স্যার আইজাক নিউটন (২৫ ডিসেম্বর ১৬৪২-৩১ মার্চ ১৭২৭)
এরিষ্টটল-টলেমীর
ভূকেন্দ্রিক মডেলের শবাধারে শেষ পেরেকটি পুঁতেছিলেন ইংরেজ বিজ্ঞানী ও গণিতজ্ঞ স্যার
আইজাক নিউটন।
নিউটন পৃথিবীর সর্বকালের
শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের মধ্যে একজন। জ্যোর্তিবিদ এডমন্ড হ্যালী[1]
নিউটনকে দেবতাদের পর্যায়ে তুলে দিয়েছিলেন, বলেছিলেন, “(নিউটন) দেবতাদের কাছাকাছি, কোন মরণশীল তার সান্নিধ্যে
আসতে পারে না।“ ১৬৪২ খ্রীষ্টাব্দের ২৫ ডিসেম্বর ইংল্যান্ডের লিংকনশায়ারের উলস্থ্রপ
গ্রামে আইজাক নিউটনের জন্ম হয়। উল্লেখযোগ্য যে ১৬৪২ খ্রীষ্টাব্দেই অন্যতম শ্রেষ্ঠ
বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলির মৃত্যু হয়। নিউটনের বাবার নামও ছিল আইজাক নিউটন। তিনি ছিলেন একজন সম্পন্ন চাষি এবং নিরক্ষর। মা হানা আইসকফ অবশ্য
স্বল্প শিক্ষিতা ছিলেন। নিউটনের জন্মের তিনমাস পূর্বে তার বাবার মৃত্যু হয়। জন্মের সময় নিউটন এতই দূর্বল ছিলেন যে হানার
আশংকা ছিল তিনি বাঁচবেন কি না। পরে হানা
তার ছেলেকে বলেছিলেন যে নিউটন জন্মের সময় এতটাই
ছোট
ছিলেন যে একটি কোয়ার্ট[2] মাপের পাত্রের মধ্যে ধরে যেতেন। নিউটনের তিন বছর বয়সে তার মা হানা পুনর্বিবাহ করেন।
সৎপিতা বারনাবাস স্মিথ ছিলেন মাইলখানেক দূরের একটি গ্রামের গীর্জার যাজক।
সম্ভবত,
বারনাবাস
স্মিথ
নিউটনের
মা’কে
বিবাহ
করলেও
নিউটনের
দায়িত্ব
নিতে
রাজী হন নি। মাতামহ জেমস আইসকফ এবং মাতামহী মার্জারী আইসকফ তার প্রতিপালনের দায়িত্ব নেন। তিন বছরের শিশু নিউটনের জন্য ঘটনাখুবই বেদনাদায়ক
হয়। স্নেহহীন, নিঃসঙ্গ বাল্যকালের প্রভাব আমরা নিউটনের জীবনে দেখতে পাই তার
ব্যতক্রমি ব্যক্তিত্বে। বিশাল
প্রতিভার অধিকারী, বিজ্ঞান চর্চ্চায় মন-প্রান নিবেদিত এই ব্যক্তিটি ছিলেন, প্রতিহিংসাপরায়ণ, গোপনীয়তা প্রিয় ও সঙ্গবিমুখ।
নিউটনের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় তার গ্রামের বিদ্যালয়ে। বার বছর বয়সে
তিনি লিংকনশায়ার শহরের নিকটবর্তী গ্রান্থামের কিংস স্কুলে ভর্তি হন। ছাত্রাবস্থায় নিউটন তার
অসামান্য প্রতিভার বিশেষ কোন পরিচয় দেন নি, স্কুলের পিছনের সারির ছাত্রদের মধ্যেই পড়তেন। পরবর্তী জীবনে
নিউটন স্বীকার করেছিলেন যে কিংস স্কুলে তার পড়াশুনোয় মনোযোগের অভাব ছিল। পড়াশুনোয় মনোযোগের অভাব থাকলেও, একটি ব্যাপারে নিউটনের
উৎসাহের অভাব ছিল না, সেটি হল যন্ত্রপাতি
সম্বন্ধে তার বিশেষ উৎসাহ। তার অধিকাংশ সহপাঠীদের চেয়ে ছোট এবং শারীরিকভাবে
দুর্বল নিউটন স্কুলের সাধারন খেলাধূলা থেকে দূরে থাকতেন। অন্যরা যখন খেলাধূলা করত,
সেই সময় তিনি ব্যস্ত থাকতেন টুকরো কাঠ দিয়ে নানা রকম মডেল বানানোর কাজে। এই কাজের
জন্য তার ছোট হাতুড়ি, করাত, স্ক্রু ড্রাইভার ও নানা প্রকার যন্ত্রপাতি ছিল, যেগুলো
তিনি যথেষ্ট দক্ষভাবে ব্যবহার করতে পারতেন। গ্রান্থামে স্থানীয় ঔষধ প্রস্তুতকারক ও বিক্রেতা উইলিয়াম
ক্লার্কের বাড়িতে নিউটন থাকতেন। ক্লার্কের বাড়ির দেওয়ালে তিনি একটি
সূর্যঘড়ি বানিয়েছিলেন। ঘড়িটিতে ছোট ছোট কাঠের খুটি দিয়ে ঘন্টা ও আধাঘন্টার চিহ্ন
দিয়েছিলেন। সূর্যঘড়িটি নিউটনের ঘড়ি বলে পরিচিত ছিল। গ্রামবাসীদের কাছে ঘড়িটি খুবই উপকারী হয়েছিল।
তারা নিউটনের ঘড়ি দেখে সময় নির্ধারন করতেন।
তিনি একটি জলঘড়ি এবং হাওয়াকলও বানিয়েছিলেন। হাওয়াকলটি সত্যি সত্যি গম গুঁড়ো
করতে পারত। একটি ইঁদুর, যাকে তিনি বলতেন (গম) পেষক, হাওয়াকলের মধ্যে রেখেছিলেন।
ইদুরটির সামনে থাকতো একটুকরো খাবার। খাবারটির দিকে ইদুরটি এগোলে একটি চাকা
ঘুরে যেত এবং হাওয়াকলটি চলতে থাকত। ঔষধ প্রস্তুতকারক ক্লার্কের সাহচর্যেই সম্ভবত
নিউটন নানাবিধ রঙের মিশ্রণ, সাধারন রোগের চিকিৎসা, ঔষধ ইত্যাদি সম্বন্ধে উৎসাহ পান।
ক্লার্কের একটি
বই, জন বেটসের প্রকৃতি এবং শিল্প রহস্য (The Mysteries of Nature and Art) তাকে বিশেষ আকৃষ্ট করে। বইটির নানা অংশ তিনি একটি ছোট নোটবইতে
টুকে রাখতেন; ‘মাছ ধরার টোপ,’ সব
ক্ষতর জন্য একটি মলম, দৃষ্টিশক্তি পরিষ্কার জন্য জল, কাঁচ কাটার পদ্ধতি, ইত্যাদি তার কিছু
নমুনা।
১৬৫৩ সালে নিউটনের সৎপিতা বারনাবাস
স্মিথ মারা যান। তার মা হানা দ্বিতীয়বার বিধবা
হন। হানা বারনাবাসের তিন সন্তানকে নিয়ে উলস্থ্রপে তার বাবার বাড়িতে
বসবাস শুরু করেন।
বারনাবাস স্মিথ যথেষ্ট বিত্ত্ববান
ছিলেন, তার মৃত্যুর পর সেই সম্পতির মালিক হন হানা। নিউটনের বার বছর বয়সে হানা নিউটনকে
স্কুল ছাড়িয়ে বাড়িতে নিয়ে আসেন। তার ইচ্ছে ছিল
নিউটন কৃষিকর্ম শিখে সম্পত্তি দেখাশোনা
করুক। কিন্তু যিনি
ভবিষ্যতে মহান বিজ্ঞানী হবেন, তার পক্ষে কৃষিকর্মে সফল হওয়ার কথা নয়, নিউটনও কৃষক হিসাবে ব্যর্থ হলেন। ছাত্র হিসাবে
খুব উজ্জ্বল না হলেও কিংস স্কুলের প্রধান শিক্ষক উইলিয়াম স্টোকস সম্ভবত নিউটনের
মধ্যে প্রতিভার পরিচয় পেয়েছিলেন। উইলিয়াম স্টোকস ও হানার ভাই উইলিয়াম আইসকফ হানাকে রাজি করালেন নিউটনকে পুনরায়
স্কুলে পাঠাতে। গ্রান্থামে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির পর নিউটন ১৬৬১ সালে
উচ্চশিক্ষার জন্য কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজে ভর্তি হলেন। যথেষ্ট বিত্তশালী হলেও
হানা নিউটনের উচ্চশিক্ষার
ব্যয় বহন করতে রাজী হলেন না। নিউটন কেমব্রিজে ভর্তি হলেন সিজার ছাত্র হিসাবে।
সিজার ছাত্রদের বিনামূল্যে পড়ার পরিবর্তে কিছু কাজ, কোন কোন সময় ভৃত্যের কাজও করতে
হত। কেমব্রিজে পড়াকালীন কিছুদিনের জন্য নিউটনের মধ্যে ধর্মীয়ভাবের উদয় হয়। একটি ছোট খাতায় তার অধর্ম
বা অপরাধের হিসাব রাখতেন। এই নোটবইটা “ফিজউইলিয়াম মিউজিয়াম নোটবই” হিসাবে খ্যাত। নিজের
চেষ্টায় তিনি সর্টহ্যান্ড[3]
শিখেছিলেন। সম্ভবত গোপন রাখার জন্য এই অপরাধের হিসাব তিনি সর্টহ্যান্ডে লিখতেন। বিশেষ কোন গুরুতর অপরাধ
আমরা দেখতে পাই না। বেশিরভাগ অপরাধই তার সেইসময়কার ধার্মিক মনের পরিচয় দেয়। কিছু উদাহরণ এইরকম,
