আজ
থেকে প্রায়
সাড়ে চারশ’ বছর
আগে, ইতালীর
পিসা সহরে জন্ম
নিয়েছিলেন এক বিরাট মাপেরমানুষ, যিনি প্রকৃতি-গবেষণায় এক বিপ্লব এনেছিলেন তার বাণী ও
কর্ম দিয়ে। তিনি বলেছিলেন,
“পরিমাপ কর যা পরিমাপ করা যায়, যা পরিমাপ করা যায় না, তাকে পরিমাপযোগ্য কর।“
সেই মানুষটি হলেন - গ্যালিলিও গ্যালিলি, ইতিহাসে যিনি আধুনিক বিজ্ঞানের
জনক বলে পরিচিত। সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী গ্যালিলিও একজন আবিষ্কারক ও দক্ষ প্রযুক্তিবিদও ছিলেন, তার কৃতিত্ত্বে আছে, প্রথম গ্যাস থার্মোমিটার, সামরিক কম্পাস, প্রথম কম্পাউন্ড মাইক্রোস্কোপ এবং আরো অনেক কিছু। অনেক আবিষ্কারই তিনি করেছিলেন আর্থিক আয় বৃদ্ধির জন্য, তাঁর বিরাট পরিবারকে পালন করার জন্য।
১৫ জানুয়ারী ১৫৬৪ খ্রীষ্টাব্দে গ্যালিলিওর জন্ম ইতালীর পিসা সহরে। পিতা ভিনসেঞ্জো (Vincenzo) গ্যালিলি ছিলেন একজন সঙ্গীত গবেষক
এবং দক্ষ সঙ্গীতজ্ঞ। নানা রকম বাদ্যযন্ত্রে, বিশেষত লুট[1] যন্ত্রে ছিল তার বিশেষ পারদর্শিতা। ভিনসেঞ্জো ফ্লোরেন্সের[2]
রাজসভায় সঙ্গীতজ্ঞ
হিসাবে নিযুক্ত
ছিলেন। তিনি একজন সঙ্গীত গবেষকও ছিলেন, শব্দ নিয়ে
পরীক্ষানিরীক্ষা করতেন, সঙ্গীত শাস্ত্র নিয়ে “প্রাচীন ও আধুনিক সঙ্গীত নিয়ে সংলাপ (Dialogue on Ancient and Modern Music)” নামে একটি বইও লিখেছিলেন। মাতা
গুলিয়া আম্মানতি (Guilia Ammannati) ছিলেন এক বস্ত্র ব্যবসায়ীর কন্যা। ভিনসেঞ্জো ও গুলিয়ার
প্রথম সন্তান
গ্যালিলিও। গুলিয়া
আরও ছয়টি সন্তানের
জন্ম দেন, তিন সন্তান বাল্যকালেই
মারা যায়।
গ্যালিলিওর বাল্যকালেই তার পিতা
বুঝতে পারেন
গ্যালিলিও বিশেষ প্রতিভার
অধিকারী। সঙ্গীত,
সাহিত্য, চিত্রকলা
ও গণিতে
তার নৈপুন্যতা প্রকাশ
পায়। ভিনসেঞ্জো ছিলেন অভিজাত বংশীয়, কিন্তু আর্থিকভাবে দূর্বল। তার পূর্ববংশীয়দের চিকিৎসাবিদ হিসাবে সুনাম ছিল। তিনি আশা করলেন, গ্যালিলিও সুপ্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক হয়ে তার বংশের হারানো গরিমা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবেন। তিনি গ্যালিলিওর
শিক্ষার
দিকে
বিশেষ
নজর
দিলেন
এবং
ফ্লোরেন্স
থেকে
বিশ
মাইল
দূরে
ভালোমব্রোসা (Vallombrosa) গ্রামে এক সন্ন্যাসীদের আশ্রমে তাকে ভর্ত্তি করলেন।
মঠের
সন্ন্যাসীদের
কাছে,
গ্রীক,
ল্যাতিন,
তর্কবিদ্যা
প্রভৃতি বিষয়ে
শিক্ষা
নিতে
থাকলেন। শহর থেকে দূরে, নির্জন মঠের পরিবেশ গ্যালিলিওর খুবই ভালো লাগে এবং তিনি সন্ন্যাসী হবেন এই সিদ্ধান্ত নিলেন। ভিনসেঞ্জো অবশ্যই গ্যালিলিওর এই সিদ্ধান্তে খুশি হলেন না। মঠের সন্ন্যাসী হিসাবে গ্যালিলিও তার পরিবারকে বিশেষ (আর্থিক) সাহায্য করতে পারবেন না, অথচ, ভিনসেঞ্জো চাইতেন, গ্যালিলিও চিকিৎসক হয়ে, তার পরিবারকে সাহায্য করুক। পিতার ইচ্ছানুসারে গ্যালিলিওকে পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাশাস্ত্র শিক্ষার জন্য ভর্তি হলেন। শীঘ্রই তার শিক্ষকরা বুঝতে পারলেন গ্যালিলিও কোন এক
সাধারণ ছাত্র নন। অসামান্য প্রতিভার অধিকারী এবং যুক্তি-প্রমাণ ব্যতিরকে কোন মতবাদ মানতে চান না। কথিত আছে, পিসা শহরের এক গীর্জায় এক ঝুলন্ত বাতিদানকে দোল খেতে দেখে গ্যালিলিও দোলক যন্ত্রের সূত্র আবিষ্কার করেছিলেন। একটি দোলকের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে গিয়ে আবার ফিরে আসার সময়ের একটি নির্দিষ্ট মান আছে, যা দুই প্রান্তের দূরত্বের উপর নির্ভর করে না। এটি তার প্রথম আবিষ্কার। গল্পে আছে, গ্যালিলিওর কাছে সময় মাপার কোন যন্ত্র (ঘড়ি) ছিল না। তিনি নিজের নাড়ীর গতি থেকে সময় মেপেছিলেন। পরে, গ্যালিলিওর এই সূত্রটি ব্যবহার করে হল্যান্ডের ক্রিশ্চিয়ান হাইজেন দোলক ঘড়ি বানান।
পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে, গ্যালিলিও গণিতজ্ঞ অষ্টিলো রিচির সংস্পর্শে আসেন এবং গণিতে বিশেষ ভাবে আকৃষ্ট হন। তিনি গ্রীক দার্শনিক ইউক্লিড ও আর্কিমিদেসের গণিত সমন্ধীয় সমস্ত লেখা বিশেষ
