Tuesday, 22 January 2019

জিওর্দানো ব্রূনো - বিজ্ঞানবেদীতে জীবনাহুতি






এক্সোপ্লানেট বা সৌরমণ্ডলীর বাইরে পৃথিবীর মত গ্রহের খোজে নাসা[1] ২০০৯ সালের মার্চ মাসে “কেপলার স্পেস টেলিস্কোপ” নামে একটি মানমন্দির বা পর্যবেক্ষনাগার মহাকাশে স্থাপন করে নয় বছর ধরে টেলিস্কোপটি বিভিন্ন তথ্য যোগাড় করে সন্দেহাতীত ভাবে এক্সোপ্লানেটের অস্তিত্ব প্রমাণ করে[2]প্রমাণ করে  পৃথিবী কোন বিশেষ গ্রহ নয়, সৌরমন্ডলীর বাইরে পৃথিবীর মত হাজার হাজার গ্রহ আছে। অবাক হতে হয় ঠিক এই কথা বলার জন্যই চারশ বছর আগে জিওর্দানো ব্রূনোকে প্রান দিতে হয়েছিল।

জিওর্দানো ব্রূনো ছিলেন ইতালীর একজন দার্শনিক, বিজ্ঞানী এবং সর্বোপরি একজন মুক্তমনা চিন্তাবিদ ১৫৪৮ সালের জানুয়ারী অথবা ফেব্রুয়ারী মাসে (সঠিক জন্মতারিখ জানা নেই) নেপলসের একটি ছোট সহর নোলা’-তে ব্রূনোর জন্ম পিতা জিওভানি ব্রূনো এবং মা ফ্রাউলিসা সাভোলিনো বাল্য বয়সে খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত করার সময় তার নাম রাখা হয় ফিলিপ্পো ব্রূনো সেই সময় ইতালী স্পেনের রাজা  দ্বিতীয় ফিলিপের  শাসনাধীন ছিল এবং জিওভানি ব্রূনো নেপলসে ফিলিপের সৈন্যদলে কাজ করতেন। সম্ভবত রাজার প্রতি আনুগত্য দেখানোর জন্যই জিওভানি তার ছেলের  নাম রাখেন ফিলিপ্পো অনেক পরে, ২৪ বছর বয়সে, খ্রীষ্টধর্মের  যাজকপদে নিযুক্ত হওয়ার সময় তিনি নাম নেন জিওর্দানো  জর্ডান নদী খ্রীস্টানদের কাছে পবিত্রএর হিব্রূ নাম হল ইয়ার্দানোএই ইয়ার্দানো থেকেই জিওর্দানো শব্দটির উৎপত্তি

 ব্রূনো তার জীবনের প্রথম ১৪ বছর নোলা সহরে বাস করেছিলেন মনে হয় ছেলেবেলার সেই ১৪ বছর তার জীবনে গভীর দাগ কেটেছিল কারন পরে তিনি  নিজেকে ইল নোলান ব্রূনোবা নোলানবাসী ব্রূনো বলে অভিহিত করতে ভালবাসতেনতার বিভিন্ন লেখায়ও আমরা নোলার অধিবাসীদের কথা, তাদের জীবনের বিভিন্ন ঘটনার উল্লেখ পাই। ব্রূনোর ছেলেবেলার কথা বিশেষ জানা নেই একটি ঘটনার উল্লেখ পাই আমরা। ঘটনাটি এইরকম,

“একদিন সকলের অজান্তে তার বিছানায় একটি সাপ উঠে পড়ে ছোট্ট ব্রূনো সেইদিন পর্যন্ত কোন কথা বলেননি সবাইকে অবাক করে ব্রূনো তার প্রথম কথা বলেন যেটি একটি পূরো বাক্য, “আমার বিছানায় সাপ উঠেছে

সম্ভবত গল্পটি অতিরঞ্জিত, কিন্তু ঘটনাটি থেকে মনে হয় ব্রূনো তুলনামূলক ভাবে বেশি বয়সে কথা বলা শেখেন। আরও মনে হয় তিনি বয়সের তুলনায় অতিরিক্ত পরিণীত ছিলেনব্রূনোর লেখা পড়েও আমরা জানতে পারি খুব অল্প বয়সেই তার মধ্যে স্বাধীন চিন্তা করার প্রবণতা আসে। তার বাড়ী থেকে ভিসুভিয়াস পর্বত দেখা যেত। দূর থেকে তিনি দেখতেন বিশ্রী নিরাভরণ, অনাকর্ষণীয় এক পর্বতমালা। কোন একদিন জিওভানি ব্রূনোকে ভিসুভিয়াস পর্বতের কাছে নিয়ে যান। অবাক হয়ে তিনি দেখেন দূর থেকে দেখা   অনাকর্ষণীয় নিরাভরণ পর্বতটি আসলে অজস্র সবুজ গাছ-পালায় ঢাকাপরে তিনি লিখেছিলেন ঘটনাটি তাকে প্রথম সতর্ক করে যে দৃষ্টিও প্রতারণা করতে পারে তার মনে প্রশ্ন জাগে, ‘কোন কিছু সম্বন্ধে নিশ্চিত হবার ভিত্তি কি?

নোলার প্রাথমিক স্কুলে ব্রূনোর শিক্ষা শুরু হয় ব্রূনোর স্মৃতিশক্তি ছিল অসাধারন (পরবর্তি জীবনে বহুবার তিনি তার অসাধারন স্মৃতিশক্তির প্রমাণ দিয়েছেন)স্বভাবতই নোলার স্কুলে তিনি যথেষ্ট কৃতিত্বের পরিচয় দেন সেই সময় ইউরোপে উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা ছিল প্রথানত ক্যাথলিক গীর্জার ব্যবস্থাপনায় পড়াশুনায় ব্রূনোর আগ্রহ কৃতিত্ব দেখে ১৪ বছর বয়সে ব্রূনোর পিতা তাকে নেপলসের এক  মঠে ভর্তি করেন সেই সময়ের প্রথা অনুযায়ী অনুমান করা যায় যে নেপলসের মঠে তিনি প্রধানত ভাষা, সাহিত্য, ল্যাটিন, ধর্মতত্ব, যুক্তি, গণিত, জ্যোর্তিবিদ্যা ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষালাভ করেন নেপলসের মঠেও তিনি যথেষ্ট বুৎপত্তির পরিচয় দেন এবং শীঘ্রই একজন পন্ডিত ব্যাক্তি হিসেবে স্বীকৃত হলেন তিনি আরও বিশেষভাবে পরিচিত  হলেন তার অসাধারন স্মৃতিশক্তির জন্য, এমন কি একবার পোপ দ্বারা রোমে আমন্ত্রিতও হয়েছিলেন তার এই বিশেষ ক্ষমতা প্রদর্শন করার জন্যভাল স্মৃতিশক্তি সকল সময়ই কার্যকরী ও উপযোগী, কিন্তু ব্রূনোর সময় ছিল  বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ন। সেই সময় ছাপাখানা চালু হলেও বই সহজলভ্য ছিল না আর দামও ছিল অত্যধিক। ছাত্র ও গবেষকদের জন্য ভাল স্মৃতিশক্তি তাই খুবই গুরুত্বপূর্ন ছিল। গ্রীক কবি ও দার্শণিক সিমোনাইডসকে ( খ্রীষ্টপূর্ব ৫৫৬-৪৬৮) স্মৃতিবিদ্যা শিল্পের (mnemonics)  আবিষ্কারক বলে মনে করা হয়, কিন্তু সম্ভবত আরও প্রাচীনকাল থেকেই এই শিল্প  সম্বন্ধে জানা ছিল। গল্পে আছে এক ভোজসভায়  সিমোনাইডস উপস্থিত ছিলেন। কোন কারনে তাকে ঘরের বাইরে যেতে হয়, এর মধ্যে ঘরের ছাদ ভেঙ্গে অন্যসব অতিথিরা মারা যান এবং তাদের শরীর এমনভাবে বিকৃত হয় যে তাদের চেনা যাছিল না। সিমোনাইডস কোন অতিথি কোথায় বসেছিলেন মনে রেখে তাদের চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন। এই ঘটনার পর সিমোনাইডস মনে রাখার জন্য ভিস্যুয়াল মেমরি বা চাক্ষুষ-স্মৃতি ব্যাবহার করার কথা বলেন। শেখান শব্দ বা বাক্যাংশের সঙ্গে ইঙ্গিতপূর্ণ চিত্র বা ছবি ব্যবহার করে স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করার কথা। রোমান সেনেটর কুইন্টাস করনিফিসিয়াস বাগ্মী হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন।  স্মৃতিশক্তির জন্য তিনিও কিছু কৌশল ব্যাবহার করতেন। ইতালীর  বিশিষ্ট আইনজ্ঞ পিটার অফ রাভেনা (১৪৪৮-১৫০৮) ফিনিক্স (Phoenix) নামে স্মৃতিবিদ্যা শিল্পের উপর বই লিখেছিলেন এবং আমরা  জানি ব্রূনো ছেলেবেলাতেই রাভেনার বইটি পড়েছিলেন।  কুইন্টাস করনিফিসিয়াস, পিটার অফ রাভেনার আবিষ্কারের সাথে নিজের বুৎপত্তি দিয়ে ব্রূনো স্মৃতিবিদ্যা শিল্পকে অনেক উন্নত পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। এই বিষয়ে তার বুৎপত্তি এতই ছিল যে  পরে যখন তিনি বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়াতেন, অনেক সময়ই এই বিদ্যা তার জীবিকা নির্বাহের  উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

