ডের গবেষণায় মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন, “আমি আশা করিনি এত সহজভাবে এই
জটিল সমস্যা সমাধান করা যাবে।“ সোয়ারসচাইল্ডের সমাধানে একটি বিশেষত্ব ছিল যে, কোন বস্তুর যদি যথেষ্ট ভর থাকে ও তার
আয়তন যদি একটি বিশেষ আয়তনের কম হয়, সেই বস্তু থেকে আলো বেরোতে পারবে না। প্রিন্সটনের বিজ্ঞানী জন হুইলার এই আশ্চর্যজনক সমাধানটির নাম দিয়েছিলেন, ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণ গহ্বর। আইনস্টাইন নিজে অবশ্য ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণ
গহ্বর তত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন না, এমন কি ১৯৩৯ সালে একটি গবেষণাপত্রে কেন ব্ল্যাক হোল অস্তিত্ব থাকতে পারে না তার
যুক্তি দিয়েছিলেন। অনেক পরে অবশ্য ব্ল্যাক হোলের অস্তিত্ব
সংশয়াতীত প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। মহাবিশ্বে অনেক ব্ল্যাক হোল আছে, এমনকি মনে করা হয় আমাদের গ্যালাক্সির
কেন্দ্রে একটি ব্ল্যাক হোল আছে।
সাধারণ আপেক্ষিকতার একটি ভবিষ্যদ্বাণী
হল যে আলোর রশ্মি একটি বিশাল বস্তুর পাশ দিয়ে গেলে বেঁকে যাবে। প্রকৃতপক্ষে, নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্বেও বিশাল বস্তুর
পাশ দিয়ে গেলে আলো বেঁকে যায়, কিন্তু নিউটনীয় মহাকর্ষে তুলনায় সাধারণ আপেক্ষিকতায় আলো প্রায় দ্বিগুন বেশি বাঁকবে। আইনস্টাইন গণনা করে দেখলেন সূর্যের পাশ দিয়ে গেলে আলোর রশ্মি প্রায় ১.৯ আর্ক-সেকেন্ড বাঁকবে। তিনি
অ্যাস্ট্রোনোমার বা জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের অনুরোধ করেন তার গণনা পরীক্ষা করে সাধারণ
আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্বের সত্যতা প্রমানিত করতে। কিন্তু এই পরীক্ষা সহজ ছিল না। প্রথমত সাধারন অবস্থায় আকাশের কোন
তারার অবস্থান নিখুতভাবে জানতে হবে। তারপর অপেক্ষা করতে হবে পূর্ণ সূর্যগ্রহনের
জন্য। সেই সময় দেখতে হবে তারার অবস্থানের পরিবর্তন হয়েছে কি না। ২৯ মে, ১৯১৯ পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময়, জ্যোতির্বিদ স্যার আর্থার এডিংটন এবং
তার সহযোগীরা এডিংটনের নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানী এই দূরুহ কাজটি সম্পন্ন করলেন। সূর্যের
কারণে আলোর বাঁক পরিমাপ করা হয়েছিল, একই সাথে ব্রাজিলের সোব্রাল এবং আফ্রিকার একটি ছোট দ্বীপ প্রিন্সিপে। এডিংটনের আলোর বেঁকে যাওয়া দেখতে
পেলেন। আইনস্টাইনের গণনা নির্ভুল প্রমাণ করে আলো ঠিক ১.৯ আর্ক-সেকেন্ড বেঁকে গেল।
সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ প্রমানিত হল।
শুরুতেই আমরা আইনস্টাইনের অসামান্য জনপ্রিয়তার