ভাবে অধ্যয়ন করেন। ইতিমধ্যে, ভিনসেঞ্জোর
আর্থিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় গ্যালিলিও চিকিৎসাবিদ্যা অধ্যয়ন অসমাপ্ত রেখেই ফ্লোরেন্সে ফিরে যান এবং অর্থ উপার্জনের জন্য ছাত্রদের ব্যক্তিগতভাবে গণিতবিদ্যার শিক্ষা দেওয়া শুরু করেন। ব্যক্তিগত শিক্ষক হিসাবে তিনি যথেষ্ট সফল হন। টাসকানীর রাজপূত্র কসিমো মেডিকী (Cosimo Medici), যিনি পরে
টাসকানীর রাজা হয়েছিলেন, গ্যালিলিওর ছাত্র ছিলেন। পরবর্তী কালে গ্যালিলিওকে সরকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ করা হয়।
১৫৮৬ সালে, ২২ বছর বয়সে, গ্যালিলিও ছোট ও কম ওজনের বস্তুর ওজন পরিমাপের জন্য একটি যন্ত্র উদ্ভাবন করেন এবং যন্ত্রটির কৌশল একটি সংক্ষিপ্ত গ্রন্থে প্রকাশিত করেন। গ্রন্থটির নাম দেন, “ ছোট্ট তুলাদন্ড” বা "দ্য লিটল ব্যালেন্স"। এখন আমরা যেমন জানি, গ্যালিলিওর সময়েও আর্কিমিদিস ও
তার বাথটবের গল্প জানা ছিল। সংক্ষেপে গল্পটি এই;
সিরাকুজের রাজা দ্বিতীয় হিয়েরোর সন্দেহ হল যে তার স্বর্ণকার সোনা চুরি করে। তিনি একটি সোনার মুকুট বানিয়েছিলেন। আর্কিমিদিসকে বললেন, মুকুটটির ক্ষতি না
করে, পরীক্ষা করে বলতে, সেটিতে রুপা মেশান হয়েছে কি হয়নি। আর্কিমিডিস দিন-রাত সমস্যাটি নিয়ে চিন্তা করলেন কিন্তু কোন সমাধান খুঁজে পেলেন না, কি করে, মুকুটটি না
ভেঙ্গে, সেটিতে রুপা মেশান আছে কি
নেই বলা যায়। তারপর, একদিন তিনি সাধারন স্নানাগারে গিয়েছেন। কানায় কানায় জল
ভর্তি বাথটাবে নামার সময় কিছু জল
উপচে পড়ে যায় আর আর্কিমিডিস নিজেকে একটু হালকা বোধ করেন। এই ঘটনাটি তার জীবনে অনেকবারই ঘটেছিল, কিন্তু সেইদিন বিদ্যুতের ঝলকের মতো ঘটনাটি তাকে সমস্যাটির সমাধান করে দিল। তিনি লাফ দিয়ে বাথটাব থেকে নেমে এলেন এবং, উলঙ্গ অবস্থায় সিরাকুজের রাস্তায়, 'ইউরেকা, ইউরেকা' (আমি পেয়েছি, আমি পেয়েছি) বলে চিৎকার করতে করতে দৌড়তে লাগলেন। কি তিনি পেয়েছেন? তিনি একটি প্রাকৃতিক সূত্র বা নিয়ম সেই সাথে আবিষ্কার করেছেন এবং
সাথে সাথে তার সমস্যার সমাধানও খুজে পেয়েছেন। সূত্রটি বয়ায়েন্সি বা প্লবতা সূত্র নামে খ্যাত,
“তরল পদার্থে মগ্ন কোন বস্তু একটি ঊর্ধ্মূখী বল
অনুভব করে এবং সেই বলের পরিমাপ হল বস্তুটি যে পরিমাণ তরল অপসারণ করে, তার ওজনের সমপরিমান।“
আর্কিমিদিস সঠিকভাবে নির্ণয় করলেন যে, রুপা যেহেতু সোনার চাইতে হালকা, ওজন সমান রাখার জন্য রুপা মিশ্রিত মুকুটের আয়তন বিশুদ্ধ সোনার মুকুটের চাইতে বেশি হবে। আয়তন বেশি হওয়ার জন্য রুপা মিশ্রিত মুকুটটি তরল পদার্থও বেশি অপসারিত করবে। গল্পে আছে, আর্কিমিডিস রাজার মুকুটটি কত জল অপসারিত করে, এবং সম
ওজনের একটি স্বর্ণখন্ড কত জল
অপসারিত করে পরিমাপ করে বলেন মুকুটটিতে রুপা মেশান হয়েছে কিনা।
চিত্র ১।
গ্যালিলিও তুলাদন্ডের একটি রূপরেখা।
“ছোট্ট তুলাদন্ড” বা "দ্য লিটল ব্যালেন্স" গ্রন্থে গ্যালিলিও যুক্তি দিলেন, আর্কিমিডিস, যিনি লিভার যন্ত্র বিশেষজ্ঞ ছিলেন, যিনি বলতে সাহস করেছিলেন,
“আমাকে দাঁড়ানোর জন্য একটু শক্ত জায়গা দাও, আমি পৃথিবী সরিয়ে দেব।“
অবশ্যই এত স্থুল বা অমার্জিত পদ্ধতি ব্যবহার করেন নি, এই পদ্ধতিতে ভূল হবার সম্ভাবনা অনেক বেশি। আর্কিমিডিস অবশ্যই লিভার নীতির উপর ভিত্তি করে একটি তুলাদন্ড বানিয়েছিলেন। নিজের তুলাদন্ডটি, সেইরূপ একটি তুলাদন্ড বলে ব্যাখ্যা করলেন। গ্যালিলিওর পরিকল্পিত তুলাদন্ডের একটি রূপরেখা ছবিতে দেখান হয়েছে। তুলাদন্ডের একটি হাত ঘুর্ণি-পেঁচের সাহায্যে ছোট-বড় করা যায়। মনে করা যাক, চিত্রে যেমন দেখান হয়েছে, মুকুটটি M1 ওজন দ্বারা সুষম হয়। লিভার নীতি অনুযায়ী,
মুকুটের
ওজন ´ L2=M1
´ L1
জলে নিমজ্জিত অবস্থায় মুকুটের ওজন কম
হবে। ঘুর্ণি-পেঁচের সাহায্যে হাতটিকে ছোট করে, নূতন ওজন খুব সূক্ষ্ম ভাবেই মাপা যাবে।
গ্যালিলিওর এই
কুশলী নকশা পণ্ডিত সমাজে যথেষ্ট সমাদর পায় এবং ১৫৮৯ সালে তিনি পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত অধ্যপনার দায়িত্ব পান। পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনাকালে
গ্যালিলিও, পতনশীল বস্তুদের উপর তার
বিখ্যাত “পিসার টাওয়ার” পরীক্ষা করেন। সেই সময়কার ইউরোপ, গ্রীক দার্শনিক এরিষ্টটলের
মতবাদে বিশ্বাসী ছিল। বিজ্ঞানের প্রায় প্রতিটি বিষয়েই তার মতকে শেষ কথা বলে গণ্য
করা হতো। অনেক সময়ই তর্ক থেমে যেত, “মাষ্টার (এরিষ্টটল) বলেছেন” এই বাক্যে। এরিষ্টটল অবশ্যই মহান প্রতিভার অধিকারী ছিলেন।
তিনি পর্যবেক্ষন ও তার বিশ্লেষণ করেই তার তত্ত্ব বা মতবাদে গুলিতে এসেছিলেন।
কিন্তু তার পর্যবেক্ষনগুলো নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষা ছিল না, ফলে, অনেক সময়ই তার তত্ত্বগুলো
ভূল ছিল। যেমন এরিষ্টটলের বিশ্বাস ছিল,
মেয়েদের দাঁতের সংখ্যা ছেলেদের দাঁতের সংখ্যার চাইতে কম, যেটি অবশ্যই ভূল,
গড়পড়তায়, ছেলে ও মেয়ে উভয়েরই দাঁতের সংখ্যা সমান। এরিষ্টটল বস্তুর গতি নিয়ে অনেক
ভাবনা চিন্তা করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন যে, হালকা বস্তুর চাইতে ভারি বস্তু
তাড়াতাড়ি পড়ে। গ্যালিলিওর মনে হলো এটা ঠিক হতে পারে না। যদি, দুইটি সম ওজনের
পাথরকে একসাথে বেঁধে ফেলা হয় তা হলে কি সেটা দ্বিগুন জোরে পড়বে? কেন পড়বে? গ্যালিলিও
পরীক্ষা করে দেখতে চাইলেন এরিষ্টটলের মতবাদ সত্য কি না। পিসা সহরে একটি বিখ্যাত
মিনার আছে, যেটি পিসার হেলান টাওয়ার নামে বিখ্যাত। হেলান টাওয়ার কারন প্রায় ১৮৫
ফুট মিনারটি একদিকে একটু (প্রায় ৪ ডিগ্রী ) হেলে আছে। গ্যালিলিও মিনার থেকে একটি লোহার বল ও একটি
কাঠের বল ফেললেন, দুইটি বলই একই সময়ে নিচে পড়ল। গ্যালিলিও প্রমান করে দেখালেন, হালকা বস্তুর চাইতে ভারি বস্তু তাড়াতাড়ি পড়ে, এরিষ্টটলের
এই মতবাদ ভূল। চাক্ষুষ প্রমান দিয়ে এরিষ্টটলের বিরোধিতা, পন্ডিত সমাজে গ্যালিলিওকে
বিখ্যাত করল। ১৫৯২ তিনি পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের অধ্যাপক হিসাবে নিযুক্ত
হলেন। পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয় পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় অনেক বড় এবং অনেক
প্রসিদ্ধ ছিল। গ্যালিলিওর বেতনও যথেষ্ট
বৃদ্ধি পেল। পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার বার্ষিক বেতন ছিল ৬০ স্কুডি[3],
পাদুয়াতে তা বৃদ্ধি পেয়ে হল ১৮০ স্কুডি। পাদুয়াতে গ্যালিলিও জ্যামিতি, গতিবিদ্যা,
জ্যোর্তিবিদ্যা, সামরিক প্রযুক্তি, প্রভৃতি বিষয়ে শিক্ষা দিতেন এবং খুব শীঘ্রই
শিক্ষক হিসাবে সুনাম অর্জন করলেন। সামরিক প্রযুক্তিতে, একটি পাঠে তিনি শিক্ষা
দিতেন, কি করে একটি সহরকে দূর্ভেদ্য করা যায়, এবং অন্য একটি পাঠে, দূর্ভেদ্য সহরকে
কি করে দখল করা যায়। শিক্ষকতার সাথে সাথে গ্যালিলিও গতিবিদ্যার উপর গবেষণা করতে
লাগলেন। পতনশীল বস্তু সম্বন্ধে এরিষ্টটলের আরেকটি মত ছিল যে বস্তুটি একটি
নির্দিষ্ট গতিবেগে পড়ে। গ্যালিলিও এই মতটিও পরীক্ষা করে দেখতে চাইলেন এবং এক
সমস্যার মুখোমুখি হলেন। যেহেতু, পতনশীল বস্তুর গতির উপর তার কোন নিয়ন্ত্রন নাই,
সঠিক গতি নির্ণয়ের জন্য বস্তুটিকে যথেষ্ট
উঁচু থেকে ফেলা দরকার আর পাদুয়া সহরে যথেষ্ট উঁচু
মিনার বিশেষ নেই। অনেক
চিন্তা-ভাবনার পর, গ্যালিলিও আনত তল (inclined plane)ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেন।
আনত তলের কোন নিয়ন্ত্রত করে, গ্যালিলিও বস্তুর গতির উপর নিয়ন্ত্রন আনলেন। নিখুঁত
ভাবে সময় মাপার জন্য একটি জলঘড়িও তৈরী করলেন। আনততল ব্যবহারের গ্যালিলিওর এই
সিদ্ধান্ত একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। এই প্রথম প্রযুক্তি ব্যবহার করে, যা পরিমাপ
করা যায় না তা পরিমাপযোগ্য করা হল। গ্যালিলিও আনত তল ব্যবহার করে গতিবিদ্যার উপর
নানাবিধ পরীক্ষানিরীক্ষা করেন, এবং গতিবিদ্যা সংক্রান্ত কিছু নিয়ম বা সূত্র
আবিষ্কার করেন। বিদ্যালয়ের ছাত্রদের বহু পরিচিত একটি সূত্র,
S=1/2 a t2