নেপলসে থাকাকালীন ব্রূনো মধ্যযুগীয় দর্শণ আভেরিজমের”  প্রতি আকৃষ্ট হন দ্বাদশ শতাব্দীর মুসলমান দার্শণিক আভেরস, যিনি ইবন রসিদ নামেও পরিচিত, এই দর্শণের প্রতিষ্ঠাতা ইসলাম ধর্মের সাথে এরিস্টটলের মতাদর্শের মিলিয়ে আভেরিজমের সৃষ্টি। এই দর্শণের মূল বক্তব্য হল;

() ধর্ম ও দর্শণ দুইটি আলাদা বিষয়। দার্শণিক জগতকে  ধর্মীয় জগৎ থেকে পৃথকভাবে গণ্য করা প্রয়োজন।
() যুক্তিভিত্তিক জ্ঞান (ইসলাম) ধর্মভিত্তিক জ্ঞানের চাইতে শ্রেষ্ঠ

পশ্চিমের দার্শণিকরা খ্রীষ্টান  ধর্মের সাথে এরিস্টটলের মতাদর্শ মিলিয়ে ল্যাটিন আভেরিজম নামে এক বিকল্প দর্শণের প্রতিষ্ঠান করেছিলেন আভেরিজম দর্শণ অবশ্য ইসলাম ধর্মকে বিশেষ প্রভাবিত করতে পারেনি। ক্যাথলিক গীর্জাও  আভেরিজম দর্শণের নিন্দা করত, কিন্তু, ব্রূনো সারাজীবন এই দর্শনের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন মনে করতেন ধর্মীয় সংস্থাগুলির প্রাকৃতিক দর্শণের বিষয়ে কিছু বলার নেই এবং যুক্তিভিত্তিক জ্ঞান ধর্মভিত্তিক জ্ঞানের চাইতে শ্রেষ্ঠ প্রাচীন যুগে গ্রীক দার্শনিক হারমীস ট্রিসমেজিস্টাসের  লেখনক্রম  “হারমেটিক করপাস” থেকে শুরু হয়েছিল  হারমীটিক বা জ্ঞানবাদী দর্শন। ইউরোপের নবজাগরণে এই দর্শনের গুরুত্ত্বপূর্ন ভূমিকা ছিল।  ব্রূনো ক্যাথলিক খ্রীষ্টান  ধর্ম গ্রহণ প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন বা হারমেটিক বা  জ্ঞানবাদী।

ষোড়শ শতাব্দীর ইতালীতে শিক্ষিত-পন্ডিত ব্যাক্তিদের জন্য জীবিকানির্বাহের অল্পকিছু সুযোগই ছিল, বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপকের চাকুরী অথবা গীর্জার যাজকের চাকুরী। জ্ঞান আহরনই ব্রূনো তার জীবনের লক্ষ্য করেছিলেন। নেপলসের মঠের সন্ন্যাসীদের দেখে তার মনে হয়েছিল জ্ঞান আহরণ তাদেরও জীবনের লক্ষ্য। দেশের সমস্ত জমির দুই তৃতীয়াংশ দখলে থাকার জন্য ইতালীর গীর্জাগুলিও ছিল খুবই সম্পন্ন । বিভিন্ন ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের মধ্যে ডোমিনিকান সম্প্রদায়ের গীর্জা ছিল বিশেষভাবে ধনী ।  সম্ভবত নিরুপদ্রবে পড়াশুনা করে জীবন কাটানোর উদ্দেশ্যেই ব্রূনো ১৭ বছর বয়সে নেপলসের ডোমিনিকান[3] সম্প্রদায়ের গীর্জা স্যান ডোমিনিকো মাজিওরে যোগ দেন। একবছর শিক্ষানবীসের পর ১৫৭২ সালে তিনি গীর্জার যাজকের পদে নিযুক্ত হন। এরপর তিনি ধর্মতত্ত্ব পাঠে বিশেষ মনোযোগ দেন এবং ১৫৭৫ সালের জুলাই মাসে ডক্টরেট ডিগ্রী লাভ করেন। গীর্জার পাদ্রীর চাকুরীতে নিরুপদ্রবে পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব, সম্ভবত সেই আশাতেই ব্রূনো নেপলসের ডোমিনিকান সম্প্রদায়ের গীর্জায় ভর্তি হন। কিন্তু, তার অসামান্য পান্ডিত্যে গীর্জার কর্তৃপক্ষ মুগ্ধ হলেও, তার নিজস্ব স্বাধীন চিন্তাধারা, (গীর্জাদ্বারা) নিষিদ্ধ বইয়ের প্রতি আকর্ষন ইত্যাদি কারনে তিনি কর্তৃপক্ষের বিরাগভাজন হন।  সেই সময় ক্যাথলিক গীর্জায় স্বাধীন,  মৌলিক চিন্তার কোন অবকাশ ছিল না পরে তিনি গীর্জার  কর্তৃপক্ষ  সম্বন্ধে বলেছিলেন,

“(গীর্জার) কর্তৃপক্ষ শিক্ষানবিশের মনকে একটা শেকল  দিয়ে বেঁধে ফেলে এবং শিক্ষানবিশ সবচাইতে নিষ্ঠুর, নির্মম ও  সূক্ষ্ম ভন্ডামির দাসে পরিণীত হয়।“

শীঘ্রই ব্রূনো গীর্জার কর্তৃপক্ষের সাথে বিবাদে জড়িয়ে পড়লেন। ট্রিনিটি খ্রীষ্টান ধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ন  মতবাদ এই মতবাদ অনুযায়ী ঈশ্বর এক কিন্তু তার তিনটি ব্যক্তিরূপ আছে; পিতা, পূত্র (যিশু খ্রীষ্ট) ও পবিত্র আত্মা। ব্রূনো যদিও প্রকাশ্যে এই মতবাদ অস্বীকার করেন নি কিন্তু চার্চ কর্তৃপক্ষের ত্রিনিটির এই ব্যাখ্যা সম্বন্ধে  তার মনে সন্দেহ ছিল। তার নিজের  ব্যাখ্যা ছিল, পিতা - ইচ্ছাশক্তি বা ক্ষমতা, পূত্র - বুদ্ধিমত্ত্বা বা বোধশক্তি এবং  পবিত্র আত্মা হল ভালবাসা। নিষিদ্ধ লেখক  ধর্মতত্ত্ববিদ ডেসেডিয়াসিয়াস ইরাসমাসের[4] লেখা পড়ার জন্যও চার্চ কর্তৃপক্ষ একবার ব্রূনোকে সতর্ক করেছিল। নিষিদ্ধ বইয়ের প্রতি আগ্রহ, ট্রিনিটি সম্বন্ধে সন্দেহ, বিভিন্ন সময়ে চার্চের বিরুদ্ধ মত পোষন করা, কর্তৃপক্ষকে অগ্রাহ্য করা, সর্বোপরি নিজস্ব মৌলিক মতবাদ, ইত্যাদি কারনে ব্রূনো চার্চ কর্তৃপক্ষের বিরাগভাজন হলেন। ডোমিনিকান চার্চ কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে রোমান ইনকুইজিশন[5] বা ধর্মীয় আইন ভঙ্গ বা প্রচলিত ধর্মীয় মতবাদের বিরুদ্ধ মতবাদ পোষনের মামলা করার প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করল। 