গীর্জায় লুকিয়ে
আপেল খাওয়া,
স্যাবাধের[4]
পবিত্রদিনে ঘুড়ি বানানো ও পরে অস্বীকার করা,
মা ও বাবাকে ভয়
দেখান বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার,
মৃত্যু কামনা
করা,
চুরি করে চেরী
খাওয়া ও অস্বীকার করা,
ছোট বোনকে ঘুষি
মারা,
মা’র সাথে ঝগড়া
করা,
বোনের সাথে
ঝগড়া করা, ইত্যাদি।
একটি
উল্লেখযোগ্য অপরাধ নিউটন উল্লেখ করেছেন,যীশুর উপাসনার চাইতে টাকা উপার্জনে বেশি
আগ্রহ। কেমব্রিজে থাকাকালীন, নিজের অল্প সঞ্চয় থেকে নিউটন সহপাঠীদের টাকা ধার
দেওয়ার ব্যবসা শুরু করেন। বেশি টাকা ধার দিতেন না, সর্বোচ্চ এক পাউন্ড, সুদ কত
নিতেন জানা নেই, তবে নোটবই থেকে জানা যায় এই ব্যবসা তার ভালই চলত।
কেমব্রিজে থাকাকালীন সম্ভবত ১৬৬৩-৬৪ সালে নিউটন
“কিছু দার্শনিক প্রশ্ন” এই শিরোনামে নানাবিধ বিষয়ে বিস্তৃত বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন।
এই নোটবইটি “নিউটনের নোটবই” নামে বিখ্যাত এবং বর্তমানে কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের
গ্রন্থাগারে আছে। নোটবইটির শুরুতে তিনি লিখেছিলেন,
“প্লেটো আমার বন্ধু, এরিস্টটল আমার বন্ধু, কিন্তু, সত্য আমার সবচাইতে বড় বন্ধু।“
লেখাটি তার
দার্শনিক মনের বিস্তারের পরিচয় দেয়। কলেজ জীবনের শুরু থেকেই সত্যের সন্ধানে ছিলেন এই বিজ্ঞানী। নোটবইটিতে
তিনি বিভিন্ন শিরোনামে কি পড়েছেন বা কি পড়তে চান তার সংক্ষিপ্ত বা
বিস্তারিত বিবরণ লিখে রাখতেন। নোটবইতে লেখা অনেক বিষয়ের মধ্যে আমরা পাই, “পদার্থ
সম্বন্ধীয়,” “পরমাণু সম্বন্ধীয়,” “শূন্যস্থান ও পরমাণু সম্বন্ধীয়,” “গতি
সম্বন্ধীয়,” “আলো সম্বন্ধীয়,” ইত্যাদি শিরোনামে বিস্তারিত বা সংক্ষিপ্ত বিবরণ। একটি বিষয়ের শিরোনাম হল, “একটি ছবিকে
ছোট বা বড় করবার সহজ নিয়ম।“ এই শিরোনামে তিনি লিখেছেন,
“রুলার ও
কম্পাসের সাহায্যে ছবিটিকে অনেকগুলি সমমাপের বর্গক্ষেত্রে ভাগ করুন। একটি কাগজে বড়
বা ছোট (আপনার চাহিদা মত) একটি বর্গক্ষেত্র
আঁকুন। ছবিটি যতগুলো বর্গক্ষেত্রে ভাগ করা হয়েছে, এই বর্গক্ষেত্রটি সমসংখ্যক
বর্গক্ষেত্রে ভাগ করুন। তারপর, ক্রমপর্যায়ে ছবিটির একেকটি বর্গক্ষেত্র, পেন্সিল দিয়ে
সঠিক পর্যায়ে কাগজটিতে আঁকুন।“
কেমব্রিজে পড়াকালেও নিউটন বিশেষ কোন প্রতিভার পরিচয় দেন
নি। ১৬৬৫ সালে তিনি বিএ পাশ করেন সাধারন ভাবেই, কোন বৈশিষ্ট বা বিশেষ সম্মান
ছাড়াই। অবশ্যই তার পরীক্ষার ফল কেমব্রিজে বৃত্তি সহকারে উচ্চতর শিক্ষা চালিয়ে
যাবার জন্য যথেষ্ট ভাল ছিল। ১৬৬৫-৬৬ সালে লন্ডন শেষবারের মত প্লেগ মহামারীতে আক্রান্ত হয়। এই মহামারীতে, খুব দ্রুত লন্ডনের ৪৬০,০০০ লন্ডনবাসীর
মধ্যে ১০০,০০০ জনের মৃত্যু হয়। সতর্কতাবশত, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া
হয়, ছাত্ররা সবাই বাড়ি ফিরে যায়, নিউটনও তার গ্রাম উলসথ্রপে ফিরে যান এবং প্রায় দুই বছর সেখানে
থাকেন। উলসথ্রপে শুরু হয় জ্ঞানের জগতে নিউটনের এক দীর্ঘ ও
উত্তেজনাপূর্বক যাত্রা। তার যুগান্তকারী আবিষ্কার, (১) ফ্লাক্সিওন (যা বর্তমানে
ক্যালকুলাস নামে পরিচিত) নামক গানিতীক পদ্ধতি, (২) গতিবিদ্যার তিনটি সূত্র, (৩)
মাধ্যাকর্ষন সুত্র ও (৪) আলো ও রঙের তত্ত্ব, বিজ্ঞানের জগতে বিপ্লব এনে বিজ্ঞানকে
পুরো পাল্টে দিল। ১৬৬৫-৬৬ এই দুই বছর বিজ্ঞানের ইতিহাসে বিস্ময়কর বছর[5] বলে পরিচিত। নিউটন, যিনি তখন পর্যন্ত
বিশেষ কোন প্রতিভার
পরিচয় দেন নি, কেমব্রিজের এক সাধারণ ছাত্র বলেই পরিচিত
ছিলেন, কি করে এই অসাধ্য
সাধন করলেন তার স্পষ্ট কোন ধারনা পাওয়া যায় না। সম্ভবত সেই কারনেই বিজ্ঞানী
আলবার্ট আইনস্টাইন নিউটন সম্বন্ধে বলেছিলেন,
“বিজ্ঞানের সুখী সন্তান নিউটন ভাগ্যবান। প্রকৃতি তার কাছে একটি
খোলা বইয়ের মত ছিল, যার অক্ষর তিনি
সহজেই পড়তে পারতেন।"
১৬৬৫-৬৫ সম্বন্ধে,
কয়েক দশক পরে
নিউটন তার বন্ধু ফরাসি পন্ডিত পিয়ের দি মিজো’কে (Pierre Des Maizeaux) লিখেছিলেন, “সেটা
আমার আবিষ্কার করার বয়স ছিল (নিউটনের বয়স ছিল ২৪ বছর)। আমার
বুদ্ধিমত্তাও ছিল শিখরে আর গণিত ও দর্শনের বাইরে অন্য কোন চিন্তাও ছিল না।“
সেই সময়কার
প্রথা অনুযায়ী
কেমব্রিজের সমস্ত ছাত্রদের একজন করে ব্যক্তিগত শিক্ষক থাকত, যিনি অভিভাবক ও
শিক্ষকের ভূমিকা পালন করতেন। নিউটনের ব্যক্তিগত শিক্ষক ছিলেন গ্রীক ভাষার শিক্ষক
বেঞ্জামিন পুলিন। উচ্চ গণিতে বেঞ্জামিন পুলিনের সামান্যই দক্ষতা ছিল, নিউটনকে তিনি বিশেষ সাহায্য
করতে পারতেন বলে মনে হয় না। নিউটনের সময় গ্রীক, ল্যাটিন, দর্শন, ধর্মীয় তত্ত্ব ইত্যাদি ছিল তখনকার কেমব্রিজের মূল
পাঠ্য বিষয়, গণিত ও বিজ্ঞান ছিল গৌণ বিষয়। কলেজ থেকেও গণিতে তিনি উৎসাহ বা সাহায্য পান নি। সম্পূর্ন নিজের
চেষ্টায় নিউটন নিজেকে একজন বিশিষ্ট গণিতজ্ঞে পরিণীত করেছিলেন। ইউক্লিডের জ্যামিতির বই “এলিমেন্টস”,
রেণে দেকার্তে’র বিশ্লেষণাত্মক জ্যামিতির বই “পদ্ধতির উপর
নিবন্ধ,“ জোহানেস কেপলারের “ এস্ট্রোনোমিয়া নোভা” বা “নতূন বিশ্ব,” গ্যালিলিও গ্যালিলির “ডায়ালগ কনসারনিং দি টু
চীফ ওয়ার্ল্ড সিস্টেমস” বা দুই মুখ্য
বিশ্ব পদ্ধতির উপর তর্ক” ইত্যাদি মনোযোগ সহকারে অধ্যয়ন করেন। কেমব্রিজে থাকাকালীন নিউটন জ্যোতির্বিদ্যায়ও উৎসাহী হন। তার নোটবই থেকে
আমরা জানি কিছু সময় তিনি নিয়মিত ধূমকেতু পর্যবেক্ষন করে থাকতেন।
তদানিন্তনকার সর্বোচ্চ
গণিত আয়ত্তে এলেও নিউটন সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। একটি বস্তু যদি দিক পরিবর্তন না করে, একই গতিতে
এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যায়, তিনি অংক কষে বলতে পারেন কত সময় লাগবে, কিন্তু
বস্তুটি যদি গতি পরিবর্তন করে, বা দিক পরিবর্তন করে, তাহলে তিনি তা পারেন না। কেমব্রিজে পড়াকালীন নিউটন গণিতের এই
সীমাবদ্ধতা নিয়ে চিন্তা ভাবনা করতেন। উলসথ্রপে থাকাকালীন নিউটন আবিষ্কার করলেন
গাণিতীক পদ্ধতি ফ্লাক্সিওন (যা বর্তমানে ক্যালকুলাস নামে পরিচিত)। ফ্লাক্সিওন বা