এই সূত্রে, S= দূরত্ব, a = ত্বরণ, t= সময়। গ্যালিলিওর এই গাণিতিক সূত্র
আবিষ্কার একটি যুগান্তকারী ঘটনা। সেই সময় পণ্ডিত সমাজে গণিতজ্ঞের বিশেষ সমাদর ছিল
না। প্রকৃতি বিজ্ঞান, জ্যোর্তি বিজ্ঞান ইত্যাদির কদর অনেক বেশি ছিল। গণিতের
অধ্যাপকের বেতনও কম ছিল। পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে, গণিতের অধ্যাপক হিসাবে গ্যালিলিওর
বাৎসরিক বেতন ছিল ৬০ স্কুডি, কিন্তু, প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের অধ্যাপকের বেতন ছিল ২০০
স্কুডির ও বেশি। এর প্রধান কারন
ছিল, গণিত সম্বন্ধে তদানিন্তনকার ধ্যানধারণা। মনে করা হতো, গণিত বিমূর্ত জগত নিয়ে
আলোচনা করে, তার সাথে প্রাকৃতিক জগতের কোন সম্পর্ক নাই। যেমন, রেখা, বিন্দু
ইত্যাদির কল্পনা। রেখা, দৈর্ঘ্য আছে, কিন্তু প্রস্থ নাই, এটা কেবল কল্পনার জগতেই
হতে পারে। গণিতে, একটি গোলক, একটি সমতলকে একটি বিন্দুতে স্পর্শ করে, কিন্তু,
বাস্তবিকে, একটি জায়গা জুড়ে। গণিত যে কোন প্রাকৃতিক ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে পারে,
গণিতের সূত্র ব্যবহার করে কোন ঘটনার ফল জানা যেতে পারে, এমনটা ভাবা হতো না। গ্যালিলিওর গাণিতিক সূত্র ঠিক সেইটি করে দেখায়। গ্যালিলিও
তাই বলেছিলেন,
“একটি মহান গ্রন্থে প্রকৃতির সব নিয়মাবলী লেখা
আছে, সেই গ্রন্থটি হল আমাদের এই বিশ্ব। গ্রন্থটি সদানিয়ত আমাদের চোখের সামনে খোলাও
আছে। কিন্তু গ্রন্থটি পড়তে হলে আমাদের গ্রন্থটির ভাষা, তার অক্ষর, বর্ণমালা শিখতে
হবে। গ্রন্থটি লেখা আছে গণিতের ভাষায় ও তার অক্ষর হল ত্রিভূজ, বৃত্ত এবং অন্যান্য
জ্যামিতিক চিত্র।“
পিসা সহরে
ছাত্রাবস্থায় গ্যালিলিও আবিষ্কার করেছিলেন যে একটি দোলকের দোলনকাল দোলকের
প্রশস্ততা (amplitude) নিরপেক্ষ। কিন্তু, তার সন্দেহ হয়েছিল, দোলনকাল ও দোলকের
দৈর্ঘ্যর মধ্যে একটি সম্পর্ক আছে। পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন গ্যালিলিও নানা
দৈর্ঘ্যের দোলন বানিয়ে (সব চাইতে লম্বা দোলকের দৈর্ঘ্য ছিল ৯ মিটার), বিস্তর
পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরে সূত্রটি বার করতে সক্ষম হন। সূত্রটি আমাদের অনেকেরই জানা,
2/T=T/L
এই সূত্রটিতে, T=
দোলনের সময় কাল, একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত হয়ে ফিরে আসার সময় এবং L= দোলনের
দৈর্ঘ্য। গ্যালিলিও আবার প্রমাণ করলেন গাণিতিক সূত্র দিয়ে প্রাকৃতিক ঘটনার সঠিক
ব্যাক্ষা সম্ভব।
গ্যালিলিও
গতিবিদ্যার উপর বিস্তর গবেষণা করলেও গতিবিদ্যার উপর গবেষণার কারনে গ্যালিলিও
বিখ্যাত হন নি, তিনি বিখ্যাত হয়েছিলেন সম্পূর্ন অন্য কারনে। জ্যোর্তিবিজ্ঞানে সেই সময় দুইটি মতবাদ চালু
ছিল, এরিষ্টটল-টলেমীর মতবাদ ও কোপারনিকাসের মতবাদ (বিশদ জানতে হলে দেখুন, https://www.blogger.com/blogger.g?blogID=3448520313507920291#editor/target=post;postID=6344905572236332632;onPublishedMenu=allposts;onClosedMenu=allposts;postNum=1;src=postname )। সংক্ষেপে, এরিষ্টটল-টলেমীর
মতবাদে পৃথিবী স্থির ও তাকে কেন্দ্র করে, বিভিন্ন গোলকে সূর্য্য ও অন্যান্য গ্রহরা
বৃত্তাকারে ঘুরছে। কোপারনিকাসের মতবাদে, সূর্য্য স্থির এবং সূর্য্যকে কেন্দ্র করে
পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহরা ঘুরছে। জ্যোর্তিবিজ্ঞান গবেষণায় গ্যালিলিও বিশেষ উৎসাহী
ছিলেন না। জোহানেস কেপলারকে লেখা চিঠি থেকে জানা যায় গ্যালিলিও কোপারনিকাসের মতবাদে বিশ্বাসী, কিন্তু তিনি তা
প্রকাশ্যে আনেননি। পাদুয়া
বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্যালিলিও অন্যান্য অনেক বিষয়ের সাথে সাথে জ্যোর্তি বিজ্ঞানও
পড়াতেন। সেই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে, কোপারনিকাসের মতবাদ শিক্ষার উপর নিষেধ ছিল এবং
গ্যালিলিও ও চার্চের অনুশাসন মেনে ছাত্রদের কেবলমাত্র এরিষ্টটল-টলেমীর মতবাদই
শিক্ষা দিতেন।
চিত্র ২। গ্যালিলিওর