ব্রূনো তার বিরুদ্ধে ইনকুইজিশনে প্রস্তুতির খবর পেয়ে নেপলস পরিত্যাগ করলেন। শুরু হল এক দীর্ঘ পরিব্রাজকের জীবন। ১৬ বছর তিনি ইউরোপের বিভিন্ন সহরে ঘুরে বেড়ান। সেই সময় অনেক পাদ্রীই জ্ঞানার্জনের জন্য বিভিন্ন সহরে, এমন কি বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়াত এবং তাদের জন্য গীর্জার দরজা সবসময়ই খোলা থাকত। ইতিমধ্যে ডোমিনিকান চার্চ ব্রূনোকে বহিষ্কার করে এবং পলাতক অপরাধী বলে ঘোষণা করে। ইতালীর বিভিন্ন সহর ঘুরে ব্রূনো জেনেভা পৌছলেন। জেনেভা ক্যালভিনি [6]সম্প্রদায়ের প্রটেষ্টান্টদের দখলে ছিল। মুক্তচিন্তাবিদদের জন্য জেনেভার ক্যালভিনি প্রটেষ্টান্টরা  রোমের গোঁড়া ক্যাথলিকদের চাইতে বেশী সহনশীল ছিল না। শীঘ্রই ব্রূনোর সাথে কর্তৃপক্ষের সংঘর্ষ শুরু হল। সংঘর্ষের মূল কারন এরিষ্টটলের[7] মতবাদ। সেই সময় সৃষ্টিতত্ত্ব সম্বন্ধে এরিষ্টটলের মতবাদ প্রায় পবিত্র বাইবেলের মতই অলংঘনীয় ছিল। প্রথম জীবনে ব্রূনো এরিষ্টটলের মতবাদে বিশ্বাসী হলেও পরে তিনি এই মতবাদের বিভিন্ন ত্রূটি বুঝতে পারেন এবং এরিষ্টটলের মতবাদের উপর বিশ্বাস হারান। তিনি মনে করতেন এরিষ্টটলের সৃষ্টিতত্ত্ব প্রকৃতির অণিমার সাথে মানানসই নয়। এরিষ্টটলের মতবাদে বিশ্বাসী  বিশিষ্ট জেনেভাবাসীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে তিনি বিরূপ মন্তব্য করেন। একটি ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে। নথিপত্র দেখে জানা যায়, ৬ই অগাস্ট, ১৫৭৯ প্রফেসর আঁন্তেনিও লা ফাঁয়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক, আক্রমনাত্বক বক্তব্য ছাপানোর জন্য ব্রূনো ও জনৈক মুদ্রাকর জাঁ বার্জেনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। জাঁ বার্জেন দাবী করেন ব্রূনো তাকে বাধ্য করেছিলেন ওই লেখা প্রকাশ করতে। জাঁ বার্জেনের একদিনের কারাদন্ড ও ৫০ ফ্লোরিন জরিমানা হয়। ব্রূনো স্বীকার করেন তার বক্তব্য প্রফেসর লা ফায়েকে ক্ষুব্ধ করেছে কিন্তু দাবী করেন তার বক্তব্য সঠিক ভাবে প্রকাশিত হয়নি।  তিনি কঠোর ভাবে তিরস্কৃত হন এবং জেনেভা পরিত্যাগ করতে বাধ্য  হন।  জেনেভা থেকে ব্রূনো ফ্রান্সের লিঁওন সহরে যান, কিন্তু সেখানে জীবিকানির্বাহের কোন ব্যবস্থা করতে না পেরে যান তুঁলজ সহরে।  তুঁলজ ধর্মীয় ব্যাপারে গোঁড়া হলেও সেখানকার শিক্ষা ব্যাবস্থা খুব উন্নত ছিল তুঁলজ বিশ্ববিদ্যালয়ে  ১০০০০ চেয়ে বেশি ছাত্র পড়াশুনা করত। ব্রূনোর একটি বিশিষ্ট গুণ ছিল সহজেই বন্ধুত্ব করার ক্ষমতা। শীঘ্রই তিনি তুঁলজের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে বন্ধুত্ব করলেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপকের চাকরী পেলেন। খ্রীষ্টপূর্ব ৩৫০ সালে এরিস্টটল  “On the Soul” (ল্যাটিনে “De Anima”) বাআত্মা নিয়েনামক  পুস্তকে আত্মা নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেছিলেন। আত্মা কি, কোথায় থাকে, কোথায় যায়, ইত্যাদি মানষের চিরন্তন  জিজ্ঞাসা। এরিস্টটলের বক্তব্য নিয়ে এখানে আলোচনার অবকাশ নেই সংক্ষেপে, তিনি মনে করতেন আত্মা জীবন্ত জিনিষের সারবস্তু এবং শরীর থেকে এর পৃথক অবস্থান নেই।  যতদূর জানা যায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্রূনো এরিষ্টটলের  আত্মা নিয়েপড়াতেন তুঁলজে থাকাকালীন ব্রূনোর নিজস্ব চিন্তাধারা একটি সুনির্দিষ্ট রূপ নিতে লাগল। স্বাভাবিকভাবেই এরিষ্টটলের “আত্মা” পড়ানোর সময় সেইসব চিন্তাধারার কথা বলতে লাগলেন, বেশিরভাগ ছাত্র এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ যেটা পছন্দ করল না।ব্রূনো যখন তুঁলজে ছিলেন সেই সময় প্রটেষ্টান্টদের সঙ্গে ক্যাথলিকদের গৃহযুদ্ধ চলছিল। তুঁলজ এবং নিকটবর্তী সহরগুলো যদিও ক্যাথলিকদের দখলে ছিল,  প্রটেষ্টান্টরা চেষ্টা করছিল সেগুলো দখল করার। ব্রূনো থাকাকালীন হূগেনটসরা (জার্মান প্রটেষ্টান্ট) চল্লিশবার তুঁলজের নিকটবর্তী সহরগুলি আক্রমণ করছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও কর্তৃপক্ষের অসন্তোষ এবং গৃহযুদ্ধের  কারনে ব্রূনো তুঁলজে ত্যাগ করে ১৫৮১’র  শেষদিকে প্যারিসে যান। প্যারিসে পরিচিতি পাওয়ার জন্য তিনি জনসাধারনের জন্য থমাস আকুয়ানার[8] (Thomas Aquinas)   ধর্মতত্ত্বের উপর ত্রিশটি ভাষণ দেন।  আকুয়ানার ধর্মতত্ত্বের উপর ব্রূনোর ভাষণ খুবই জনপ্রিয় হয়, ফ্রান্সের রাজা তৃতীয় হেনরিও সহ  প্যারিসের অনেক বিদ্দ্বজন  তার গুনগ্রাহী হনতৃতীয় হেনরি ব্রূনোকে প্যারিসের বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘রাজকীয় অধ্যাপক’ পদে নিয়োগ করেন। প্যারিসে থাকাকালীন ব্রূনো স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর উপর “দি আম্ব্রিস আইডিয়ারাম” বা চিন্তার ছায়াপথ নামে একটি বই লেখেন যা তিনি তৃতীয় হেনরিকে উৎসর্গ করেন। ভূমিকায় লিখেছিলেন,

আমার নাম এত ছড়িয়েছিল যে একদিন রাজা হেনরি তৃতীয় আমাকে ডেকে পাঠালেন এবং আমাকে জিজ্ঞেস করলেন যে আমার যে অত্যাশ্চর্য স্মৃতি তা কি জাদু শিল্প দ্বারা প্রাপ্ত না নিজস্ব, প্রাকৃতিক আমি তাকে প্রমাণ দেই যে এই স্মৃতিশক্তি বিজ্ঞান সম্মতভাবে তৈরি, জাদু শিল্পের দ্বারা নয়পরে আমি  “দি আম্ব্রিস আইডিয়ারাম”  নামে বইটি প্রকাশ করি  এবং তাকে উৎসর্গ করি  এর পর তৃতীয় হেনরি আমাকে প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজকীয় অধ্যাপক পদে নিয়োগ করেন।“