ক্যালকুলাস গণিতের সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে তাকে অনেক উচ্চস্তরে পৌছে দিল। অনেক জটিল
প্রশ্নের উত্তর গণিতজ্ঞরা দিতে পারলেন, যা আগে পারা যেত না। স্বাভাবিক ভাবেই, ফ্লাক্সিওন
বা ক্যালকুলাস, গণিতের এই বিশেষ পদ্ধতি সাধারনের জন্য সহজবোদ্ধ নয়। নিউটন মনে
করতেন যে কোন রাশিই (quantity) সময়ের সাথে
সাথে বয়ে যায় তাই তিনি তার নাম দিলেন ফ্লুয়েন্ট (fluent), যা বয়ে যায়। সেই রাশির গতি
বা সময়ের সাথে পরিবর্তনের সংজ্ঞা দিলেন ফ্লাক্সিওন। যদি ফ্লূয়েন্ট হয় X, এবং তার
ফ্লাক্সিওন হয় Ẋ, তাহলে, খুব অল্প সময় T ব্যাবধানে ফ্লুয়েন্ট
হবে, X= X+ẊT ।এই খুব অল্প সময় ব্যাবধান সম্বন্ধে কিছু বলার আছে। ব্যাবধানটি
শূন্য নয় কিন্তু শূন্যের খুব কাছাকাছি, ইংরেজীতে বলা হয় ইনফাইনাইটিসিমাল (infinitesimal)।
নিউটনের আরেকটি
বিশেষ আবিষ্কার হল বাইনোমিয়াল (binomial) থিয়োরেম। তিনি প্রমাণ করতে পেরেছিলেন যে গাণিতীক রাশি (a+b)n –কে তিনি লিখতে পারেন,
বাইনোমিয়াল
থিয়োরেম ও ক্যালকুলাসের সাহায্যে অনেক জটিল গাণিতিক প্রশ্নের উত্তর নিউটন দিতে
পারলেন, যা আগে কোন ভাবেই সম্ভব ছিল না। আশ্চর্যজনক ভাবে নিউটন তার এই বিশেষ
আবিষ্কারের কথা কাউকে জানালেন না। তিনি স্বভাবত গোপনতাপ্রিয় ছিলেন। কিন্তু
ক্যাল্কুলাসে আবিষ্কারের কথা গোপন করার জন্য পরে তিনি জার্মান দার্শনিক ও
গণিতজ্ঞ গডফ্রেড উইলহেল্ম লিবনিজের (Gottfried Wilhelm Leibniz ) সঙ্গে বিতর্কে[6]
জড়িয়ে পড়েন। এই বিতর্ক তার চরিত্রের নেতিবাচক দিকটিকেই তুলে ধরে।
উলস্থ্রপে
থাকাকালীনই নিউটন গতিবিদ্যার তিনটি সূত্র আবিষ্কার করেন। এই গতি সূত্র তিনটি খুবই গুরুত্ত্বপূর্ণ । আমাদের এই
বিশ্বকে মোটামুটি তিনভাগে ভাগ করা যায়, (১) কোয়ান্টাম বিশ্ব (Quantum World) যা
অনু, পরমাণু দিয়ে গঠিত, (২) চিরন্তন বা ক্লাসিক্যাল বিশ্ব (Classical World), যে
বিশ্ব আমরা অনুভব করি, এবং (৩) রিলেটিভিস্টিক বিশ্ব (relativistic world), যেখানে সব আলোর গতিতে বা আলোর গতির কাছাকাছি
গতিতে চলছে। চিরন্তন
বা ক্লাসিক্যাল বিশ্বে নিউটনের গতিসূত্র তিনটি প্রযোজ্য। সংক্ষেপে সূত্র তিনটি এই
রকম,
প্রথম সূত্র: বাহ্যিক কোন বল
প্রয়োগ না করলে স্থির বস্তু স্থির এবং গতিশীল বস্তু সুষম গতিতে সরল পথে চলতে থাকে।
প্রথম সূত্রটি
পদার্থের জাড্য বা স্থিতিশীলতা (inertia) সম্বন্ধে নিউটনের ধারনার অভিব্যক্তি।
পদার্থ তার নিজের অবস্থায় থাকতে চায়, স্থির বস্তু স্থির অবস্থায়, এবং চলমান বস্তু
চলমান অবস্থায়। অবস্থার পরিবর্তন হয় শুধুমাত্র বল
প্রয়োগে।
দ্বিতীয় সূত্র: কোন বস্তুর বেগের পরিবর্তনের হার প্রযুক্ত বলের সমানুপাতিক এবং বল যে দিকে
ক্রিয়া করে বস্তুর বেগের পরিবর্তন সেদিকেই ঘটে।
দ্বিতীয় সূত্রটিতে
তিনি বললেন বল প্রয়োগে বস্তুর কি পরিবর্তন হবে? তিনি বললেন, বস্তুর গতিবেগের পরিবর্তনের হার বস্তুর উপর প্রযুক্ত বলের
সমানুপাতিক। গতিবেগের পরিবর্তনের দিকও তিনি নির্নয় করে দিলেন, বল প্রয়োগের দিকেই
গতিবেগের পরিবর্তন হবে। গতিবিদ্যার যে কোন গণনার জন্য নিউটনের দ্বিতীয় সূত্রটি খুবই গুরুত্বপূর্ন। সুত্রটি বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক ধারণা ভরের সংজ্ঞা দেয়। সূত্র অনুযায়ী বস্তুর বেগের পরিবর্তনের হার প্রযুক্ত বলের সমানুপাতিক, এই সমানুপাতিকের কন্সটান্ট বা ধ্রুবক হলো বস্তুটির মাস বা ভর। নিউটন মাস বা ভর শব্দটি ব্যাবহার করেছিলেন
বস্তুটিতে কতটা পদার্থ
আছে বুঝাবার জন্য, বর্তমানে শব্দটি ব্যবহার হয় বস্তুটির জাড্য বা স্থিতিশীলতা
বুঝানোর জন্য।
তৃতীয় সূত্র: প্রত্যেক ক্রিয়ারই সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে৷
তৃতীয়
সূত্রটি আপাত দৃষ্টিতে খুবই সহজ ও তুচ্ছ মনে হয়, কিন্তু সূত্রটি
সূক্ষ্ম ও গুরুত্বপূর্ন। আমরা যখন
একটি চেয়ারে বসে
থাকি, চেয়ারের উপর একটি
বল প্রয়োগ করি, চেয়ারটিও বিপরীত দিকে সমান
বল প্রয়োগ করে। একটি পাখি কেমন করে উড়ে? সে তার পাখা দিয়ে
বাতাসের উপর বল প্রয়োগ করে, বাতাসও পাখির উপর বল প্রয়োগ করে তাকে উড়তে দেয়।
উলস্থ্রপে থাকাকালীন
নিউটন মাধ্যাকর্ষণ সুত্রও আবিষ্কার করেন, যার জন্য আজ তিনি কিংবদন্তী। আমরা অনেকেই
নিউটন ও আপেল পড়ার গল্প শুনেছি, গল্পটি সত্য। পরে নিউটন তার বিশিষ্ট বন্ধু উইলিয়াম
স্টাকলীকে[7]
গল্পটি শুনিয়েছিলেন। একদিন তিনি আপেল বাগানে বসে চিন্তা করছিলেন, কি কারনে গ্রহরা
ক্রমাগত সূর্যের চারিদিকে ঘুরে? সেই সময় তিনি একটি আপেলকে নিচে পড়তে দেখেন। খুবই
সাধারন দৃশ্য, কিন্তু দৃশ্যটি নিউটনের মনে চিন্তার উদ্রেক করল, কি কারনে আপেলটি
নিচে পড়ল। পদার্থের জাড্য বা স্থিতিশীলতা সম্বন্ধে তার স্পষ্ট ধারনা ছিল, পদার্থ
তার নিজের অবস্থায় থাকতে চায়, স্থির বস্তু স্থির অবস্থায়, এবং চলমান বস্তু চলমান
অবস্থায়। অবস্থার পরিবর্তন হয় শুধুমাত্র বল
প্রয়োগে। তিনি নির্ণয় করলেন আপেলটি নিচে
পড়ছে কারন তার উপর বল প্রয়োগ হয়েছে। কে বল
প্রয়োগ করেছে? আপেলটি যেহেতু পৃথিবীতে পড়েছে, তাই পৃথিবী আপেলের উপর বল প্রয়োগ
করেছে। কিন্তু, পৃথিবী কেন আপেলের উপর বল প্রয়োগ করবে? এইখানেই নিউটনের অন্তর্দৃষ্টির পরিচয় পাই, তিনি বললেন, বিশ্বের
সব বস্তুই একে অপরকে আকর্ষন করে। পৃথিবী
আপেলকে আকর্ষণ করছে, আপেলটিও পৃথিবীকে
সমানভাবে আকর্ষণ করছে। কিন্তু আপেলের চাইতে পৃথিবীর ভর অনেকগুন বেশি
হওয়ায় পৃথিবীর উপর আপেলের এই আকর্ষনের বাহ্যিক
প্রভাব দেখতে পারা যায় না।
চিত্র-১। কামানের গোলা দিয়ে নিউটনের মানসিক পরীক্ষা।
নিউটন দেখলেন
যে মাধ্যাকর্ষন বলের প্রভাব দূরত্বের সাথে কমলেও ধীরে ধীরে কমে। তিনি নির্ণয় করলেন এই মাধ্যাকর্ষন বলের জন্যই সূর্যমন্ডলীর গ্রহরা
সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে। তিনি জানতেন বলের প্রভাবে যে কোন বস্তু একই গতিতে