বানানো দূরবীনের একটি রূপরেখা।
১৬০৯ সালে
গ্যালিলিও জানতে পারেন, হলান্ডের এক ঘড়ি-প্রস্তুতকারক, হান্স লিপ্পারসে একটি
যন্ত্র আবিষ্কার করেছেন যা দিয়ে দূরের জিনিষ দেখা যায়, মনে হয় সেটা অনেক কাছে আছে।
বর্তমানে যন্ত্রটিকে আমরা দূরবীন বলে জানি, কিন্তু সেই সময় বলা হতো গুপ্তচরের
চশমা। কুশলী যন্ত্রবিদ গ্যালিলিও নিজের চেষ্টায় একটি দূরবীন বানান। গ্যালিলিওর বানান দূরবীনের একটি রূপরেখা চিত্র ২-তে দেখান হয়েছে।
গ্যালিলিও দূরবীনটি বানিয়েছিলেন আলোর প্রতিসরণ ধর্ম[4]
ব্যবহার করে। দূরবর্তী বস্তু থেকে আলো এসে পড়ে মুখ্য বা প্রধান লেন্সে এবং দ্বিতীয়
অপ্রধান লেন্স, যাকে বলা হয় আই-পীস দিয়ে চোখে পড়ে। যদি প্রধান
ও অপ্রধান লেন্সের ফোকাল লেন্থ (focal
length) বা ফোকাস দৈর্ঘ্য[5]
হয় যথক্রমে f0 এবং f1, তাহলে
দূরবীনটির বৃহত্তরীকরণ বা ম্যাগ্নিফিকেশন গণনা করা যায়,
M=f0/
f1
প্রথম দূরবীনটি গ্যালিলিও বানান বাজার
থেকে কেনা আতস কাচ দিয়ে, যার ম্যাগ্নিফিকেশন ছিল তিন, অর্থাৎ, দূরের বস্তুটিকে
তিনগুন বড় দেখা যাবে। পরে, গ্যালিলিও নিজে কাচ ঘষে লেন্স বানানোর কৌশল আয়ত্বে আনেন
এবং একটি নয় ম্যাগ্নিফিকেশনের দূরবীন বানান। পরে তিনি ৩০ ম্যাগ্নিফিকেশনের দূরবীনও
বানান। সেই সময় পাদুয়া ছিল ভেনিস প্রজাতন্ত্রের অঙ্গ। গ্যালিলিও তার বানানো
দূরবীনটি ভেনিসের গণ্যমান্য ব্যাক্তিদের দেখালেন এবং প্রচুর প্রশংসা পেলেন।
যুদ্ধের সময় দূরবীনের উপযোগিতা সকলেই উপলব্ধি করলেন, শত্রু জাহাজ অনেক দূর থেকেই
দেখা যাবে। গ্যালিলিও তার আবিষ্কার ভেনিস প্রজাতন্ত্রকে উপহার দিলেন। ভেনিস
প্রজাতন্ত্রও যোগ্য প্রতিদান দিল, গ্যালিলিওকে আজীবনকাল পাদুয়ার অধ্যাপক পদে নিয়োগ
করা হল, তার বেতনও বছরে ১০০০ স্কুডি, প্রায় দ্বিগুন, করা হল। দূরবীন আবিষ্কারের পর
গ্যালিলিওর খ্যাতি আকাশচুম্বী হল, ইতালি ও ইউরোপে তার নাম ছড়িয়ে পড়ল। তিনি রোম
সহরে আমন্ত্রিত হলেন এবং সেখানে তাকে অভূতপূর্ব অভ্যর্থনা করা হল।
মানবজাতির এটা সৌভাগ্য
যে গ্যালিলিও তাঁর টেলিস্কোপ দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়েছিলেন। প্রথমেই তিনি চাঁদের দিকে তাকালেন। চাঁদ
সবচাইতে কাছের এবং সহজতম বস্তু দেখার জন্য। তিনি যা দেখলেন তাতে অবাক হয়ে গেলেন, মসৃণ
গোলাকার চাঁদের পরিবর্তে দেখলেন, রুক্ষ, অমসৃণ, পাহাড় উপত্যকা, গর্ত ভরা চাঁদ। আরেকটু
উপরে তাকালেন আকাশগঙ্গার (Milky way Galaxy) দিকে। প্রশস্ত আকাশগঙ্গা অনেক-অনেক তারায় মিলিয়ে গেল। তারপর
তিনি তাকালেন বৃহষ্পতির দিকে। বৃহষ্পতির খুব কাছেই দেখলেন তিনটি আলোকবিন্দু, তিনটি
নতুন তারা। প্রথমে গ্যালিলিও বিশেষ অবাক হন নি, দূরবীনের সাহায্যে তিনি অনেক নতুন
তারাই দেখেছিলেন, যাদের খালি চোখে দেখতে পাওয়া যায় না। অবাক হলেন বেশ কিছুদিন পরে আবার বৃহষ্পতির দিকে
তাকিয়ে। যদিও বৃহষ্পতি
পূবদিকে অনেকটা সরে গেছে, কিন্তু তিনটি তারা বৃহষ্পতির সাথেই আছে। গ্রহরা আকাশে
ঘুরে বেড়ায়, কিন্তু তারারা নিজের জায়গায় স্থির থাকে। এরিষ্টটল-টলেমীর মডেল
অনুযায়ী, বৃহষ্পতি পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে। সেই অনুযায়ী, তিনটি তারাকে পিছনে ফেলে
বৃহষ্পতির এগিয়ে আসার কথা, কিন্তু তা হচ্ছে না। অনেক পর্যবেক্ষনের পরে গ্যালিলিও
বুঝতে পারলেন, যাদের তিনি তারা
মনে করেছিলেন, তারা তারা নয়, বৃহষ্পতির চাঁদ, এবং তাদের সংখ্যা
চার। পৃথিবীর যেমন একটি
চাঁদ, পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ
করছে, বৃহষ্পতির চারটি
চাঁদ বৃহষ্পতিকে প্রদক্ষিণ করছে। বৃহষ্পতির চাঁদ আবিষ্কার গ্যালিলিওকে কোপারনিকাসের মতবাদের সপক্ষে
সরব হলেন। কোপারনিকাসের মতবাদে, অন্য সব গ্রহরা
যদিও সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে, একমাত্র চাঁদই পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে পৃথিবীর সাথে সাথে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। বিরুদ্ধদের মতে