প্যারিসে সম্ভবত ব্রূনো তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় কাটিয়েছিলেন।  প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের  ছাত্ররা,   প্যারিসের বিদ্দ্বজনারা তাকে যথাযোগ্য সম্মান দিতেন।  রাজা হেনরি নিজেও তার গুনগ্রাহী ছিলেন। কিন্তু ব্রূনোর অশুভ প্রতিভা তাকে টেনে নিয়ে গেল ইংল্যান্ডে। রাণী (প্রথম) এলিজাবেথের শাসনাধীন ইংল্যান্ড  সেই সময় ইউরোপের মধ্যে সবচাইতে সহনশীল দেশ বলে পরিচিত ছিল। ধর্মীয় কারনে দেশত্যাগী সকল প্রকার মানুষ ইংল্যান্ডে আশ্রয় পেতেন।  ১৫৮৩ সালে রাজা তৃতীয় হেনরির একটি সুপারিশ পত্র নিয়ে ব্রূনো ইংলিশ চ্যানেল পার হয়ে লন্ডনে পৌছলেন এবং ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত মিশেল দি কাস্তেলনের বাড়িতে আশ্রয় নিলেন। প্রথমে তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষণ দেবার অনুমতি চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে একটি চিঠি দেন। চিঠিটি  পড়ে ব্রূনোর ব্যক্তিত্ত্ব  সম্বন্ধে কিছুটা অনুমান করা যায়। 

“অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে   বৈজ্ঞানিক ধর্মতত্ত্বে ডক্টরেট, বিশুদ্ধ ও কম ক্ষতিকারক  শিক্ষার অধ্যাপক, ইউরোপের সব বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রসিদ্ধ, অজ্ঞান ও ঘুমন্ত মন জাগ্রতকারী, নিষ্ঠুর ও অজ্ঞতার প্রতিবন্ধক, যিনি ব্রিটিশ না ইতালিয়ান, ছেলে না মেয়ে, সাধারন পাগড়ি না রাজমুকুট, রাজকীয় বর্ম না আলখাল্লা, আচ্ছাদিত না অনাচ্ছাদিত মস্তক বিচার না করে আলাপ-আলোচনায় সংযত, শান্ত, নম্র, বন্ধুত্বপূর্ন মনের সকল মানুষকেই ভালবাসেন, কেবলমাত্র নীচ, অসভ্য ছাড়া সবার কাঙ্ক্ষিত, অধ্যয়নশীল মহান মনের মানুষরা যার প্রশংসা করেন আর ভন্ড, মিথ্যেবাদীরাই যাকে ঘৃণা করে,  সেই নোলার জিওর্দানো ব্রূনোর অভিবাদন।“

 অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে ব্রূনো জনসাধারনের জন্য ভাষণ দেবার অনুমতি পেলেন। স্মৃতিশক্তির উপর তিনি কিছু ভাষণও দেন, কিন্তু অক্সফোর্ডবাসীর প্রতিক্রিয়া তার আশানুরূপ হল না। ইউনিভার্সিটিতে তার অধ্যাপক পদপ্রাপ্তির চেষ্টাও বিশেষ ফলপ্রসূ হল না। সবমিলিয়ে তার ইংল্যান্ড বাসের অভিজ্ঞতা সুখের হয়নি। পরে তিনি বিদ্রুপ করে লিখেছিলেন, 

“ইংল্যান্ড তার সাধারন মানুষদের নিয়ে গর্ব করতে পারে, অলসতা, অশান্তি, বর্বরতা ও খারাপ আচরণের জন্য সর্বোচ্চ পদের প্রতিযোগিতায় তাদের কেউ হারাতে পারবে না।“

একটি অপ্রীতিকর ঘটনার পর ব্রূনো অক্সফোর্ড ত্যাগ করতে ব্যাধ্য হলেন। পোলিশ রাজপুত্র আলবার্ট আলাস্কা দৌতকর্মে ইংল্যান্ড ভ্রমণ করছিলেন। ইংল্যান্ড রাশিয়াকে যুদ্ধাস্ত্র সরবরাহ করত। সেই যুদ্ধাস্ত্র রাশিয়া ব্যবহার করত পোলান্ডকে আক্রমণ করার জন্য। ইংল্যান্ডকে যুদ্ধাস্ত্র সরবরাহ থেকে নিরস্ত করার উদ্দেশ্যেই আলবার্ট আলাস্কা ইংল্যান্ড এসেছিলেন। তিনি অক্সফোর্ডে এলে তার মনোরঞ্জনের জন্য বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়; একটি অনুষ্ঠান হল সর্বসাধারনের জন্য  বিতর্ক সভা। সেই সময় ইংল্যান্ডে এই বিতর্কসভাগুলি খুব জনপ্রিয় ছিল। হাজার-হাজার ছাত্র-ছাত্রী, সহরের অভিজাত,  মানীজনদের সামনে  জ্ঞাণীগুনিরা কোন একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর তাদের বক্তব্য রাখতেন, তর্ক করতেন আলবার্ট আলাস্কার উদ্দেশ্যে আয়োজিত বিতর্কসভায় ব্রূনো অংশগ্রহণ করলেন এবং প্রকাশ্য অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপকদের সাথে কুশ্রী বিতর্কে জড়িয়ে পড়লেন এবং তাদের হেয় করলেন। তার নিজের কথায় কোন এক অধ্যাপকের একটি বক্তব্যে তিনি ১৫টি ভূল ধরিয়ে দেন। প্রকাশ্যে অধ্যাপকদের হেনস্তায় অসন্তুষ্ট ছাত্ররা ব্রূনোর বক্তব্যে বারবার বাধা দিতে লাগল এবং আয়োজকরা বিতর্কসভা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হলেন।  এই ঘটনার পর অক্সফোর্ডে কোন পদ পাওয়ার আশা থাকল না এবং ব্রূনো লন্ডনে ফিরে পুনরায় ফরাসী দূতের বাড়িতে আশ্রয় নিলেন  অক্সফোর্ডের ঘটনায় ব্রূনো খুবই ক্ষুব্ধ হন এবং “অ্যাশ ওয়েডনেস’ডে ডিনার” নামক তার বিখ্যাত বইটি লেখেন। অ্যাশ ওয়েডনেস’ডে খ্রীষ্টানদের একটি পর্ব। প্রাচীনকালে ইহুদীদের প্রায়শ্চিত্ত ও উপবাসের প্রথা এই পর্বটির উৎস। ইস্টার পর্বের ৪৬ দিন আগে মূলতঃ ক্যাথলিক খ্রিষ্টানরা  এই পর্বটি পালন করে।  মাটি থেকে আমাদের জন্ম এবং আবার মাটিতেই আমরা মিশে যাব, এর প্রতীক হিসাবে কপালে ছাইয়ের টিকা পরা পর্বটির একটি অঙ্গ।