সরলরেখায় বলের দিকে যেতে থাকে, কিন্তু গ্রহরা সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে বন্ধ কক্ষপথে। তার প্রশ্ন হল
মাধ্যাকর্ষণ বলের প্রভাবে কি করে তিনি বন্ধ কক্ষপথ পেতে পারেন? তিনি একটি মানসিক পরীক্ষা করলেন। ধরা যাক, একটি উঁচু পাহাড় থেকে তিনি একটি কামানের গোলা ছুড়লেন।
গোলাটি সোজা কিছুদূর গিয়ে পরে
বাঁকাপ্থে ভূপৃষ্ঠে পড়বে। নিউটন তার গতিবিদ্যার জ্ঞান থেকে
জানতেন যে কোন বল প্রয়োগ না হলে স্থির বস্তু স্থির থাকে এবং চলমান বস্তু একই গতিতে
সোজা চলতে থাকে। কেন কামানের গোলাটি পথপরিবর্তন করল? নিশ্চয় তার উপর বলপ্রয়োগ
হয়েছে। নিউটন নির্ণয় করলেন কামানের গোলা ও পৃথিবীর মধ্যে মাধ্যাকর্ষন বলের প্রভাবেই কামানের গোলাটির পথপরিবর্তন। যদি কামানে আরও
বেশি বারুদ দিয়ে ছোড়া যেত তাহলে কি হত? গোলাটি ভূপৃষ্ঠে পড়ত, তবে আরও বেশি দূরে
গিয়ে। যদি গোলাটি এমন জোরে ছোড়া যায় যে গোলাটির গতিপথ ভূপৃষ্ঠের
বক্রতার সাথে মিলে যায় তাহলে কি হবে? তাহলে গোলাটি অনন্তকাল ধরে পৃথিবীকে
প্রদক্ষিন করতে থাকবে, গোলাটি পৃথিবীর
একটি উপগ্রহে পরিনিত হবে। যদি গোলাটি আরও জোরে ছোড়া যায় তবে গোলাটি একটি উপবৃত্তে
পৃথিবীকে প্রদক্ষিন
করতে থাকবে।
মানসিক
পরীক্ষায় গ্রহদের বন্ধ কক্ষপথ পাওয়ার পর প্রশ্ন এল কি নিয়মে মাধ্যাকর্ষণ
শক্তি দূরত্বের সাথে কমবে। নানা নিয়মে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি দূরত্বের সাথে কমতে পারে,
দূরত্বের ব্যাস্তানুপাতিক, দূরত্বের বর্গের ব্যাস্তানুপাতিক, দূরত্বের
ঘনের ব্যাস্তানুপাতিক, ইত্যাদি। এইখানে নিউটনের পথপ্রদর্শক হল জোহানেস কেপলারের তিনটি
নিয়ম, যার একটি হল, গ্রহরা উপবৃত্তাকার কক্ষে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। তার আবিষ্কৃত
ফ্লাক্সিওন পদ্ধতি ব্যাবহার করে নিউটন মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে গ্রহপথ গণনা করে
দেখলেন একমাত্র দূরত্বের বর্গের ব্যাস্তানুপাতিক
মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবেই গ্রহরা উপবৃত্তাকার কক্ষে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। কেপলারের
অন্য দুইটি নিয়মও তিনি গণনা করে পেলেন। তখনই নিউটন তার সুপ্রসিদ্ধ মাধ্যাকর্ষন
সূত্র লিখলেন,
“এই মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুকণা একে অপরকে
নিজের দিকে আকর্ষণ করে।
এই আকর্ষণ বলের
মান বস্তু কণাদ্বয়ের ভরের গুণ ফলের সমানুপাতিক এবং, এদের মধ্যবর্তী দূরত্বের বর্গের ব্যাস্তানুপাতিক এবং এই বল বস্তুদ্বয়ের
কেন্দ্র সংযোজক সরলরেখা বরাবর ক্রিয়া করে।"
চিত্র ২। আলোর সাতটি রঙ দেখানোর
জন্য প্রিজম দিয়ে নিউটনের পরীক্ষা
উলসথ্রপে নিউটন আলোর উপরও গবেষণা করেন। আলো ও রঙ সম্বন্ধে আমাদের বর্তমান জ্ঞান নিউটনের জন্য
হয়েছে। আলোর রঙ সাদা। নিউটনের আগে মনে করা হতো আলো কোন মাধ্যমের মধ্যে দিয়ে গেলেই
রঙ প্রাপ্ত বা রঙ্গিন হয়। রবার্ট হুক[8]
(১৬৩৫-১৭০৩), নিউটনের সময়কার একজন বিশিষ্ট
ইংরেজ বিজ্ঞানীও তাই মনে করতেন। নিউটনের নোটবুক থেকে আমরা জানতে পারি কেমব্রিজে
প্লেগের প্রাদুর্ভাবের কিছু আগে, আলোর রঙ সম্বন্ধে গবেষণা করার জন্য তিনি একটি
কাচের প্রিজম কিনেছিলেন। প্রথম শতাব্দীতেই রোমান সাম্রাজ্যে প্রিজমের ব্যবহার জানা
ছিল, প্রিজম থেকে বিচ্ছুরিত আলো যে রামধ্নুর সাত রঙে; বেগুনী, নীল, আসমানী, সবুজ,
হলুদ, কমলা ও লাল রঙে ভেঙ্গে যায় তাও জানা ছিল। কিন্তু মনে করা হত, এই সাতটি রঙ প্রিজম থেকেই
আসে। উলস্থ্রপে থাকাকালীন নিউটন একটি সহজ অথচ অভিনব পরীক্ষা করে নিশ্চিত হন যে এই রঙ
আলোর মধ্যেই থাকে,
প্রিজম থেকে আসে না। নিউটনের হাতে আঁকা পরীক্ষাটির একটি চিত্র ছবিতে দেখান
হয়েছে। একটি প্রিজমের সাহায্যে নিউটন
প্রথমে সাদা আলোকে সাতটি রঙে বিভক্ত করেন। পরে দ্বিতীয় একটি প্রিজমের সাহায্যে সেই
সাতটি রঙকে মিলিয়ে আবার সাদা আলোতে পরিনিত করেন। নিউটনের এই পরীক্ষাটি “মূল
পরীক্ষা” বা এক্সপেরিমেন্টাম ক্রুছিস ( Experimentum Crucis) নামে বিখ্যাত।
নিউটন একটি যন্ত্রও বানিয়েছিলেন আলোর
সাতটি রঙ সহজে দেখানোর জন্য। চিত্রে যেমন দেখান হয়েছে, তেমনি একটি গোলাকার চাকতি তিনি
রামধ্নুর সাতটি রঙের এঁকেছিলেন। চাকতিটি জোরে ঘোরালে সাতটি রঙ মিশে সাদা রঙ দেখতে পাওয়া যায়।
চিত্র ৩। আলো সাতটি রঙ্গের মিশ্রন সহজে দেখানোর জন্য নিউটনের চাকতি।
নিউটনের চরিত্রের একটি বৈশিষ্ট ছিল যে তিনি প্রচারবিমুখ ছিলেন। এতসব
আবিষ্কারের পর তিনি কোন প্রকার চাঞ্চল্য প্রকাশ করলেন না, বা চেষ্টা করলেন না পন্ডিতজনদের
তার আবিষ্কারের কথা জানাতে। প্রকৃতির একটি সত্য তিনি আবিষ্কার করেছেন, এই তার
আনন্দ, এতেই তিনি খুশি।
২ সেপ্টেম্বর
১৬৬৬ লন্ডনে শহরে আগুন লাগে এবং প্লেগ আক্রান্ত লন্ডনবাসীর দূর্দশা চূড়ান্ত সীমায়
পৌছায়। আগুনে লন্ডন শহর প্রায় ধংস হয়ে যায়। আনুমানিক ১৩২০০ বাড়ি, ৮৭ গীর্জা,
বিখ্যাত সেন্ট পলস গীর্জা আগুনে পুড়ে যায় এবং প্রায় ৮০০০০ লন্ডনবাসীর আনুমানিক ৭০০০০ জন গৃহহীন হন।
আশ্চর্যজনকভাবে এই বিধ্বংসী আগুনে প্রচুর সম্পত্তি নষ্ট হলেও সরকারী মতে খুব
কম প্রাণহানি হয়। লন্ডনের প্লেগে প্রায় ১০০০০০ মৃত্যু হয় আর আগুনে মারা যান মাত্র
ছয় থেকে আট জন। লণ্ডন অগ্নিকান্ডের পর ধীরে ধীরে প্লেগের প্রকোপ কমে আসে। অনেকে
মনে করেন এই অগ্নিকান্ডে লন্ডনের অস্বাস্থ্যকর নোংরা বাড়িঘরের সাথে সাথে ইঁদুর ও
প্লেগ ছড়ানোর কীটও ধংস হয়ে যাওয়াতে প্লেগের প্রকোপ কমে। উল্লেখ্য যে ১৬৬৬ সালের
পরে লন্ডনে আর প্লেগের প্রাদুর্ভাব হয়নি। প্লেগের প্রকোপ কমার পর, ১৬৬৭ সালের এপ্রিল মাসে পুনরায় কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়
চালু হয় এবং নিউটন কেমব্রজে ফিরে আসেন। অক্টোবর
মাসে নিউটন কেমব্রিজের “ফেলো” হিসাবে নির্বাচিত হন। সম্ভবত ফেলো নির্বাচিত
হওয়ার পর নিউটন গণিতের অধ্যাপক আইজাক ব্যারোর ঘনিষ্ট সান্ধিধ্যে আসেন।