কথা বলেছি। অনেকে মনে করেন এই অসম্ভব জনপ্রিয়তার কারন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত
ইউরোপের অবস্থা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, যা দীর্ঘ চার বছর ধরে ইউরোপকে ধ্বংস
করেছিল, আনুষ্ঠানিকভাবে ১১ নভেম্বর ১৯১৮ সালে সমাপ্ত হয়েছিল। এটি ছিল বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে মারাত্মক সংঘাতগুলির মধ্যে একটি। যুদ্ধে ৯০ লক্ষ সৈন্য এবং ৭০ লক্ষ সাধারণ মারা যায়। ৬ কোটিরও বেশি ইউরোপীয়ান অকথ্য দুর্দশার শিকার হয়েছিল। ১৯১৯ সালের শুরুতে, ইউরোপ ছিল একটি নিরাশাময় অন্ধকার জায়গা। ইউরোপকে উৎসাহিত করার জন্য কিছু অজুহাত প্রয়োজন ছিল। ইউরোপ সেই অত্যন্ত প্রয়োজনীয় অজুহাত খুঁজে পায় আইনস্টাইনের গণনা আলো বিশাল বস্তুর
আকর্ষণে বেঁকে যাবে এবং এডিংটন দ্বারা তার প্রমাণ। বিজ্ঞানের আবিষ্কার সচরাচর আকাদেমিক জগতেই সীমাবদ্ধ থাকে, সংবাদপত্রে স্থান পায় না। কিন্তু এডিংটনের আলোর বেঁকে যাওয়ার পরীক্ষা সমস্ত প্রধান সংবাদপত্রে এসেছিল এবং
রাতারাতি আইনস্টাইনের খ্যাতি যা সীমাবদ্ধ ছিল বিজ্ঞানী মহলে, ছড়িয়ে পড়ল সাধারণ মানুষের মধ্যে। আপেক্ষিকতা সাধারণ মানুষের কল্পনাকে উসকে
দেয়। আইনস্টাইনকে নিয়ে অনেক গল্প এবং মজাদার ছড়া লেখা হয়েছিল। এরকম একটি ছড়া ১৯২২ সালে পাঞ্চ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল, যার অনুবাদ (আমার করা) এই রকম;
এক তরুণী ছিল নাম দীপ্তি,
ছিল তার আলোর চেয়েও বেশি গতি,
সে একদিন বার হয়ে গেল
আপেক্ষিক ভাব,
আর আগের রাতেই ফিরে এল।
আইনস্টাইন কোয়ান্টাম মেকানিক্স বা বলবিদ্যারও
পথিকৃৎ। ১৯০৫ সালে তিনি আলোর কোয়ান্টা তত্ত্ব
দিয়ে ফটো-ইলেকট্রিক এফেক্ট ব্যাখ্যা করেছিলেন। সেই সময় বিজ্ঞানীরা স্পেসিফিক হিট বা আপেক্ষিক তাপের পরীক্ষার ফলাফল যথাযথ ব্যাখ্যা
করতে পারছিলেন না। ১ গ্রাম কোন বস্তুর তাপমান ১ ডিগ্রী
সেন্টগ্রেড বাড়ানোর জন্য যে তাপ প্রয়োজন তাকে সেই বস্তুর স্পেসিফিক হিট বা আপেক্ষিক
তাপ
বলা হয়। আইনস্টাইন ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের ব্ল্যাক বডি তত্ত্বের উপর নির্ভর করে স্পেসিফিক
হিটের একটি তত্ত্ব খাড়া করেন যা আপেক্ষিক তাপের উপর পরীক্ষার ফল অনেকটাই ব্যাখ্যা করতে
পারে। ১৯০৫ সালে আলোর কোয়ান্টা তত্ত্বে আলোকে শক্তির প্যাকেট হিসাবে দেখেছিলেন, আলাদা কণা যার নির্দিষ্ট মোমেন্টাম বা ভরবেগ আছে হিসাবে নয়। ১৯০৯ সালে তিনি আলোকে আলাদা কণা হিসাবে ভাবতে শুরু করেছিলেন। একটি বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘তাত্ত্বিক পদার্থ বিজ্ঞানের পরের স্তরের অগ্রগতি আলোর তত্ত্ব দেবে যা তরঙ্গ ও কণা তত্ত্বের সংমিশ্রণ হবে। তরঙ্গ ও কোয়ান্টা বা কণা পারস্পারিক আসামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না।‘ ১৯০৯ সালে আইনস্টাইনের এই ভাবনার সাথে তৎকালীন বিজ্ঞানীরা একমত ছিলেন না কিন্তু