এটা অসঙ্গতিপূর্ন। বৃহষ্পতির চাঁদ আবিষ্কার প্রমাণ করে চাঁদের পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করা
কোন অনন্যসাধারন ঘটনা নয়। গ্যালিলিও দূরবীন দিয়ে তার পর্যবেক্ষনের ফল “তারাদের বার্তা” (“সাইডেরিয়াস নুনিসিয়াস" বা স্টারি মেসেঞ্জার) শিরোনামে একটি সংক্ষিপ্ত
নিবন্ধে প্রকাশ করেন। লিখলেন,
“এই সংক্ষিপ্ত
গ্রন্থে, প্রকৃতির সব ছাত্রদের পর্যবেক্ষণ এবং বিবেচনার জন্য, আমি যে বিষয়গুলির প্রস্তাব করব, সেগুলি বাস্তবিকই মহান।
মহান বলছি কারণ বিষয়গুলি সম্পূর্ন অপ্রত্যাশিত এবং অভিনব। যে যন্ত্রের দ্বারা
বিষয়গুলি আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হয়েছে সেটিও একটি অভিনব, মহান যন্ত্র। এই যন্ত্রের
মাধ্যমে চাঁদের দৃশ্য অপরূপ মনোহর। প্রায় ৬০ পৃথিবী-ব্যাসার্ধ দূরে যে চাঁদ, মনে
হয় সে যেন মাত্র ২ পৃথিবী-ব্যাসার্ধ দূরে। চাঁদের ব্যাস প্রায় তিরিশগুণ, পৃষ্ঠতল
নয়শতগুণ ও আয়তন সাতাশ হাজার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে মনে হয়। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নিশ্চিত
প্রমাণ পাওয়া যায় যে চাঁদের পৃষ্ঠতল সুন্দর, মসৃণ,মার্জিত নয়, বরং ওটা রুক্ষ,
অমার্জিত, আমাদের পৃথিবীর পৃষ্ঠতলের মতো, বিশাল পাহাড়, গভীর উপত্যকা ও ফাটলে
ভর্তি। “
(Here
we have a fine and elegant argument for quieting the doubts of those who, while
accepting with tranquil mind the revolutions of the planets about the sun in
the Copernican system, are mightily disturbed to have the moon alone revolve
about the earth and accompany it in an annual rotation about the sun. Some have
believed that this structure of the Universe should be rejected as impossible.
But now we have not just one planet rotating about another while both run
through a great orbit around the sun; our own eyes show us four stars which
wander around Jupiter as does the moon around the earth, while all together
trace out a grand revolution about the sun in the space of twelve years.)
বৃহষ্পতির
চারটি চাঁদ সম্বন্ধে লিখলেন,
“এইখানে আমরা
এক সুন্দর, মার্জিত যুক্তি পাই, যা তাদের উদ্বেল মনকে শান্ত করবে, যারা কোপারনিকাসের
গ্রহদের সূর্যকে প্রদক্ষিণ করার মতকে শান্ত মনে গ্রহণ করলেও, প্রচন্ড বিক্ষুব্ধ হন একমাত্র চন্দ্রের
পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করায়, এবং সূর্যকে পৃথিবীর বার্ষিক প্রদক্ষিণে
সঙ্গী হওয়ায়। কেহ বা মনে করেন, বিশ্বের এই গঠন অসম্ভব এবং পরিত্যাগযোগ্য। কিন্তু,
এখন কেবলমাত্র একটি গ্রহ আরেকটি গ্রহকে প্রদক্ষিণ করছে না, এবং দুইটি গ্রহ একসাথে এক
বিশাল কক্ষপথে সূর্যকে পরিক্রমা করছে না;
আমরা নিজের চোখে দেখতে পাচ্ছি, চাঁদ যেমন পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে, চারটি
তারা বৃহষ্পতিকে প্রদক্ষিণ করছে, এবং একই সাথে, সবাই মিলে বার বছরে একবার সূর্যকে আবর্তন
করছে। “
(Here
we have a fine and elegant argument for quieting the doubts of those who, while
accepting with tranquil mind the revolutions of the planets about the sun in
the Copernican system, are mightily disturbed to have the moon alone revolve
about the earth and accompany it in an annual rotation about the sun. Some have
believed that this structure of the Universe should be rejected as impossible.
But now we have not just one planet rotating about another while both run
through a great orbit around the sun; our own eyes show us four stars which
wander around Jupiter as does the moon around the earth, while all together
trace out a grand revolution about the sun in the space of twelve years.)