আইজাক ব্যারো ছিলেন একজন খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্ববিদ ও কেমব্রিজের গণিতের প্রথম লুকাসিয়ান প্রফেসর[9]। ১৬৬৮ সালে জার্মানীর প্রফেসর নিকোলাস মারকেটর “লগারিদমের
প্রযুক্তি” নামে লগারিদমের[10]
উপর একটি গণিতের বই প্রকাশ করেন যেখানে
অসীম ক্রমের উপর কিছু গবেষণা ছিল, যার বেশির ভাগই নিউটন উলসথ্রপে থাকাকালীন
আবিষ্কার করেছিলেন। মারকেটরএর বই প্রকাশ হবার পরেই নিউটন তার গণিতের কিছু
আবিষ্কারের কথা ব্যারোকে জানান। ব্যারো নিউটনের
অত্যাশ্চর্য
প্রতিভার পরিচয়
পেয়ে মুগ্ধ হন। ব্যারোর উৎসাহে নিউটন তার গবেষণা
অন্যান্য গণিতজ্ঞকে জানাতে রাজী হলেন। ব্যারো নিউটনের নাম গোপন করে তার গবেষণার কিছু অংশ তদানিন্তনকার
বিশিষ্ট গণিতজ্ঞ জন কলিন্সকে পাঠান। কলিন্সের প্রভূত প্রশংসার পরেই ব্যারো তাকে নিউটনের নাম জানান,
“আমি খুব আনন্দিত যে আমার বন্ধুর গবেষণা আপনার
ভালো লেগেছে। বন্ধুর নাম নিউটন, খুবই তরুন ও আমার কলেজের ফেলো, কিন্তু
অসাধারন প্রতিভাবান এবং এই ব্যাপারে (গনিতের বিষয়ে) খুবই দক্ষ।“
কলিন্স নিউটনের
গবেষণা প্রকাশ করতে চাইলেও স্বভাবত গোপনীয়তাপ্রিয় নিউটন রাজী হলেন না। অনেক পরে,
১৭১১ সালে, নিউটনের ৬৮ বছর বয়সে “দি অ্যানালিসিস”
এই শিরোনামে ফ্লাক্সিওন বা ক্যাল্কুলাস নিয়ে তার কাজ প্রথম প্রকাশিত হয়।
১৬৬৮ সালে
নিউটন এমএ পাশ করলেন । ১৬৬৯ সালে আইজাক ব্যারো ইংলন্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লসের
ধর্মযাজক হিসেবে নিযুক্ত হন এবং কিছু পরে তিনি
ট্রিনিটি কলেজের মাস্টার নিযুক্ত হন। নিউটনের প্রতিভায় ব্যারো এতই অভিভূত হয়েছিলেন যে
কেম্ব্রিজ ত্যাগকালে তিনি নিউটনকে গণিতের লুকাসিয়ান প্রফেসর পদের জন্য সুপারিশ
করেন। কেম্ব্রিজ কর্তৃপক্ষ সেই সুপারিশ মেনে নেন এবং
মাত্র সাতাশ বছর বয়সে নিউটন কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের লুকাসিয়ান অধ্যাপক নিযুক্ত হন।
১৬৬৮ সালে, কেমব্রিজে
অধ্যাপনাকালে, নিউটন
আবিষ্কার করেন রিফ্লেক্টিং টেলিস্কোপ বা
প্রতিফলিত টেলিস্কোপ। এই আবিষ্কার জ্যোর্তিবিজ্ঞানের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ন ছিল। আমরা জানি
১৬০৯ সালে গ্যালিলিও গ্যালিলি টেলিস্কোপ বা দূরবীণ আবিষ্কার করেছিলেন। সেই
দূরবীনের ভিত্তি ছিল আলোর প্রতিসরণ সূত্র। এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে গেলে আলোর
গতি পথের পরিবর্তন হয়, একে বলা হয় প্রতিসরণ। গ্যালিলিওর দূরবীণে বস্তু থেকে আলো কাচের লেন্সে প্রতিসরিত হয়ে
আইপীসে বস্তুটির প্রতিবিম্ব
তৈরী করে। স্কটিশ গণিতজ্ঞ ও জ্যোর্তিবিজ্ঞানী জেমস গ্রেগরী ( ১৬৩৮-১৬৭৫) আলোর
প্রতিফলন সূত্র ব্যবহার করে একটি প্রতিফলিত টেলিস্কোপ বানাতে চেষ্টা করেছিলেন,
একটি নকশাও দিয়েছিলেন, কিন্তু বানাতে পারেন নি। একটি বিশেষ কারনে নিউটন প্রতিফলিত
টেলিস্কোপ বানানোর কথা ভাবলেন। প্রিজম দিয়ে আলোর উপর অনেক পরীক্ষা করে নিউটন
জানতেন যে কাচের মধ্যে দিয়ে গেলে বিভিন্ন রঙের আলোর গতিপথের পরিবর্তন বিভিন্ন
প্রকার হয়, নীল রঙের আলোর গতিপথ সবচাইতে বেশি পরিবর্তন হয় এবং লাল রঙের আলোর
সবচাইতে কম। এই কারনে একটি বিন্দু থেকে আলো প্রতিসরিত হয়ে প্রতিবিম্ব তৈরী হলে,
সেই প্রতিবিম্বটি বিন্দু হয় না, তার
একটি বিস্তার বা ব্যাপ্তি থাকে। প্রতিসরণের সমস্ত রঙকে একটি বিন্দুকে পর্যবেসিত না
করতে পারার অক্ষমতাকে বলা হয় ক্রোমাটিক অ্যাবারেসন বা বর্ণীয় স্খলন। এই অক্ষমতার
জন্য গ্যালিলিওর দূরবীনে গ্রহদের প্রতিবিম্ব খুব স্পষ্ট ও উজ্জল হতো না। প্রতিফলনে
তৈরী প্রতিবিম্বে বর্ণীয় স্খলন হয় না। আমরা আয়নায় যে খুব স্পষ্ট ও উজ্জ্বল
প্রতিবিম্ব দেখি তা তৈরী হয় প্রতিফলন সূত্র অনুযায়ী। নিউটন আশা
করলেন বর্ণীয় স্খলন থেকে মুক্ত প্রতিফলিত টেলেস্কোপে গ্রহ-তারাদের উজ্জ্বল ও স্পষ্ট প্রতিবিম্ব দেখা
যাবে। নিউটনের তৈরী দূরবীনের একটি
রূপরেখা চিত্রে দেখান হয়েছে। বস্তু থেকে আলোর রশ্মি প্রথমে একটি কনকেভ মিরর বা
অবতল আয়নাতে প্রতিফলিত হয়। সেই প্রতিফলিত রশ্মি একটি সমতল আয়নায় পুনরায় প্রতিফলিত
হয়ে আইপীসে বস্তুটির প্রতিবিম্ব তৈরী করে।
নিউটন অবতল আয়নাটি বানালেন পাতলা ধাতুর
পাত দিয়ে। তার উপর আস্তরণ দিলেন তামা, টিন,
আর্সেনিক দিয়ে বানানো একটি বিশেষ খাদ দিয়ে এবং পালিশ করে মসৃণ করলেন। অবতল আয়না ও
অন্যান্য অংশ একটি ছোট নলের মধ্যে স্থাপন করে
টেলিস্কোপটি বানালেন।
নিউটনের
টেলেস্কোপটির ম্যাগনিফিকেসন ছিল প্রায় ৪০। নিউটন বলেছিলেন যে এই টেলেস্কোপটি দিয়ে গোলাকার বৃহষ্পতি ও তার
গ্রহদের তিনি স্পষ্ট ভাবেই দেখতে পারেন। নিউটন প্রচার বিমুখ হলেও তার এই
আবিষ্কারের কথা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। লন্ডনের রয়্যাল
সোসাইটির সদস্যরা এই টেলিস্কোপটি দেখার জন্য উদগ্রীব হলেন। ১৬৭১ সালে ব্যারোর অনুরোধে
নিউটন তার দূরবীন লন্ডন রয়্যাল সোসাইটির সদস্যদের কাছে প্রদর্শন করলেন। নিউটনের দূরবীণ
পন্ডিত সমাজে খুবই সমাদৃত হল, সদস্যরা গ্রহদের উজ্জ্বল ও স্পষ্ট ছবি
দেখে মুগ্ধ হলেন। নিউটনের খ্যাতি বৃদ্ধি পেল এবং কিছুদিন পর তিনি লন্ডনের রয়াল সোসাইটির সদস্য নির্বাচিত হলেন।
চিত্র ৫। নিউটনের বানানো টেলিস্কোপের একটি ছবি। উকিমিডিয়া
কমন থেকে নেওয়া।
তদানিন্তনকার রয়্যাল
সোসাইটির প্রেসিডেন্ট হেনরি ওল্ডেনবার্গের অনুরোধে নিউটন তার আলোর উপর গবেষণা
প্রকাশ করতে রাজী হলেন। নিউটন তার গবেষণাপত্রটির কোন নাম দেন নি, রয়্যাল সোসাইটি
পত্রটি “একটি অনুমান” বা অ্যান হাইপোথেসিস নামে প্রকাশ করেছিল। গবেষণাপত্রটি
পন্ডিত মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করল। ডাচ বিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান হাইজেন
নিউটনের গবেষণার, বিশেষত, আলো সাতটি রঙের মিশ্রণ, এই তত্ত্বের উচ্চ প্রশংসা করলেন।
বিজ্ঞানী রবার্ট হুক পক্ষান্তরে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দিলেন। আলো সাতটি রঙের মিশ্রণ