 ব্রূনোর সময় নিকোলাস কোপারনিকাসের বিশ্বব্রম্বান্ডের সূর্যকেন্দ্রিক প্রতিরূপটি জানা থাকলেও সাধারনভাবে সবাই প্রখ্যাত গ্রীক দার্শনিক এরিস্টটলের (৩৮৪-৩২২ খ্রী।পূ।) ভূকেন্দ্রিক প্রতিরূপেই  বিশ্বাস করত। ভূকেন্দ্রিক প্রতিরূপ  অনুযায়ী পৃথিবী স্থিরএবং পৃথিবীকে কেন্দ্র করে আছে একাধিক স্ফটিকের গোলক,  এবং সেই গোলকগুলিতেপৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে চাঁদ‌, বুধশুক্রসুর্য্য, মঙ্গলবৃহস্পতিশনিএবং সবকিছুর বাইরের গোলকে আছে স্থির  তারার দলস্থির কারনগ্রহদের মত তারারা পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে না। গোলকগুলি স্ফটিকের হতেই হবে কারন পৃথিবী থেকে গ্রহ-তারাদের দেখতে পাওয়া যায়।   বিশ্বব্রম্বান্ডের এই প্রতিরূপটি   সবাইকে, বিশেষ করে তদানীন্তন ধর্মীয় সমাজকে খুশি করেছিল। বাইরের গোলকটিকে তারা স্থির করেছিলেন বিভিন্ন দেব-দেবীদের বাসস্থান হিসাবে।  কোপারনিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক প্রতিরূপে পৃথিবীকে কেন্দ্রবিন্দু থেকে সরানো হয়েছিল। একমাত্র চাঁদই পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরত।  পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহরা স্থির সূর্যের চারিপাশে ঘুরত। যদিও আজ আমরা জানি যে কোপারনিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক প্রতিরূপই আমাদের বিশ্বের সঠিক প্রতিরূপ, কিন্তু সেই সময় চার্চের কর্তৃপক্ষ তা মানতে চায় নি। আমরা জানি গ্যালিলিও গ্যালিলিকে কোপারনিকাসের মতবাদের সপক্ষে মত দেওয়ার জন্য হেনস্তা হতে হয়েছিল। ব্রূনো কোপারনিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক প্রতিরূপে বিশ্বাস করতেন। তার ক্ষুরধার বুদ্ধি এরিস্টটলের ভূকেন্দ্রিক প্রতিরূপের ত্রূটিগুলি এবং, কোপারনিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক প্রতিরূপের গুণগুলি সহজেই উপলব্ধি করতে পেরেছিল। কোপারনিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক প্রতিরূপ ব্যাখ্যা করে ব্রূনোর প্রথম বই “অ্যাশ ওয়েডনেস’ডে ডিনার”এটি একটি অসাধারন বই প্রথমেই ব্রূনো তার পাঠকদের জানালেন তাদের তিনি কি পরিবেশন করছেন,
এই ভোজটি একই সাথে মুখ্য ও গৌণ, এ নিয়ে তুমি গর্বও করতে পার আবার লজ্জাও পেতে পার,  এটা পবিত্রকর আবার অপবিত্রকরও। ভোজটি তিক্ত আবার মিষ্টিও। এই ভোজে তুমি খুশি হতে পার আবার রাগও করতে পার।“
সেই সময়কার প্রথা অনুযায়ী ব্রূনো বইটি প্রকাশ করলেন কোপারনিকাসের মতবাদে বিশ্বাসী থিয়োফিল নামে এক দার্শনিক, স্মিথ নামে এক বিদ্বান যুবক, প্রূডেনসিয়াস নামে এরিষ্টটলের মতবাদে বিশ্বাসী এক বিদ্যাবাগীশ এবং ফ্রূলা নামে এক নির্বোধের মধ্যে কথোপকথন হিসাবে। ব্রূনো তার নিজের বক্তব্য দিলেন থিয়োফলের মুখে। অ্যাশ ওয়েডনেস’ডে ডিনার কেবলমাত্র কোপারনিকাসের মতবাদ সমর্থন করে না, সেই মতবাদকে ভিত্তি করে সৃষ্টিতত্ত্বকে আরও এগিয়ে নিয়ে যায়। কোপারনিকাস সম্বন্ধে অবশ্য তার খুবই উচ্চ ধারণা ছিল; লিখেছিলেন,

“কোপারনিকাসের ছিল একটি গভীর, বিস্তৃত ও পরিণত মন, স্থান-কালের প্রেক্ষিত ছাড়া  যা অন্য কোন জ্যোর্তিবিজ্ঞানীর চাইতে নিম্নমানের ছিল না। তার বৈজ্ঞানিক গবেষণা টলেমী[9], হিপারকাস[10], ইউডোক্সাস[11] ও অনান্যদের চাইতে  উচ্চ পর্যায়ের ছিল। সাধারনভাবে প্রচলিত দর্শনের কিছু মিথ্যা ধারণা থেকে তিনি নিজেকে মুক্ত করতে পেরেছিলেন।“ 

কোপারনিকাসের সমালোচনাও তিনি করেছিলেন কেবলমাত্র গানিতীক জ্যোর্তিবিজ্ঞান অধ্যয়ন করার জন্য এবং প্রাকৃতিক  জ্যোর্তিবিজ্ঞান অবহেলা করার জন্য।

“গণিত অধ্যয়নে বেশি আগ্রহী হওয়ায় তিনি (কোপারনিকাস) প্রাকৃতিক  জ্যোর্তিবিজ্ঞানের গভীরে ঢুকতে পারেন নি। কিছু নিরর্থক অসুবিধাজনক বাধা তিনি সরাতে পেরেছিলেন, কিন্তু বিশেষকিছু অসুবিধাজনক আপত্তিকে তিনি অগ্রাহ্য করেছিলেন, যার ফলে তার বিশ্ব-ব্রম্বান্ডের প্রতিরূপটি দৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে নি।“

ব্রূনো মনে করতেন মহা বিশ্বের প্রকৃত  ব্যাখ্যার জন্য প্রাকৃতিক জ্যোর্তিবিজ্ঞান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং নিজেকে প্রাকৃতিক জ্যোর্তিবিজ্ঞানের একজন বিশেষজ্ঞ মনে করতেন। ব্রূনো খোলাখুলি ভাবে কোপারনিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক বিশ্ব-প্রতিরূপ সমর্থন করলেন। তিনি আরও বললেন, যেহেতু সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বর অসীম, তার সৃষ্টিও অসীম। ঈশ্বর যেমন  অনির্ণেয়, তার সৃষ্টি এই বিশ্বব্রম্বান্ডও   অনির্ণেয়। ১৫৮৪-তে ব্রূনো বিশ্বতত্ত্বের উপর আরেকটি বই প্রকাশ করলেন, “অসীম মহাবিশ্ব ও বিশ্ব।”  তার মহাবিশ্ব ভূকেন্দ্রিক বা সূর্যকেন্দ্রিক কোনটাই নয়, সে অসীম। অসীম মহাবিশ্ব ইথার বা বিশুদ্ধ বাতাসে পরিপূর্ন। যেহেতু অসীম,  এর কোন কেন্দ্রবিন্দুই নেই। অন্যান্য জ্যোর্তিবিজ্ঞানীদের মত সূর্য বা পৃথিবী কোনটাকেই তিনি গুরুত্ত্ব দিতে রাজী হলেন না,  বললেন; সূর্য বা পৃথিবী কোনটাই বিশেষভাবে  গুরুত্বপূর্ন নয়। আমাদের বিশ্বের মত অগুন্তি বিশ্ব এই মহাবিশ্বে আছে, এবং সেই অগুন্তি বিশ্বে হাজার হাজার সূর্য বা পৃথিবী আছে ব্রূনোর এই চিন্তা ধারার সাথে বর্তমানের বিজ্ঞানীদের চিন্তাধারার অনেক মিল পাই আমরা।

আমাদের মনে রাখা দরকার সেইসময়কার বিজ্ঞানীরা গ্রাভিটি বা মাধ্যাকর্ষন শক্তির কথা জানতেন না।  কিন্তু  তারা জানতেন গ্রহ-তারাদের গতির জন্য একটি কার্যকরী কারনের দরকার আছে। এরিষ্টটল কল্পনা করেছিলেন “প্রাইম মুভার” বা মুখ্য চালকের।  মনে করতেন সবচাইতে বাইরের গোলকটিতে মুখ্য চালক অধিষ্ঠিত এবং বাইরের গোলকটি একটি নির্দিষ্ট গতিতে ঘোরাচ্ছে এবং ক্রমে ক্রমে সেই গতি ভিতরের গোলকগুলিতে প্রবাহিত হচ্ছে। এই মুখ্য চালকটি কি? এরিস্টটল মনে করতেন মুখ্য চালক শাশ্বত, পরিবর্তনে অক্ষম, সর্বাধিক বিশুদ্ধ এবং সবচাইতে সুন্দর। মুখ্য চালকের  সাথে আমরা তার ঈশ্বরের সংজ্ঞার সাথে মিল পাই; ঈশ্বর জীবন্ত, অনন্ত ও সর্বাধিক ভাল এবং জীবন, স্থান-কাল সবই ঈশ্বরের অন্তর্গত। মনে হয় তিনি ঈশ্বরকেই মুখ্য চালক ভাবতেন। ব্রূনো মুখ্য চালকের ধারণা পছন্দ করেন নি, তিনি উপস্থাপনা করেছিলেন আত্মারআত্মার কল্পনা বহুদিনের পুরোন। মনে করা হত সমস্ত জীবন্ত জিনিষের আত্মা আছে,  আত্মাই জীবিতকে চলন ক্ষমতা, বৃদ্ধির ক্ষমতা ইত্যাদি দিয়ে থাকে।  একই ভাবে ব্রূনো পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহ-তারাদের আত্মা আছে মনে করতেন, যে আত্মা তাদের চলন ক্ষমতা দিয়ে থাকে। বললেন,

“পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহ-তারারা একটি অন্তনির্হিত নীতি অনুসারে ঘুরে বেড়ায়। তাদের আত্মাই ঠিক করে সেই অন্তনির্হিত নীতি।“

ব্রূনোর দার্শনিক চিন্তাধারা কি পরিমানে বৈপ্লবিক ছিল, আজকের দিনে তা অনুমান করা কঠিন। প্রথমত তিনি অনাদিকালের ধারণা, পৃথিবী স্থির, সূর্য পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে  ভেঙ্গে কোপারনিকাসের মতবাদকে সমর্থন করলেন, পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে, সূর্য স্থির, আর ও বললেন, পৃথিবী বা সূর্য কোনটাই বিশেষ ভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয়, মহাবিশ্বে হাজার হাজার পৃথিবী বা সূর্য আছে। অসীমের ধারণা এনে বললেন মহাবিশ্ব  অসীম। এই বৈপ্লবিক চিন্তাধারা মেনে নেবার মত সাহস বা ক্ষমতা কোনটাই  তদানিন্তনকার বিজ্ঞানীদের ছিল না। আমরা জানি ব্রূনোর সমসাময়িক বিজ্ঞানী, জোহানেস কেপলার বা গ্যালিলিও গ্যালিলি কেউই ব্রূনোকে সমর্থন করেন নি।

১৫৮৫ সালে ব্রূনোর বন্ধু  এবং আশ্র্যয়দাতা ফরাসী রাষ্ট্রদূত মিশেল দি কাস্তেলন ফ্রান্সে ফিরে গেলে ব্রূনোকে ইংল্যান্ড পরিত্যাগ করতে হয়। ১৫৮৫ সালে  থেকে ১৫৯২ ব্রূনো ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়ালেন, অস্ট্রিয়া, সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি ইত্যাদি, কিন্তু কোথাও তিনি বেশিদিন থাকতে পারলেন না। সত্যের অপালাপ,লোকের মন রেখে কথা বলা তার স্বভাবে ছিল না।  যেখানেই তিনি যেতেন, বিভিন্ন বিবাদে জড়িয়ে যেতেন, তার শুভানুধ্যায়ীদের সাথে তর্ক করতেন এবং নতুন জায়গার সন্ধানে বেড়িয়ে পড়তেন।  এই দীর্ঘ সময় ঘুরে বেড়ানোর সময়, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সামনে দাঁড়িয়েও তিনি অমানুষিক পরিশ্রম করেছেন, অজস্র বই লিখেছেন, দি অ্যাশ ওয়েডনেসডে সাপার ছাড়াও অনেক বই প্রকাশ করেছেন;  ধারনার ছায়া (The Shadows of Ideas ১৫৮২), যাদুকরী মন্ত্রোচ্চারন (The Incantation of Circe, ১৫৮২), স্মৃতিশক্তির শিল্প (The Art of Memory, ১৫৮৩), ত্রিশটি সীলমোহরের ব্যাখ্যা (Explanation of Thirty Seals, ১৫৮৩), অসীম বিশ্ব ও মহাবিশ্বের উপর ( On the Infinite Universe and Worlds ১৫৮৪), কারন, নীতি ও ঐক্য নিয়ে (Concerning Cause, Principle, and Unity ১৫৮৪), বিজয়ী নির্বোধ (The Triumphant Idiot ১৫৮৬), স্বপ্নব্যাখ্যা (Dream Interpretation ১৫৮৬), প্রকৃতি ও বিশ্ব নিয়ে একশত কুড়িটি প্রবন্ধ এরিষ্টটল মতবাদী দার্শনিকদের বিরুদ্ধে  (One Hundred and Twenty Articles on Nature and the World Against the Peripatetics, ১৫৮৬),  সান্তনা ভাষন (Consolation Oration) ১৫৮৯, সাধারনভাবে বন্ধন সম্বন্ধে (Of Bonds in General), ১৫৯১, এবং আরও অনেক

১৫৯১ সালে ফ্রাঙ্কফুর্টে থাকাকালীন জিওভানি মোসেনিজো নামক এক ইতালীয় অভিজাতের আমন্ত্রনে পান ইতালীতে ফিরবার জন্য। ব্রূনোর কথায়,

“ফ্রাঙ্কফুর্ট থাকাকালীন আমি মহোদয়   জিওভানি মোসেনিজোর দুটি চিঠি পাই। স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির কৌশল শেখাবার জন্য তিনি আমাকে ভেনিসে আমন্ত্রণ করেন। তিনি ভাল ব্যাবহার এবং কোন কারনেই আমার অসন্তোষের কারন হবেন না এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।“

১৫৯১-এর অগাস্ট মাসে ব্রূনো ইতালীতে ফিরলেন। ইতালীতে ফেরা ব্রূনোর জীবনে সবচাইতে বড় ভূল। তিনি জানতেন ইতালীতে তিনি একজন পলাতক আসামী, ধরা পড়লে তার বিরুদ্ধে ধর্মদ্রোহিতার মামলা এবং কঠিন শাস্তি হবে। তবু কেন তিনি ভেনিসে ফিরলেন এটা একটি রহস্য। মোসেনিজো পরিবার ভেনিসের একটি বিশিষ্ট অভিজাত এবং প্রতিপত্তিশালী পরিবার ছিল। সেই সময় ইতালীয় দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র ভেনিসই কিছুটা স্বতন্ত্রটা বজায় রাখতে পেরেছিল এবং রোমান ক্যাথলিক শক্তির কাছে পুরোপুরি নতি স্বীকার করে নি। সম্ভবত ব্রূনো মনে করেছিলেন তার নিজস্ব খ্যাতি ও মোসেনিজো পরিবারের প্রতিপত্তি তাকে রোমান ইনকুইজিশন থেকে রক্ষা করবেআরও একটি কারন ছিল। সেই সময় ইতালীর বিখ্যাত পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়  গণিতের এক অধ্যাপকের পদ পূরণের জন্য উপযুক্ত প্রার্থী খুঁজছিলেন। সম্ভবত ব্রূনো সেই পদটি পাওয়ার আশাও  করেছিলেন। আমরা জানি ইতালীতে ফিরে প্রথমে তিনি পাদুয়াতেই যান। জীবিকানির্বাহের জন্য পাদুয়াতে কিছুদিনের জন্য জার্মান ছাত্রদের ব্যক্তিগত ভাবে শিক্ষাও দিয়েছিলেনপাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অবশ্য ব্রূনোকে পছন্দ করলেন না, ব্রূনো যদিও তখন ইউরোপের বিশিষ্ট দার্শনিক বলে পরিচিত, কিন্তু তার গণিতের জ্ঞান নিয়ে কর্তৃপক্ষের সন্দেহ ছিল। তারা গ্যালিলিও গ্যালিলিকে গণিতের অধ্যাপকের পদে নিযুক্ত করলেন। পাদুয়াতে চাকুরী না পেয়ে ব্রূনো ১৫৯২ সালের মার্চ মাসে ভেনিসে গেলেন এবং জিওভানি মোসেনিজোর ব্যক্তিগত শিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত হলেন। দুইমাস জিওভানির শিক্ষকতা করে ব্রূনো ব্রূনো ভেনিস পরিত্যাগ করার অনুমতি চাইলেন। কিন্তু ব্রূনোর শিক্ষকতায় অসন্তুষ্ট  জিওভানি ভেনিস কর্তৃপক্ষের কাছে ব্রূনোর নামে বৈধর্ম (খ্রীষ্টধর্মের বিরুদ্ধ বিশ্বাস) ও খ্রীষ্টধর্মের নিন্দা করার অভিযোগ আনলেনজিওভানি মোসেনিজো একজন নীচ, দূর্বল, অগভীর কুসংস্কারী মনের মানুষ ছিলেন। ঠিক সেই চরিত্রের মানুষ ছিলেন  যারা সহজেই কালা যাদুর প্রতি আকৃষ্ট হন। তিনি মনে করেছিলেন ব্রূনো কালা যাদু জানেন এবং সেই কালা যাদুই তার অত্যাশ্চর্য স্মৃতিশক্তির কারন। ভেবেছিলেন ব্রূনোর কাছ থেকে  তিনি কালাযাদু শিখবেন। ব্রূনো কিন্তু কালা যাদু জানতেন না, তার স্মৃতিশক্তির উৎস বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। মোসেনিজো যখন বুঝতে পারলেন ব্রূনো কালা যাদু জানেন না, তখন তিনি হতাশ এবং ক্ষুব্ধ হলেন। তার চরিত্রের মানুষরা যা করে থাকেন, ভাবলেন ব্রূনো তাকে ঠকিয়েছেন। ব্রূনোর উপর প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা করলেন। অবশ্য, অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন জিওভানির আমন্ত্রণ ব্রূনোকে ইতালীতে ফিরিয়ে আনার  একটি ছলনা ছিল। ব্রূনোর কাছে শিক্ষা নেবার কৌশলে জিওভানি তার ক্যাথলিক ধর্মবিরুদ্ধ আচরনের প্রমাণ যোগাড় করছিলেন। 