১৬১৩ সালে গ্যালিলিও
দূরবীনের সাহায্যে সৌরকলঙ্ক দেখেন। সূর্যপৃষ্ঠের কোন কোন স্থানের তাপমাত্রা পার্শবর্তী স্থান
অপেক্ষা কম। পৃথিবী থেকে সেই স্থানগুলিকে কালো দেখায় এবং তাদের সৌরকলঙ্ক বলা হয়। দূরবীনে সরাসরি সূর্যকে দেখা বিপজ্জনক। গ্যালিলিও এক বিশেষ পদ্ধতিতে
দূরবীনে সূর্যের প্রতিবিম্ব একটি কাগজের উপর ফেলতে সক্ষম হন এবং পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে
সৌরকলঙ্ক পর্যবেক্ষন করেন। তিনি লক্ষ্য করলেন সৌরকলংকগুলি চলমান, সময়ের সাথে স্থান
পরিবর্তন করে। তিনি নির্ণয় করলেন, সূর্য স্থির নয়, নিজের অক্ষে ঘুরপাক খাচ্ছে। গ্যালিলিও সৌরকলঙ্ক
নিয়ে তার পর্যবেক্ষন তিনটি চিঠিতে প্রকাশ করলেন, যা “সৌরকলঙ্ক নিয়ে চিঠি” পরিচিত।
বৃহষ্পতির চাঁদ,
সৌরকলঙ্ক, শুক্র গ্রহের কলা, ইত্যাদি আবিষ্কারের
পর গ্যালিলিও কোপারনিকাসের
মতবাদের সপক্ষে সরব হলেন। রোমান ক্যাথলিক চার্চের কর্তৃপক্ষ অবশ্যই গ্যালিলিওর এই সমর্থন
পছন্দ করলেন না। কোপারনিকাসের মতবাদ
গ্রহণ করার অর্থ এতদিনকার ধ্যান-ধ্যারনার বিসর্জন। পৃথিবীকে
বিশ্বের কেন্দ্র থেকে সরানোর অর্থ বাইবেলের শিক্ষাকে অস্বীকার করা। যদি, বাইবেলকে
অস্বীকার করা হয়, তাহলে, চার্চের কর্তৃত্বের কি হবে? জনগনের উপর চার্চের নিয়ন্ত্রণ
থাকবে কি করে? চার্চ কর্তৃপক্ষ ধর্মীয় বিচার সভাকে (Roman Inquisition) গ্যালিলিওর
লেখা বিচার করার ভার দিলেন। তারা মূলতঃ দুইটি বিষয় বিচার করেন,
১। সূর্য পৃথিবীর কেন্দ্রস্থল এবং স্থানীয়ভাবে তার কোন গতি নাই।
২। পৃথিবী মহাবিশ্বের পৃথিবীর কেন্দ্র নয়, এবং অচলও নয়। তার দৈনিক বা আহ্নিক (একদিন বা ২৪ ঘন্টায় নিজের অক্ষে একবার ঘুরপাক খাওয়া) ও
বার্ষিক গতি (এক বছরে বা ৩৬৫ দিনে সূর্যকে আবর্তন করা) আছে।
বিচার সভার সদস্যদের কেবলমাত্র আধ্যাত্বিক বিষয়ে জ্ঞান ছিল, জ্যোর্তিবিজ্ঞানের
কোন জ্ঞান ছিল না। তারা সমস্ত বিষয়টিকে ধার্মিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করলেন এবং
দুইটি বিষয় নিয়েই রায় দিলেন,
"নির্বোধ এবং অযৌতিক মতবাদ। কারণ,
পবিত্র বাইবেলের শিক্ষার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং আনুষ্ঠানিকভাবে বৈরিবাদী (foolish and absurd in philosophy,
and formally heretical, since it explicitly contradicts in many places the
sense of Holy Scripture)।“
১৬১৩ সালে, গ্যালিলিও
প্রথম কোপারনিকাসের মতবাদের সপক্ষে প্রকাশ্যে বক্তব্য রাখেন এবং ১৬১৬ সালে, পোপ পল (পঞ্চম)-এর নির্দেশ অনুযায়ী চার্চ কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে
গ্যালিলিওর লেখা নিষিদ্ধ করেন। তাকে সতর্ক করা হয় যে, তিনি যেন কোপারনিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক মডেলে বিশ্বাস না রাখেন এবং তার
প্রচার না করেন। নিষেধাজ্ঞা মেনে দীর্ঘ আট বছর গ্যালিলিও কোপারনিকাস মডেলের চর্চা
বন্ধ রাখেন। ১৬২৩ সালে, গ্যালিলিও ঘনিষ্ঠ
ও গুণগ্রাহী মাফিও বারবেরনি (Maffeo Barberini) আরবান (অষ্টম) নাম গ্রহণ করে পোপের
পদে আসীন হন। পোপ পদে আসীন হবার ছয় সপ্তাহ আগে মাফিও বারবেরনি
গ্যালিলিওকে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন,
“ক্রমাগত আপনার স্নেহ-ভালবাসা পেয়ে আমি ধন্য। আমারও ইচ্ছে আছে আপনার জন্য কিছু
করার। আপনাকে আশ্বাস দিচ্ছি যে সুযোগ পেলে আপনার সেবা করার জন্য আমি সবসময়ই
প্রস্তুত থাকবো।“
গ্যালিলিও পোপ আরবান (অষ্টম) –এর কাছে আবেদন
রাখেন কোপারনিকাসের মতবাদ নিয়ে লেখার উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবার জন্য। পোপ আরবান (অষ্টম)
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করলেন না কিন্তু
গ্যালিলিওকে অনুমতি দিলেন, কোন সিদ্ধান্তে উপনীত না হয়ে, এরিষ্টটল-টলেমীর মতবাদ ও
কোপারনিকাসের মতবাদ, উভয় মতবাদের উপর লেখবার জন্য। গ্যালিলিও সুযোগটি নিয়ে তার
বিখ্যাত বই, “ডায়ালগ কনসারনিং দি টু চীফ ওয়ার্ল্ড সিস্টেমস” লিখলেন। ১৬৩২ সালে বইটি প্রকাশিত হল। গ্যালিলিও
বইটি লিখলেন সংলাপ হিসাবে। সালভিটি,
কোপারনিকাস
মতবাদে বিশ্বাসী একজন দার্শনিক, সিম্পলিসিও,
এরিষ্টটল-টলেমী মতবাদে বিশ্বাসী এক দার্শনিক
এবং স্যাগ্রেডো, একজন সাধারণ বুদ্ধিমান লোক, এই তিনজনের
মধ্যে চারদিনের সংলাপ। সেই সময়ে
বিজ্ঞানীরা সাধারণত ল্যাটিন ভাষায় লিখতেন, কিন্তু গ্যালিলিও বইটি লিখলেন ইতালীয়
ভাষায়, সাধারণ ইতালীয় যাতে বইটি পড়তে পারেন, বুঝতে পারেন। জনসমাজে বইটি প্রশংসিত