এই তত্ত্ব ছাড়াও নিউটন আলোর ‘কণা তত্ত্ব” বা করপাসকুলার থিয়োরী দিয়েছিলেন। সেই সময়
তত্ত্ব ছিল আলো তরঙ্গ দ্বারা গঠিত। নিউটন প্রথম বললেন আলো ছোট ছোট কণা বা করপাসকল দিয়ে তৈরী। নিউটনের আলোর কণা তত্ত্বের সাথে
আলোর বর্তমান ফোটন তত্ত্বের যথেষ্ট মিল থাকলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে।
ফোটনের কোন ভর বা মাস নেই, নিউটনের
করপাসকলের বা কনার ভর বা মাস আছে। সেই সময় নিউটন তার কণা তত্ত্বের যথেষ্ট প্রমান
দিতে পারেন নি, তত্ত্বটি অনেকটাই অনুমান ভিত্তিক ছিল। রবার্ট হুক আলোর তরঙ্গ
তত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন এবং নিউটনের আলোর কণা তত্ত্বের সমালোচনা করলেন। নিউটনের
চরিত্রের একটি বড় দোষ ছিল যে তিনি সমালোচনা
সহ্য করতে পারতেন না এবং প্রতিহিংসাপরায়ণ ছিলেন। তিনি রবার্ট হুকের উপর প্রচন্ড
ক্ষুব্ধ হলেন। পরে তিনি যখন রয়্যাল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন, হুককে তুচ্ছ
কারনে রয়্যাল সোসাইটি থেকে বহিষ্কার করেছিলেন, তার ছবিও রয়্যাল সোসাইটির
প্রদর্শণকক্ষ থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন।
স্বভাবত
গোপনতাপ্রিয় নিউটন আলোর উপর তার গবেষণার বিরূপ সমালোচনায় প্রচন্ড ক্ষুব্ধ হন এবং
কোন প্রকার গবেষণা প্রকাশ করা থেকে বিরত হন। অনেক পরে, ১৬৮৭ সালে প্রকাশ করেন তার
বিখ্যাত বই প্রিন্সিপিয়া[11] । প্রিন্সিপিয়া প্রকাশের এক ইতিহাস আছে। ১৬৮৪ সালের আগস্ট মাসে
বিজ্ঞানী রবার্ট হুক, জ্যোতির্বিদ এডমন্ড হ্যালী[12]
এবং স্থপতি ক্রিস্টোফার রেন[13]
কোপারনিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক মডেল নিয়ে আলোচনা করছিলেন। কেপলার তার পর্যবেক্ষণ
থেকে স্থির করেছিলেন যে গ্রহরা সূর্যকে উপবৃত্তাকারে প্রদক্ষিণ করে, কিন্তু তার
কোন গাণিতীক প্রমান দেন নি। গানিতীক প্রমান দেওয়া কি সম্ভব এই নিয়ে ছিল তাদের আলোচনা।
গ্রহরা সূর্যকে উপবৃত্তাকারে প্রদক্ষিণ করে এর প্রমান দুই মাসের মধ্যে করতে পারলে ক্রিস্টোফার রেন প্রমানকারীকে একটি দুষ্প্রাপ্য
বই উপহার দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন।
রবার্ট হুক হামবড়া স্বভাবের ছিলেন, তিনি জানান যে তিনি প্রমান করেছেন যে
মাধ্যাকর্ষন সূত্রের প্রভাবে গ্রহরা সূর্যকে উপবৃত্তাকারে প্রদক্ষিণ করে, কিন্তু
সেই প্রমান তিনি এখন জানাবেন না, দুইমাস পরেই জানাবেন। কিন্তু সাত মাস পরেও হুক
কিছু জানালেন না। হ্যালী স্থির করলেন তিনি সরাসরি নিউটনকেই জিগ্যেস করবেন। নিউটনকে
প্রশ্ন করলে সঙ্গে সঙ্গে নিউটন জানালেন যে মাধ্যাকর্ষণ সূত্রের প্রভাবে গ্রহরা
সূর্যকে উপবৃত্তাকার পথে প্রদক্ষিণ করবে। অবাক হ্যালী প্রশ্ন করলেন তিনি জানলেন কি
করে। নিউটন বললেন তিনি প্রমান করেছেন। হ্যালী প্রমান দেখতে চাইলে নিউটন তার কাগজপত্রের
মধ্যে সেই প্রমাণ খুঁজে পেলেন না, তিনি হ্যালীকে প্রতিশ্রুতি দিলেন কিছুদিনের
মধ্যেই সেই প্রমান তিনি হ্যালীকে পাঠাবেন। নিউটন প্রায় তিন মাস সময় ধরে নূতন করে গণনা
করে হ্যালীকে সেই প্রমাণ, নয়
পাতার গবেষণা পত্র
“ঘূর্ণিয়মান বস্তুর
উপর” বা De Motu Corporum in Gyrum (On the Motion of
Revolving Bodies) পাঠালেন। হ্যালী তার গবেষণা পড়ে স্থম্ভিত হলেন। নিউটনের রচনায় নূতন এক
গতিবিদ্যার বীজ তিনি দেখতে পেলেন। হ্যালী ‘দি মতু’ রয়্যাল সোসাইটিতে পড়লেন এবং নিউটনের
কাছে গবেষণা পত্রটি প্রকাশ করার অনুমতি চাইলেন। নিউটন জানালেন যে নতুন করে বিষয়টা
যখন শুরু করেছেন, বিষয়টা পুরো জেনেই তিনি কিছু প্রকাশ করবেন। দীর্ঘ আঠারমাস ধরে
অক্লান্ত পরিশ্রমের পর তৈরী হল প্রিন্সিপিয়া। রয়্যাল সোসাইটি প্রিন্সিপিয়া প্রকাশ
করতে চাইলেও অর্থের অভাবে প্রকাশ করতে পারল না। অবশেষে হ্যালী প্রিন্সিপিয়া
প্রকাশের ব্যায় বহন করতে রাজী হলেন। হ্যালীর সম্পাদনায় ৫ জুলাই, ১৬৮৭ সালে
বিজ্ঞানের জগতের এক অনন্যসাধারন বই প্রিন্সিপিয়া প্রকাশিত হল। ইতিমধ্যে রবার্ট হুক
দাবি করলেন মাধ্যাকর্ষণ সূত্র তিনি প্রথমে আবিষ্কার করেছেন, নিউটন তার আবিষ্কার
চুরি করেছেন। এই অন্যায্য দাবিতে নিউটন প্রচন্ড ক্ষুব্ধ হলেন, তিনি প্রিন্সপিয়া
থেকে হুকের সমস্ত উল্লেখ মুছে দিলেন। নিউটনের সময় তো বটেই, বর্তমানেও তিন খন্ডের
প্রিন্সিপিয়া খুব সহজপাঠ্য বই নয়। প্রথম খন্ডে নিউটন কঠিন বস্তুর প্রতিরোধবিহীন
গতি নিয়ে আলোচনা করলেন। দ্বিতীয় খন্ডে প্রতিরোধি মাধ্যমে কঠিন বস্তুর গতি ও তরল
বস্তুর গতি নিয়ে আলোচনা করলেন। তৃতীয় খন্ডে, যার নাম দিয়েছিলেন “বিশ্বপ্রণালীর
উপর” (On the system of the world), আলোচনা করলেন মাধ্যাকর্ষণ সূত্রের বিভিন্ন পরিণিতির উপর। মাধ্যাকর্ষণ সূত্রের
সাহায্যে প্রমাণ করলেন কেপলারের তিনটি আইন, গণনা করলেন চাঁদ ও বিভিন্ন গ্রহের গতিপথ, ধূমকেতুর গতিপথ, দিলেন
জোয়ার-ভাটার সঠিক ব্যাখ্যা। জ্যোর্তিবিদদের একটি বড় সমস্যা ছিল প্রিসিসন অফ ইকুইনক্সের[14] (precession of the equinoxes) ব্যাখ্যা।
কোপারনিকাস, কেপলার এরাও প্রিসিসন অফ ইকুইনক্সের ব্যাখ্যা দিতে পারেন নি। নিউটন
প্রথম প্রিসিসন অফ ইকুইনক্সের ব্যাখ্যা দিতে সমর্থ হলেন।
নিউটনের বিশদ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ গণনা কোপারনিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক মডেলের সমস্ত বিরোধীকে মাথা নত
করতে বাধ্য করল। প্রিন্সিপিয়া প্রকাশের পর নিউটনের খ্যাতি বিশেষভাবে বৃদ্ধি পেল।
আন্তর্জাতিক মহলে বিশিষ্ট বিজ্ঞানী হিসেবে মর্যাদা পেলেন। নিউটন ১৬৮৯-৯০ এবং ১৭০১-০২ ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টে কেমব্রিজ
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্ব করার দায়িত্ব পেলেন। যদিও পার্লামেন্টে তিনি কখনও বক্তব্য রাখেননি,
কিন্তু যথেষ্ট নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৭০৪ সালে, আলো নিয়ে তার সারা