এক বছর ধরে ব্রূনোর বিরুদ্ধে ভেনিসের আদালতে মামলা চলে। ব্রূনো যথেষ্ট কৃতিত্বের সাথে আত্মপক্ষ সমর্থন করেন। হয়ত বা অপেক্ষাকৃত উদার মনভাবাপন্ন ভেনিস আদালত ব্রূনো দোষী সাব্যাস্ত হতেন না, কিন্তু রোমান কর্তৃপক্ষ হস্তক্ষেপ করলেন। তারা চাইলেন ব্রূনোর বিচার রোমের আদালতে হোক। প্রথমে ভেনিস কর্তৃপক্ষ ব্রূনোকে রোমে পাঠাতে চান নি, কিন্তু চাপের মুখে বাধ্য হন।   

ব্রূনোর বিরুদ্ধে রোমান ইনকুইজিশনের অভিযোগগুলি এই রকম;

(১) ক্যাথলিক ধর্মবিশ্বাসের বিপরীত মত রাখা এবং চার্চের পাদ্রীদের বিরুদ্ধে কথা বলা।
(২) ট্রিনিটি তত্ত্ব, যীশুখ্রীষ্টের ঈশ্বরত্ব এবং অবতার সম্পর্কে ক্যাথলিক বিশ্বাসের বিপরীত মত রাখা।   
(৩) যীশুখ্রীষ্ট সম্বন্ধে ক্যাথলিক বিশ্বাসের বিপরীত মত রাখা।
(৪) মাতা মেরীর কুমারীত্ব সম্পর্কিত ক্যাথলিক বিশ্বাসের বিপরীত মত রাখা।
(৫) ট্রানসাবস্টান্সিয়েসন বা  ক্যাথলিক মতে রুটি ও মদ্যের যীশুখ্রীষ্টের মাংস ও রক্তে পরিবর্তন হওয়া অবিশ্বাস করা এবং  ক্যাথলিক উপাসনার কেন্দ্রবিন্দু  হোলি মাস” যা খ্রিষ্টান জীবনের উৎস এবং চরম প্রাপ্তি মনে করা হয় তা অগ্রাহ্য করা। 
(৬) অনন্তকাল কাল ধরে অগুন্তি বিশ্ব আছে এই তত্ত্বে বিশ্বাস করা।
(৭) দেহান্তরগ্রহন  এবং মানুষের আত্মা জানোয়ারে চালান করা যায় বিশ্বাস করা।
(৮) অলৌকিক উপায়ে ভবিষৎকথন এবং  যাদুবিদ্যা অনুশীলন করা। 

দীর্ঘ সাত বছর ধরে ব্রূনোর বিরুদ্ধে মামলা চলে। ব্রূনো চমৎকার ভাবে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলি খন্ডন করেন। কিন্তু কোন লাভ হলো না।  জিওভানির সাক্ষীর উপর ভিত্তি করে রোমান ইনকুইজিশন বূনোকে দোষী সাব্যাস্ত করল। তাকে সুযোগ দেওয়া হল, জনসমক্ষে কোপারনিকাসের মতবাদ অস্বীকার করা অথবা ক্যাথলিক ধর্মবিশ্বাসের বিপরীত মত রাখার জন্য মৃত্যুদন্ড নেওয়া। ঠিক একইরকম পরিস্থিতিতে গ্যালিলিও গ্যালিলি    জনসমক্ষে কোপারনিকাসের মতবাদ অস্বীকার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ব্রূনো কিন্তু নিজের মত বদলাতে রাজী হলেন না, রাজী হলেন না কোপারনিকাসের মতবাদ অস্বীকার করতে, বললেন,

“আমি মনে করি  না অস্বীকার করার মতো কোন মতবাদ আমার আছে, কিছুই আমি অস্বীকার করতে চাই না, আমি জানিও না কি অস্বীকার করতে হবে।“

রোমান ইনকুইজিশন পোপ ক্লিমেন্টের (অষ্টম) অধ্যক্ষতায় ব্রূনোকে অনুতাপশূন্য, একগুঁয়ে, ধর্মবিরোধী পাষন্ড বলে অভিযুক্ত করল। তার সমস্ত লেখা নিষিদ্ধ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হল। কি শাস্তি দেওয়া যায় সেই সম্বন্ধে অনেক আলোচনার পর ঠিক হয় একমাত্র মৃত্যুদন্ডই এই অপরাধের যোগ্য শাস্তি। জীবন্ত পুড়িয়ে মারার সিদ্ধান্ত হল। বলা হয় তার মৃত্যুদন্ড শোনার পর ব্রূনো বলেছিলেন,

“যারা আমাকে শাস্তি দিলেন মনে হয় তারা আমার চাইতে বেশি ভীত।“

১৭ই ফেব্রুয়রী  ১৬০০ মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। নগ্ন করে, কাঠের গুঁড়ির সাথে বেঁধে, মুখে একখন্ড লোহার টুকরো গুঁজে (উপস্থিত দর্শকদের কানে যাতে ধর্মদ্রোহীর কোন কথা না পৌছয়), আগুনে লাগিয়ে দেওয়া হল। নির্মমভাবে  নিঃশেষিত হল  একজন সত্যপ্রিয়, মুক্ত চিন্তাবিদের জীবন[12] 

  




[1] ১৯৫৮ সালে মার্কিন সরকার মূলত মহাকাশ সম্বন্ধীয় বেসামরিক গবেষণার উদ্দেশ্যে ন্যাশনাল এ্যারোনটিক্স অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা সংক্ষেপে নাসা গবেষণাগারটি প্রতিষ্ঠা করে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে, নাসা মহাকাশে অসংখ্যবার মানুষ নিয়ে বা না নিয়ে মহাকাশযান পাঠিয়েছে, যাদেরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ১৯৭২ সালে নীল আর্মস্ট্রং ও বাজ অল্ড্রিনের আপোলো ১১-এ চন্দ্র অবতরণ।  নাসার সাফল্যের তালিকা বিশাল, অ্যাপোলো চন্দ্র অবতরণ মিশন, স্কাইলাব স্পেস স্টেশন, স্পেস শাটল, ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশন ইত্যাদি। 

[2] সৌরমন্ডলীর বাইরে পৃথিবীর মত অজস্র গ্রহ আছে এর প্রমাণ আমরা পেয়েছি, কিন্তু অন্য কোন এক্সোপ্লানেটে প্রান বা মানুষের মত বুদ্ধিমান জীবের অস্তিত্ত্বের কোন প্রমাণ পাওয়া যায় নি  

[3] ডোমিনিকান চার্চ ক্যাথলিক খ্রীষ্টানদের একটি গোষ্ঠী বা উপদল। ১২১৬ সালে পোপ তৃতীয় অনারিয়াসের অনুমতিক্রমে স্প্যানিশ যাজক সেন্ট ডোমিনিক এই গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ডোমিনিকান চার্চের সদস্যদের ভিক্ষাজীবি সন্ন্যাসী হতে হত।

[4] ডাচ মানবতাবাদী ক্যাথলিক যাজক, শিক্ষক, এবং ধর্মতত্ত্ববিদ ডেসেডিয়াসিয়াস ইরাসমাস ক্যাথলিক চার্চের সমালোচনা করেছিলেন এবং সংস্কারের আহবান জানান তার নিউ টেস্টামেন্টের ল্যাটিন গ্রিক সংস্করণ প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ছিল ক্যাথলিক চার্চ তার লেখা নিষিদ্ধ করেছিল।