পরে এই ভাবনার উপর ভিত্তি করেই কোয়ান্টাম মেকানিক্সের
অন্যতম প্রধান শাখা ওয়েভ মেকানিক্স বা তরঙ্গ বলবিদ্যার সূচনা হয়। ১৯২৩ সালে ফরাসী বিজ্ঞানী লুই দী ব্রগলী
প্রথম তার পি এইচ ডি থিসিসে ওয়েভ পার্টিকল
ডুয়ালিটি বা তরঙ্গ-কণা দ্বৈত সম্বন্ধের কথা বলেন। থিসিসের মুখবন্ধে তিনি লিখেছিলেন, “নির্জনতা এবং ধ্যানের মধ্যে দীর্ঘ
প্রতিফলনের পরে, আমার হঠাৎ ধারণা হয়েছিল যে ১৯০৫ সালে আইনস্টাইন যে আবিষ্কারটি করেছিলেন তা সমস্ত
পদার্থ কণা এবং বিশেষত ইলেক্ট্রনগুলিতে প্রসারিত করে সাধারণীকরণ করা উচিত।“ ওয়েভ পার্টিকল ডুয়ালিটি বা তরঙ্গ-কণা দ্বৈত সম্বন্ধে প্রতিটি কণার একটি তরঙ্গ সত্তা আছে। প্রতিটি কণা যেমন ইলেকট্রনের একটি তরঙ্গ সত্তা আছে, তার একটি তরঙ্গ দৈর্ঘ্য আছে, একটি কম্পাংক আছে। কি প্রকার পরীক্ষা করলে ইলেকট্রনের তরঙ্গ সত্তার প্রমাণ পাওয়া যাবে তাও তিনি বলে
দিলেন, “ইলেকট্রনের প্রবাহ যদি খুব ছোট ছিদ্র দিয়ে যায়, যার মাত্রা (বা মাপ) ইলেকট্রন তরঙ্গ দৈর্ঘ্যর চাইতে ছোট
তবে ডিফ্রাকসনের ঘটনা দেখা যাবে।“ দী ব্রগলীর ভবিষ্যদ্বাণী সত্য প্রমাণ করে পরীক্ষাগারে সত্যই ইলেকট্রনের
ডিফ্রাকসন দেখা গেল।
পল লাঞ্জেভিন ছিলেন দী ব্রগলীর থিসিস
সুপারভাইসর। লাঞ্জেভিন থিসিসটির একটি প্রতিলিপি আইনস্টাইনকে পাঠান। আইনস্টাইন মুগ্ধ হয়ে বলেন, “আমার বিশ্বাস, বিজ্ঞানে বর্তমান বিভ্রান্তিকর অবস্থার মধ্যে এটা একটা ক্ষীন আলোর রেখা।“
লক্ষ্য করলে দেখা যাবে পদার্থবিজ্ঞানের
যে অগ্রগতি আমি আলোচনা করেছি তা হয়েছে ইউরোপের মাটিতে। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের পরের
অগ্রগতি আসে অপ্রতাশিত জায়গা থেকে, ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষ থেকে। ৪ জুন, ১৯২৪ ঢাকা থেকে এক তরুণ বাঙ্গালী অধ্যাপক, সত্যেন্দ্র নাথ বসু, আইনস্টাইনকে একটি প্রবন্ধ পাঠান যেখানে
তিনি বিকিরণকে গ্যাস ধরে এবং সংখ্যা-তত্ত্ব প্রয়োগ করে প্ল্যাঙ্ক সূত্র বার করেন। আইনস্টাইন প্রবন্ধটির গুরুত্ত্ব বুঝতে পেরে জার্মান ভাষায় অনুবাদ করে প্রকাশের
ব্যবস্থা করেন। জন্ম নেয় বোস-আইনস্টাইন সংখ্যাতত্ত্ব। বোস অনুযায়ী একই শক্তির দুটি ফোটনকে একে অপরের থেকে আলাদা করা যায় না, এবং সংখ্যাতত্ত্বের গণনায়ও আলাদা কণা
হিসাবে গন্য করা যাবে না। আব্রাহাম পায়াস লিখেছিলেন,
প্রাথমিক পর্যায়ের কোয়ান্টাম মেকানিক্সের উপর চারটি বৈপ্লবিক গবেষণা হল; (১)
ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের ব্ল্যাক বডি বিকিরন আইন, (২) আইনস্টাইনের আলোর শক্তির প্যাকেট,
(৩) নীল বোরের হাইড্রোজেন বর্ণালীর ব্যাখ্যা (এই সম্বন্ধে আমরা কিছু আলোচনা করিনি)