জীবনের কাজ নিয়ে প্রকাশ করেন তার দ্বিতীয়
বই, অপটিকস (Optiks)। অপটিকসে প্রকাশিত বেশির ভাগ কাজই তিনি কেমব্রিজে থাকাকালীন সম্পন্ন
করেছিলেন। ১৭১৩ সালে প্রকাশ করেন প্রিন্সিপিয়ার দ্বিতীয় সংস্করন। প্রিন্সিপিয়ার
দ্বিতীয় সংস্করন প্রকাশের সময় তিনি বিশিষ্ট জ্যোতির্বিজ্ঞানী জন ফ্লামস্টীডের (John Flamsteed) সঙ্গে
বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন।
১৬৯৬ সালে নিউটন ইংল্যান্ডের কোষাগারের ওয়ার্ডেন অফ মিন্ট (Warden of Mint) ও ১৭০০ সালে
মাস্টার অফ মিন্ট (Master of Mint) নিযুক্ত। সেই সময়
ইংল্যান্ডে প্রচুর নকল মুদ্রা চালু ছিল। নিউটন কঠোর ব্যাবস্থা নিয়ে নকল
মুদ্রা প্রস্তুতকারীদের দমন করেন, এমন কি তিনি কিছু বিখ্যাত মুদ্রা নকলকারীকে ফাঁসিও দেন। তার ব্যাবস্থাপনায়
সুশৃঙ্খলভাবে ইংল্যান্ডে
নতুন মুদ্রা চালু হয়।
উল্লেখ্য যে প্রিন্সিপিয়া প্রকাশের পর নিউটন আর বিশেষ বিজ্ঞান চর্চ্চা করেন
নি। জীবনের শেষ ৩০
বছর নিউটন অ্যালকেমি (Alchemy) ও ধর্মতত্ত্ব নিয়ে চর্চ্চা করেছেন। নিউটনের জীবনকালে তার
অ্যালকেমি নিয়ে চর্চ্চার কথা জানা ছিল না। অ্যালকেমিস্টদের (যারা অ্যালকেমি নিয়ে
চর্চ্চা করেন) মুখ্য উদ্দেশ্য সস্তা ও
সহজপ্রাপ্য অন্যান্য ধাতুকে সোনায় রূপান্তর করা,
চির যৌবনদায়ী দ্রবন বা এলিক্সির অফ
লাইফ বানানো, যে কোন বস্তুকে দ্রবীভূত করবে এমন সার্বজনীন দ্রাবক বানানো, সর্বরোগহর ঔষধ
বানানো ইত্যাদি। বর্তমানে আমরা জানি অ্যালকেমি একটি ছদ্ম-বৈজ্ঞানিক প্রথা, সত্যিকারের বিজ্ঞান নয়, কিন্তু ১৭’শ
শতাব্দীতে তা জানা ছিল না। রবার্ট বয়েল, স্টীফেন হেলের মতন নামকরা বিজ্ঞানীরা তখন অ্যালকেমি
চর্চ্চা করেছেন এবং এটা অনিস্বীকার্য যে অ্যালকেমি চর্চ্চা থেকেই জন্ম নিয়েছে
আধুনিক রসায়ন বিজ্ঞান। নিউটনের গবেষণা পড়ে জানা যায় অন্যান্য অ্যালকেমিস্টদের মত
সোনা বা চির যৌবনদায়ী দ্রবন বানানোর
উদ্দেশ্য তার ছিল না। তিনি অ্যালকেমি চর্চ্চা করেছেন আরও বিশদভাবে পদার্থের ধর্ম জানবার
জন্য। ১৬৬৬-র আগে নিউটনের আগ্রহ ছিল বৃহৎ-বিশ্ব বা মাক্রোকোজম (macrocosm) সম্বন্ধে জানা। বৃহৎ-বিশ্বে
আছে খালি চোখে দেখা
যায় সেই সব বস্তু ও গ্রহ-তারা আদি। ১৬৬৬ পরে তার ক্ষুদ্র-বিশ্ব বা মাইক্রোজম (microcosm), অণু-পরমাণু সম্বন্ধে
জানার আগ্রহ হয়। তিনি
ভেবেছিলেন, অ্যালকেমির চর্চ্চা থেকে আলো
কি, মাধ্যাকর্ষণ শক্তি বা চৌম্বক শক্তির
উৎপত্তির সঠিক কারন কি, ইত্যাদি জানতে পারবেন। ১৬৮০ সালে নিউটন অ্যালকেমির পরীক্ষা-নিরীক্ষায়
বিশেষ ব্যস্ত হওয়ায় হামফ্রে নিউটন নামে এক আত্মীয়কে সহকারীর হিসেবে নিযুক্ত করেন।
নিউটন সম্বন্ধে হামফ্রে বলেছিলেন,
“তিনি গবেষণায়
এতই নিমগ্ন থাকতেন যে অনেক সময়ই খাবার কথা ভুলে যেতেন। খুব কম সময়ই তিনি রাত ২ -৩ টার আগে শুতে যেতেন। মাঝে মাঝে
টানা ৬ সপ্তাহ তার পরীক্ষাগারেই কাটিয়ে দিতেন। তিনি কি খুজে চলেছিলেন, তার লক্ষ্য কি ছিল আমি বুঝতে পারিনি, কিন্তু তার অধ্যবসায়, প্রযত্ন দেখে মনে হয় সেই লক্ষ্য মানুষের বুদ্ধি ও পরিশ্রমের বাইরে।“
সেই সময়কার
অধিকাংশ মানুষের মত নিউটনও ধর্মভীরু ছিলেন, ভগবান ও দৈবশক্তিতে বিশ্বাস করতেন, মনে করতেন প্রকৃতির অনেক
কিছুই ভগবানের পরিকল্পনা মতো হয়। এরিষ্টটল-টলেমীর মডেলের বদলে সূর্যকেন্দ্রি্ক মডেল
প্রতিষ্ঠিত হলেও একটি প্রশ্ন ছিল সূর্য ও গ্রহ, উপগ্রহদের মধ্যে এত পারষ্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সত্ত্বেও সৌরমন্ডলী
কি করে স্থিতিশীল থাকে, কেন সব গ্রহউপগ্রহরা
সূর্যের উপর পড়ে
বিনষ্ট হয় না। রিচার্ড বেন্টলীকে[15]
তিনি লিখেছিলেন,
“পৃথিবীর দৈনিকগতির ব্যাখ্যা মাধ্যাকর্ষণ সূত্র দেয় না। অবশ্যই কোন দৈবশক্তি এই গতির জন্য দায়ী।“
নিউটনের
ধর্মচর্চ্চার পিছনে ও একটি মহৎ উদ্দেশ্য ছিল। সেই সময় “প্রাচীনদের জ্ঞান” বা উইসডম অফ এনসিয়েন্ট (Wisdom of ancient) বলে একটি মতবাদ চালু
ছিল। এই মতবাদে মনে
করা হয় প্রকৃতির সকল সত্য প্রাচীন জ্ঞানীপুরুষদের জানা ছিল এবং তারা সেই সকল সত্য
বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে প্রতীকী ভাষায় লিখে
গেছেন। এই মতবাদে
বিশ্বাসী নিউটনের ধর্মচর্চ্চার
মূল উদ্দেশ্য ছিল সেই প্রতীকী ভাষার পাঠোদ্ধার করে প্রকৃতির রহস্য উদ্ধার করা।
নিউটন বিবাহ করেন নি[16]।
কেমব্রিজে তিনি একাই থাকতেন। ওয়ার্ডেন অফ
মিন্ট নিযুক্ত হবার পর তিনি লন্ডনে স্থানান্তরিত হন। সরকারী প্রয়োজনে লন্ডনে নিউটনকে
অনেক অতিথির আপ্যায়ন করতে হত এবং সেইজন্য তার একজন গৃহকর্তীর প্রয়োজন হয়। নিউটন তার
সৎবোনের কন্যা ক্যাথরিন বারটনকে তার গৃহকর্তীর দায়িত্ব দেন।
প্রায় আশি বছর
বয়সে মূত্রথলিতে পাথরের (Kidney stone) কারনে নিউটন গুরুতর অসুস্থ হন।
ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও রয়্যাল সোসাইটির সদস্য ডঃ রিচার্ড মিডের চিকিৎসায় ধীরে ধীরে
সুস্থ হন। ১৭২৭ সালে নিউটন পুনরায় একই কারনে অসুস্থ হন। এইবার তিনি আর সুস্থ হলেন
না। ৩১ মার্চ, ১৭২৭, এই বরেণ্য বিজ্ঞানী মৃত্যুবরন করলেন। তাকে ইংল্যান্ডের
প্রসিদ্ধ গীর্জা, ওয়েস্ট মিনিস্টার অ্যাবেতে সমাধিস্থ করা হয়। মৃত্যুর কিছুদিন আগে নিউটন বলেছিলেন,
“আমি জানি না বর্হিবিশ্ব
আমাকে কি মনে করে, কিন্তু আমার নিজের কাছে আমি একটি ছোট ছেলের মত, যে ছেলেটি সমুদ্রতীরে খেলে বেড়াচ্ছে ও মাঝে মাঝে একটি-দুটি
নুড়িপাথর তুলে নিচ্ছে। সামনে পড়ে
রয়েছে অনাবিষ্কৃত সত্যের বিশাল সমুদ্র।“
[1] এডমন্ড হ্যালী
একজন বিশিষ্ট গণিতজ্ঞ ও জ্যোর্তিবিদ ছিলেন। ১৬৮২ সালে হ্যালী নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ
সূত্রের সাহায্যে একটি ধূমকেতুর গতিপথ নির্ণয় করেন এবং সঠিকভাবে ভবিষ্যতবাণী করেন
যে ধূমকেতুটি ১৭৫৮ সালে ফিরে আসবে।
ধূমকেতুটি বর্তমানে হ্যালীর ধূমকেতু নামে পরিচিত।
[2] তরল পদার্থ পরিমাপের একক, ১ কোয়ার্ট=১.১৩ লিটার।