হলেও চার্চের কর্তৃপক্ষ খুশি হলেন না। বিশেষত পোপ আরবান (অষ্টম) প্রচন্ড ক্ষুব্ধ
হলেন। পোপ আরও ক্ষুব্ধ হলেন কারন গ্যালিলিও
এরিষ্টটল-টলেমীর মতবাদের সপক্ষে পোপের যুক্তিগুলি সিম্পলিসিওর মুখে
দিয়েছিলেন। ইতালীয় ভাষায় সিম্পলিসিও অর্থে
মূর্খ বা বোকা বোঝায়। পোপ মনে করলেন, গ্যালিলিও প্রকারন্তরে তাকে বোকা বলছেন। গ্যালিলিও
বই প্রকাশের আগে চার্চের যথাযথ অনুমতি
নিয়েছিলেন, তবুও “ডায়ালগ কনসারনিং দি টু চীফ ওয়ার্ল্ড সিস্টেমস” বইটি নিষিদ্ধ করা হল। পোপ ধর্মীয় বিচার
সভাকে তদন্তের আদেশ দিলেন। জেরা করার জন্য গ্যালিলিওকে রোমে আসতে বলা হল। গ্যালিলিও
তখন ফ্লোরেন্সের দক্ষিনে, আর্কেত্রি (Arcetri) নামে এক ছোট
গ্রামে থাকতেন। সত্তর বছরের বৃদ্ধ গ্যালিলিও তখন প্রায় অন্ধ, বার্ধক্য জনিত নানাবিধ
রোগে আক্রান্ত। গ্যালিলিও ও তার প্রভাবশালী বন্ধুরা অনেক চেষ্টা করেও গ্যালিলিও রোমে
ধর্মীয় বিচার সভার সামনে হাজির হওয়া আটকাতে পারলেন না। গ্যালিলিওকে ভয় দেখান হল, নিজের
ইচ্ছেয় না এলে তাকে শেকল বেঁধে জোর করে
ধরে আনা হবে। পনেরদিনের যাত্রাপথ অতিক্রম করে গ্যালিলিও রোমে বিচার সভার জেরার
সামনে উপস্থিত হলেন। তদন্ত পরিষদের সদস্যরা সবাই গ্যালিলিওর উপর বিরুপ ছিলেন। তারা
গ্যালিলিওকে দোষী সাব্যাস্ত করলেন। তাকে প্রস্তাব দেওয়া হল প্রকাশ্যে কোপারনিকাসের
সূর্যকেন্দ্রিক মডেলের নিন্দা করতে, অথবা পাষন্ড (heretic ) বলে চিহ্নিত হতে। পাষন্ড বলে চিহ্নিত হলে তার শাস্তি হবে
বেদনাদায়ক মৃত্যু। বৃদ্ধ, প্রায় অন্ধ গ্যালিলিও
কোপারনিকাসের মতবাদকে নিন্দা করতে রাজি হলেন। প্রকাশ্য, হাটু গেড়ে তিনি
লিখিত বক্তব্য পড়লেন,
“ আমি
গ্যালিলিও গ্যালিলি, ভিনসেঞ্জো গ্যালিলির পুত্র, ফ্লোরেন্সবাসী, ৭০ বছর বয়সী, এই বিচারসভার
সামনে ব্যক্তিগত ইচ্ছায় হাজির হয়েছি। পবিত্র ও সম্মানিত
কার্ডিনালদের সামনে, বাইবেল হাতে হাঁটু গেঁড়ে শপথ গ্রহণ করে বলছি, যে পবিত্র ক্যাথলিক
এবং বাইবেলে বিশ্বাসী এপোস্টোলিক চার্চ যে বিশ্বাসে বিশ্বাসী, যে বিশ্বাস করে, যে বিশ্বাস শেখায়, আমি সবসময় সেই
বিশ্বাসে বিশ্বাস করেছি, বিশ্বাস করি, এবং ঈশ্বরের আনুকূল্যে ভবিষ্যতে ও বিশ্বাস করব।“
(I, Galileo, son of the late Vincenzio
Galilei, Florentine, aged seventy years, arraigned personally before this
tribunal and kneeling before you Most Eminent and Reverend Lord Cardinals,
having before my eyes and touching with my hands the Holy Gospels, swear that I have always
believed, do believe, and by God’s help will in
the future believe all that is held, preached and taught by the Holy Catholic
and Apostolic Church.)
তিনি আরও পড়লেন,
“ আমি বিশ্বাস
করতাম, এখনও করি, টলেমীর মতবাদে, যা একান্তই সত্য, অবিমিশ্র সত্য, অর্থাৎ, বিশ্বাস করি পৃথিবীর
স্থিতিশীলতায় ও সূর্যের গতিতে।“
("I held, as I still hold, as most true and
indisputable, the opinion of Ptolemy, that is to say, the stability of the
Earth and the motion of the Sun.")
অপ্রমাণিত গল্প আছে, প্রকাশ্যে কোপারনিকাসের
তত্ত্বের নিন্দা করার পর, গ্যালিলিও বিড়বিড় করে বলেছিলেন, “তবুও ওটা (পৃথিবী) ঘোরে
(Yet it moves) ।“
গ্যালিলিও তার অবশিষ্ট
জীবন গৃহবন্দী অবস্থায় কাটান। গৃহবন্দী
থাকাকালীন তিনি লেখেন, “দুইটি নতুন বিজ্ঞান (Two New Sciences)।“ তিনি নিজে মনে করতেন, এটি তার জীবনের
শ্রেষ্ঠ রচনা। গতিবিদ্যা নিয়ে তার সমস্ত জীবনের গবেষণা তিনি “দুইটি নতুন বিজ্ঞানে”
লিপিবদ্ধ করেছিলেন। দীর্ঘ অসুস্থতার পর ৮ জানুয়ারী, ১৬৪২ সালে, এই মহান বিজ্ঞানীর মৃত্যু
হয়।
[1] তারের এক প্রকার বাদ্যযন্ত্র।
[2] ফ্লোরেন্স ইতালীর টাসকান প্রদেশের রাজধানী। টাসকান প্রদেশের শাসনকর্তা ছিলেন মেডিকী পরিবার, শাসকের উপাধি ছিল গ্রান্ড ডিউক।
[3] ১৯ শতক পর্যন্ত ইতালীর বিভিন্ন প্রদেশে চালু মুদ্রা।
[4] আলো সরলরেখায়
চলে, কিন্তু এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে গেলে গতিপথ বদলে যায়। আলোর এই ধর্মকে
প্রতিসরণ (refraction) বলা হয়।
[5] প্রতিটি লেন্সের একটি নিজস্ব ফোকাল লেন্থ বা ফোকাস দৈর্ঘ্য
থাকে. সমান্তরাল আলোকরশ্মি লেন্সের উপর পড়লে, তা একটি নির্দ্দিষ্ট বিন্দুতে
অভিসারিত (converge) হয়, বা একটি নির্দ্দিষ্ট বিন্দু থেকে অপসারিত (diverge) হয়।
লেন্স থেকে সেই বিন্দুর দূরত্বকে ফোকাল লেন্থ বা ফোকাস দৈর্ঘ্য বলা হয়।



No comments:
Post a Comment