[5] আনুমানিক ১২৩২ সালে পোপ গ্রেগরী (নবম) ক্যাথলিক ধর্মবিরুদ্ধ আচরণের জন্য রোমান ইনকুইজিশন শুরু করেন। প্রধানত উত্তর ইতালী এবং ফ্রান্সে আইনটির প্রয়োগ হয়। ১৫৪২ সালে, প্রটেষ্টান্ট বিরোধিতার মুখে আইনটির ব্যাপক প্রয়োগ শুরু হয়। এই আইনে প্রটেস্টান্ট ধর্ম স্বীকার করা, কালা যাদুবিদ্যা চর্চা করা, ক্যাথলিক ধর্মের নিন্দা করা, অনৈতিকতা ইত্যাদি বিভিন্ন অপরাধের বিচার করা হত।  রোমান ইনকুইজিশন  কুখ্যাত ছিল অত্যাচারের জন্য। বেশিরভাগ সময়ই কর্তৃপক্ষ ভয়াবহ  অত্যাচার করে বাদীর কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করত এবং কঠিন ও নির্মম শাস্তি দিত।

[6] ক্যালভিনি সম্প্রদায় প্রটেষ্টান্ট খ্রীষ্টানদের একটি বিশিষ্ট গোষ্ঠী। ফরাসী পাদ্রী জন ক্যালভিন এই সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা। ইউক্রাইষ্ট বা যীশুর শেষ নৈশভোজন (যেখানে যীশু শিষ্যদের রুটি ও মদ দিয়ে আমার শরীর ও আমার রক্ত বলে উল্লেখ করেছিলেন), উপাসনা করার পদ্ধতি, বিশ্বাসীদের জন্য উপাসনা করার কি ফল, ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে ক্যালভিনি সম্প্রদায় লুথারিয়ান সম্প্রদায়ের প্রটেষ্টান্টদের চাইতে ভিন্নমত পোষন করে।

[7] গ্রীক দার্শনিক এরিষ্টটলকে (খ্রীষ্টপূর্ব ৩৮৪-৩২২) পৃথিবীর প্রথম দার্শনিক মনে করা হয়। তার লেখা বই, পদার্থবিদ্যা (Physics) এবং মহাবিশ্ব নিয়ে (On the Heavens) গ্যালিলিও গ্যালিলির সময় পর্যন্ত পৃথিবীর বিজ্ঞানচর্চাকে প্রভাবিত করেছে।  কাব্য, অলঙ্কারশাস্ত্র, রাজনীতি, পদার্থবিজ্ঞান, নীতিবিজ্ঞান, অধ্যাত্মতত্ত্ব,  ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে প্রচুর লেখা লিখেছেন।

[8] ইতালীর ধর্মযাজক থমাস আকুয়ানা (১২২৫-১২৭৪) একজন প্রভাবশালী দার্শনিক, ধর্মতত্ত্ববিদ ও আইনজ্ঞ ছিলেন। সুমা ধর্মতত্ত্ব (Summa Theology) তার শেষজীবনের রচনা যা খ্রীষ্টধর্মকে ভীষণ ভাবে প্রভাবিত করেছিল। থমাস আকুয়ানা মনে করতেন ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ দেওয়ার প্রয়োজন আছে এবং এর  পক্ষে পাঁচটি প্রমাণ দিয়েছিলেন। একটি প্রমানের উল্লেখ এখানে করা যেতে পারে,
এই বিশ্বে আমরা দেখতে পারি যে অন্তত কিছু জিনিস পরিবর্তিত হচ্ছে যা পরিবর্তিত  হচ্ছে সেটা অবশ্যই অন্য কিছু দ্বারা পরিবর্তিত হয় যা পরিবর্তন করছে সে নিজেও যদি পরিবর্তিত হয়অবশ্যই সেই পরিবর্তনও অন্য কিছু দ্বারা হচ্ছেএই ধরনের তর্ক করে আমরা একটি অসীম দীর্ঘ শৃঙ্খল তৈরী করতে পারি; যে পরিবর্তন  করছে সে অন্য কিছুদ্বারা পরিবর্তিত হচ্ছে, সে আবার অন্য কিছু  দ্বারা পরিবর্তিত হচ্ছে ইত্যাদি। কিন্তু   এই শৃঙ্খল অসীম দীর্ঘ হতে পারে না সুতরাং, অবশ্যই কিছু আছে যা নিজে পরিবর্তিত না হয়েও পরিবর্তনের কারন হতে পারে। তাকেই আমরা ঈশ্বর বলে বুঝি। “

[9] ক্লডিয়াস টলেমী (১০০-১৭০ খ্রিষ্টাব্দ) একজন বিখ্যাত গণিতবিদ, ভূগোলবিদ এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানী টলেমী ছিলেন প্রাচীনতম প্রাচীনতম জ্যোতির্বিজ্ঞানী কোপারনিকাসের সময় পর্যন্ত তাঁর লেখা বই অ্যালমাগেস্ট জ্যোতির্বিজ্ঞানের একমাত্র  প্রামানিক বই বলে বিবেচিত হত 

[10] হিপারকাস (খ্রীষ্টপূর্ব  ১৯০-১২০) প্রাচীনকালের প্রাচীনতম জ্যোতির্বিজ্ঞানী ছিলেনপ্রিসিসন অফ ইকুইনক্স নামে মহাকাশ জগতের এক ঘটনার তিনি আবিষ্কারক। হিপারকাস  ৮৫০ টি  তারার একটি তালিকাও তৈরী করেন 

[11] গ্রীক জ্যোতির্বিজ্ঞানী সিনাডাসের ইউডক্সাস (খ্রীষ্টপূর্ব  ৪০৮-৩৫৫), প্রথম সৌর বছরের দৈর্ঘ্য গণনা করেন তিনিই প্রথম অধিবর্ষ বা লীপ ইয়ারের ধারণা এনেছিলেন এবং প্রাচীন ক্যালেন্ডার সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছিলেন  

[12] কোপারনিকাসের মতবাদ বা পৃথিবী বা সূর্য কোনটাই বিশেষ ভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয়, মহাবিশ্বে হাজার হাজার পৃথিবী বা সূর্য আছে, ব্রূনোর এই মত আজ চার্চ কর্তৃপক্ষ স্বীকার করলেও, আশ্চর্যজনক ভাবে আজও ক্যাথলিক চার্চ ব্রূনোকে ক্ষমা করে নি, স্বীকার করেনি যে চারশ বছর আগে ব্রূনোকে শাস্তি দেওয়া অন্যায় হয়েছিল। ২০০০ সালে ব্রূনোকে ক্ষমা করার প্রস্তাব পোপ দ্বিতীয় জন পল নাকচ করে বলেন সেই  সময়ের প্রেক্ষিতে বিচার ভূল হয় নি। অথচ, আমরা জানি ১৬৩৩ সালে ক্যাথলিক চার্চ কোপারনিকাসের মতবাদ সমর্থন করার জন্য গ্যালিলিও গ্যালিলিকে শাস্তি দিলেও ১৯৯২ সালে পোপ দ্বিতীয় জন পল স্বীকার করেন সেটা অন্যায় হয়েছিল। অনেকে মনে করেন, ব্রূনোকে ক্ষমা করার পথে চার্চের প্রধান বাধা কার্ডিনাল বেলারমিন (Cardinal Bellarmine)। বেলারমিন ব্রূনোর অন্যতম তদন্তকারী। ১৯৩০ সালে ক্যাথলিক চার্চ বেলারমিনকে সেন্ট বা পবিত্র ব্যক্তি বলে ঘোষনা করেন। ব্রূনোকে নির্দোষ বলে ঘোষনা করলে প্রশ্ন উঠবে কি করে একজন সেন্ট বা পবিত্র ব্যক্তির করা তদন্ত ভূল হল? প্রশ্ন উঠবে বেলারমিনকে সেন্টের মর্যাদা দেওয়া নিয়ে। প্রশ্ন উঠবে  ক্যাথলিক চার্চের সেন্ট বা পবিত্র ব্যক্তি ঘোষনা করার প্রথা নিয়ে।


No comments:

Post a Comment