[3] সংক্ষিপ্ত ও প্রতীকি চিহ্ন দিয়ে তাড়াতাড়ি লেখার
নিয়ম।
[4] স্যাবাধ ক্রিশ্চিয়ানদের এক পবিত্রদিন, সাধারণত রবিবারে হয়। এইদিন
ক্রিশ্চিয়ানরা কোন কাজ করেননা, ধর্মীয় কাজে নিযুক্ত থাকেন।
[5] বিজ্ঞানের ইতিহাসে
১৯০৫ সালও বিস্ময়কর বছর বলে পরিচিত। সেই বছর বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন পাঁচটি যুগান্তকারী
গবেষনাপত্র রচনা করেন যা স্থান ও কাল (বা সময়), ভর ও শক্তি সম্বন্ধে আমাদের
তদানীন্তনকার ধারনা পালটে দেয়। এই সম্বন্ধে পরে বিস্তারিত আলোচনার ইচ্ছে রইল।
[6] ১৬৬৫-৬৬ সালে
ক্যাল্কুলাস আবিষ্কার করলেও নিউটন সেই আবিষ্কার প্রকাশ করেন নি। প্রতিভাবান লিবনিজ
স্বাধীনভাবে ক্যাল্কুলাস আবিষ্কার করেন। তিনি অনেক উন্নতমানের প্রতীকী চিহ্নও ব্যাবহার করেছিলেন। ক্যালকুলাসের পূর্ণ বিবরণ
লিবনিজ ১৬৮৪ সালে প্রকাশ করেন। নিউটন দাবী করলেন লিবনিজ তার আবিষ্কার চুরি করেছেন। তার দাবির ভিত্তি ছিল যে ১৭৭৬
সালে লন্ডনে ভ্রমনে এসে লিবনিজ গণিতজ্ঞ জন কলিন্সের কাছে নিউটনের ফ্লাক্সিওন নিয়ে লেখা দেখেছিলেন।
ঘটনাটা ঘটেছিল এই যে লিবনিজের এর প্রতিভায় মুগ্ধ কলিন্স তাকে জানাতে চাইছিলেন যে
ইংল্যান্ডেও কিছু প্রতিভাবান গণিতজ্ঞ আছেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি নিউটনের কিছু লেখা
(যা তার কাছে ছিল) লিবনিজকে দেখিয়েছিলেন। নিউটনের ফ্লাক্সিওন নিয়ে লিবনিজের বিশেষ
উৎসাহ ছিল না কারন সেই সময় ক্যালকুলাস তার
আয়ত্ত্বে ছিল। বিতর্ক চরমে উঠতে লিবনিজ রয়্যাল সোসাইটির কাছে বিচার চাইলেন।
সেই সময় নিউটন ছিলেন রয়্যাল সোসাইটির
প্রেসিডেন্ট। কে প্রথম ক্যাল্কুলাস আবিষ্কার করেছেন সেই বিচার করার জন্য নিউটন ঘনিষ্ঠ
কয়েকজন নিয়ে একটি কমিটি গড়লেন। স্বভাবতই কমিটি নিউটনের পক্ষে রায় দিল এবং লিবনিজকে
চুরির দায়ে অভিযুক্ত করল। পরে জানা গিয়েছে, কমিটির রিপোর্ট নিউটন নিজেই লিখেছিলেন।
[7] উইলিয়াম স্টাকলী একজন ইংরেজ চিকিৎসক ও প্রত্নতত্ত্ববিদ। তিনি স্টোনহেঞ্জ
নামক প্রাগৈতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানের অন্যতম আবিষ্কারক। প্রধানত তার উদ্যোগেই
প্রত্নতত্ত্ব বিজ্ঞানের মর্যাদা
পায়।
[8] রবার্ট হুক
একজন বিশিষ্ট ইংরেজ দার্শনিক ও বিজ্ঞানী ছিলেন। প্রথম জীবনে হুক রসায়নবিদ রবার্ট
বয়েলের সহকারী ছিলেন এবং তার বিভিন্ন পরীক্ষায় সাহায্য করতেন। পরে তিনি রয়্যাল সোসাইটির
কিউরেটর হন। হুক প্রথম আবিষ্কার করেন গরম করলে পদার্থের সম্প্রাসরণ হয়। হুক আলো
নিয়েও অনেক গবেষণা করেছিলেন প্রথম আবিষ্কার করেন গরম করলে পদার্থের সম্প্রাসরণ হয়।
হুক আলো নিয়েও অনেক গবেষণা করেছিলেন এবং আলোর তরঙ্গ তত্ত্বের তিনি একজন
প্রথমদিককার প্রবক্তা। বিশাল প্রতিভার অধিকারী হুক গণিতে দক্ষ ছিলেন না। অনেক সময়ই
তার ভাবনা-চিন্তাকে বিজ্ঞান-সম্মত ভাবে প্রমাণ করতে পারতেন না। যেমন তিনি
মাধ্যাকর্ষণের বিপরীত বর্গ আইন
(inverse square law) অনুমান করেছিলেন, কিন্তু গণিতে দূর্বল হওয়ায়
গ্রহদের গতিপথ
গণণা করতে পারেন নি।
[9] ব্রিটিশ পার্লামেন্টের
সদস্য রেভারেন্ড হেনরি লুকাস (১৬১০-১৬৬৩) কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতশাস্ত্রে একটি
অধ্যাপক পদের জন্য প্রতি বছর ১০০ পাউন্ডের আয়ের ব্যাবস্থা করেন। এই পদটি লুকাসিয়ান প্রফেসর বা অধ্যাপক হিসাবে পরিচিত।
[10] লগারিদম একটি বিশেষ
গাণিতীক পদ্ধতি। সাধারনভাবে বলা যায় যখন কোন একটি সংখ্যাকে একটি বিশেষ সংখ্যার পুনরাবৃত্ত গুণফলে লেখা যায়, তখন
সংখ্যাটির লগারিদম কতবার গুন করা হয়েছে এই হিসেব দেয়।
[11] প্রিন্সিপিয়ার
পুরো নাম ফিলসফি ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথামাটিকা বা প্রাকৃতিক দর্শনের
গনিতশাস্ত্র। ল্যাটিন ভাষায় লিখিত বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ৫ জুলাই,১৬৮৭।
[12] এডমন্ড হ্যালী
একজন বিশিষ্ট গণিতজ্ঞ ও জ্যোর্তিবিদ ছিলেন। ১৬৮২ সালে হ্যালী নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ
সূত্রের সাহায্যে একটি ধূমকেতুর গতিপথ নির্ণয় করেন এবং সঠিকভাবে ভবিষ্যতবাণী করেন
যে ধূমকেতুটি ১৭৫৮ সালে ফিরে আসবে।
ধূমকেতুটি বর্তমানে হ্যালীর ধূমকেতু নামে পরিচিত।
[13] ক্রিস্টোফার রেন প্রধানত স্থপতি হিসাবে বিখ্যাত হলেও একজন
বিশিষ্ট শারীরস্থানবিৎ
(anatomist), জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও গণিতজ্ঞ ছিলেন। ১৬৬৬ সালে লন্ডন শহরের অধিকাংশ আগুনে পুড়ে যায়। লন্ডন শহরের পুনর্নিমান হয়
প্রধানত ক্রিস্টোফার রেনের দায়িত্বে। ক্রিস্টোফার রেন লন্ডনের বিশিষ্ট সেন্ট পল
গীর্জার পরিকল্পনাও করেছিলেন।
[14] আমরা জানি পৃথিবী ২৪
ঘন্টায় নিজের চারপাসে একবার ঘুরে আসে। খ্রীষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে গ্রীক
দার্শনিক হিপারকাস (Hipparchus) প্রথম লক্ষ্য করেন যে
পৃথিবীর ঘূর্ণন-অক্ষটি স্থির নয়। ঘূর্ণন-অক্ষটিও ধীরে ধীরে ঘুরছে। ঐতিহ্যগতি ভাবে এই
ঘূর্ণনকে বলা হয় প্রিসিসন অফ ইকুইনক্স। ইকুইনক্স হল সময় বা দিন যখন দিন ও
রাত্রি সমমাপের হয়। বছরে দুবার এটা হয়, ২১ মার্চ ও ২৩ সেপ্টেম্বর।
[15] ইংরেজ দার্শনিক রিচার্ড বেন্টলী ছিলেন ট্রিনিটি কলেজের
মাস্টার এবং ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত্বের জনক। তিনি মহাবিশ্বের
এক বুদ্ধিমান সৃষ্টিকর্তা আছে এই তত্ত্বের প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। এই বিষয়ে বেন্টলী
নিউটনের সাথে পত্র বিনিময় করতেন।
[16] অনেকে মনে করেন, কিংস স্কুলে পড়ার সময় নিউটন তার বাড়িওলা
উইলিয়াম ক্লার্কের সৎকন্যা ক্যাথরিন স্টোরার প্রেমে পড়েছিলেন এবং ক্যাথরিনের সঙ্গে
তার বিয়ে না হওয়ার তিনি আর বিয়ে করেন নি। নিউটন ক্যাথরিনের প্রেমে পড়েছিলেন কিনা
জানা নাই, তবে এটা ঘটনা পরবর্তি কালেও
নিউটন যখনই লিংকনশায়ারে গিয়েছেন ক্যাথরিনের সাথে দেখা করেছেন।






No comments:
Post a Comment