ও (৪) সত্যেন বোসের সংখ্যাতত্ত্ব প্রয়োগ করে ব্ল্যাক বডি বিকিরন আইন। উল্লেখ্য যে ম্যাক্স
প্ল্যাঙ্ক, আইনস্টাইন ও নীল বোর তিন জনকেই নোবেল প্রাইজ দিয়ে পুরষ্কৃত করা হয়েছিল,
কিন্তু সত্যেন বোসকে নয়।
বোস তার সংখ্যাতত্ত্ব ফোটন গ্যাসের
উপর প্রয়োগ করেছিলেন। আইনস্টাইন প্রয়োগ করলেন কোয়ান্টাম কণা গ্যাসের উপর। একটি
আশ্চর্য ঘটনা দেখলেন। কণাদের মধ্যে যদি কোন আকর্ষণ শক্তি না থাকে, পরম শূণ্যের কাছাকাছি তাপমানে, ক্ল্যাসিকাল
কণার গ্যাস গ্যাস হিসাবেই থেকে যায়। কিন্তু কোয়ান্টাম কণার গ্যাস ঘনীভূত হয়ে এক প্রকার তরল পদার্থে
পরিণত হয়। এই ঘটনাকে বলা হয় বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেশন। বোসের নাম যুক্ত থাকলেও এটা একান্ত ভাবেই আইনস্টাইনের আবিষ্কার
এবং কোয়ান্টাম মেকানিক্সে আইনস্টাইনের
শেষ গুরুত্বপূর্ন অবদান।
কোয়ান্টাম মেকানিক্সে এর পরের পদক্ষেপ
নেন অস্ট্রিয়ান বিজ্ঞানী আরউইন শ্রোয়েডিঞ্জার। পদার্থবিজ্ঞানে শিক্ষিত শ্রোয়েডিঞ্জার দার্শনিক হবার কথা ভেবেছিলেন। আইনস্টাইনের দী ব্রগলী তত্ত্বের প্রশংসা তাকে তরঙ্গ-কণা দ্বৈত সম্বন্ধের উপর চিন্তাভাবনা করতে উদ্বুদ্ধ করে। তিনি একটি সমীকরণ তৈরী করেন যা নির্ধারণ
করে দী ব্রগলীর তরঙ্গ-কণার ব্যবহার। শ্রোয়েডিঞ্জার ইকুয়েশন নামে পরিচিত এই সমীকরণ ওয়েভ মেকানিক্স বা তরঙ্গ বলবিদ্যার
সূচনা করে। আইনস্টাইন প্রথমে ওয়েভ মেকানিক্সকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। কিন্তু পরে জার্মান বিজ্ঞানী ম্যাক্স বর্ন
এর একটি ব্যাখ্যা দেন যা তিনি মানতে পারেন নি। বর্ন বললেন
শ্রোয়েডিঞ্জারের ওয়েভ বা তরঙ্গ আণুবীক্ষণিক
কণা কোথায় আছে তা বলে না, বরঞ্চ আণুবীক্ষণিক কণা কোথায় থাকতে পারে তার প্রবাবিলিটি বা সম্ভাবনার কথা বলে। নিউটনীয়ান মেকানিক্সের নিশ্চয়তার বদলে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সম্ভাবনা
আইনস্টাইন মানতে চাইলেন না। জার্মান
বিজ্ঞানী ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ আরেক ধাপ এগিয়ে ১৯২৭ সালে আনসার্টেনিটি প্রিন্সিপল
বা অনিশ্চয়তা নীতির প্রস্তবনা করেন। এই নীতি অনুযায়ী
কোনভাবেই একইসাথে আণুবীক্ষণিক কণা যথা ইলেকট্রনের অবস্থান ও ভরবেগ নিশ্চিত ভাবে
জানা সম্ভব নয়। তার এই নীতি অনুযায়ী যত নির্ভুল ভাবে ইলেকট্রনের অবস্থান মাপা হবে,
ভরবেগ মাপে তত বেশি ভুল হবে। একই ভাবে যদি ইলেকট্রনের ভরবেগ যত
নির্ভুল ভাবে মাপা হবে, তার অবস্থানের মাপে ততটাই খুঁত থেকে যাবে।
আইনস্টাইন কোয়ান্টাম মেকানিক্সকে
নিতে চাইছিলেন কিন্তু ক্ল্যাসিকাল ফিজিক্সকে বাদ দিয়ে নয়। তার
কাছে ক্ল্যাসিকাল ফিজিক্সের কজালিটি বা কার্য-কারন নীতি প্রিয় ছিল, তাকে পরিত্যাগ
করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি নানা প্রকার মানসিক পরীক্ষা করে কোয়ান্টাম
মেকানিক্সের এই সম্ভাব্য ব্যাখ্যা বা প্রবাবিলিস্টিক ইন্টারপ্রেটেশন ভুল প্রমাণ
করার চেষ্টা করলেন, কিন্তু কৃতকার্য হলেন না। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি মনে করতেন
কোয়ান্টাম মেকানিক্স তত্ত্ব অসম্পূর্ণ, সম্পূর্ণ হলে কোয়ান্টাম মেকানিক্স কেবল
সম্ভাবনার কথা বলে এই তত্ত্ব খারিজ হবে। তার বিখ্যাত উক্তি আছে, “ভগবান জুয়ো খেলেন
না।“
পরবর্তি জীবনে আইনস্টাইন প্রধানত সমস্ত মৌলিক শক্তিকে ইউনিফিকেশন
বা একাকীকরনের অথার্ৎ একটিমাত্র তত্ত্বের সাহায্যে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন।
উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় একসময় অড়িৎ শক্তি ও চৌম্বক শক্তি পৃথক পৃথক শক্তি বলে ভাবা
হত। ম্যাক্সওয়েল প্রমাণ করলেন তারা দুইটি পৃথক শক্তি নয়, বরং একটি শক্তিরই দুই
রূপ। আমরা এখন চারটি মৌলিক শক্তির কথা জানি, (১) মহাকর্ষ, (২) তড়িৎ-চুম্বকীয়, (৩)
শক্তিশালী পারমাণবিক ও (৪) দুর্বল পারমাণবিক শক্তি। ১৯০৫ সালে আইনস্টাইন যখন গবেষণা শুরু করেন, তখন
মাত্র দুইটি মৌলিক শক্তির কথা জানা ছিল, মহাকর্ষ ও তড়িৎ-চুম্বকীয় শক্তি। আইনস্টাইন
এই দুই শক্তিকে একাকীকরনের চেষ্টা করেছিলেন। মৌলিক শক্তি একাকীকরনের উপর তার প্রথম
গবেষণা পত্র প্রকাশিত হয় ১৯২২ সালে। অল্প কিছু সময় বাদ দিলে মৃত্যুর আগে অবধি
তিনি ইউনিফিকেশনের ব্যার্থ চেষ্টাই করে
গিয়েছেন। উল্লেখ্য যে চারটি মৌলিক শক্তির একাকীকরনের প্রচেষ্টা এখনও চলছে এবং বিশ্বের
বেশ কিছু বিশিষ্ট বিজ্ঞানী সেই চেষ্টার সাথে যুক্ত আছেন। বর্তমান প্রচেষ্টা প্রধানত
দুইটি তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে চলছে, (১) স্ট্রিং থিয়োরী ও (২) লুপ কোয়ান্টাম
গ্রাভিটি। দুইটিই যথেষ্ট জটিল তত্ত্ব আর দুটিতেই উচ্চ পর্যায়ের গণিতের প্রয়োজন।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, মৌলিক শক্তির ইউনিফিকেশন প্রচেষ্টা আজ পর্যন্ত সফল হয়
নি।
১৯৩২ সালের ডিসেম্বর মাসে একটি
আইনস্টাইন তার স্ত্রী এলসাকে নিয়ে আমেরিকায় যান। মার্চ ১৯৩৩-তে তার জার্মানীতে
ফিরে আসার কথা ছিল। কিন্তু ইতিমধ্যে ১৯৩৩ সালে, হিটলার জার্মানীতে ক্ষমতায় আসেন করেন এবং ইহুদিদের উপর অত্যাচার শুরু
করেন। আইনস্টাইন আর জার্মানি ফিরে আসেন
নি। ইউরোপে ফিরে সাময়িকভাবে বেলজিয়ামে কিছুদিন থেকে আবার আমেরিকায় পাড়ি দেন এবং প্রিন্সটন
বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। মৃত্যুর অব্যবহিত অবধি তিনি সেখানেই ছিলেন, ১৯৪০ সালে আমেরিকার নাগরিকত্ব নেন।
অবশেষে ১৮ এপ্রিল, ১৯৫৫ তার মৃত্যু ঘটে।
