গত শতাব্দীর শেষের দিকে, টাইমস ম্যাগাজিন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কিছু ব্যক্তিকে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বকে বেছে নিতে বলেছিল। ম্যাগাজিনটি ১00 জন ব্যক্তির একটি তালিকা সংকলন করেছিল এবং সেই তালিকার শীর্ষে ছিলেন জার্মান বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন। শীর্ষ ব্যক্তিত্ব হিসাবে আইনস্টাইনকে পছন্দ কারুর মনেই ক্ষোভ বা বিরক্তি উদ্রেক করেনি। সাধারণভাবে সবাই একমত হয়েছিলেন যে বিংশ শতাব্দী বিজ্ঞানের যুগ এবং বিজ্ঞানে আইনস্টাইনের অবদান নিঃসন্দেহে অতুলনীয়। তার গবেষণা আধুনিক বিজ্ঞানকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিলেন। তার তত্ত্ব পরিবর্তন করেছিল স্থান-কাল, পদার্থ এবং শক্তির বিষয়ে আমাদের চিরন্তন মতামত। মহাকর্ষের তিনি নতুন (জ্যামিতিক) ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন ইত্যাদি। জীবদ্দশায় তো বটেই, মরণের পরেও তিনি যে জনপ্রিয়তা উপভোগ করেন তা যে কোনও ব্যক্তির পক্ষে বিরল। ইতিহাসে কোন ধর্মীয় নেতা, রাজনীতিবিদ বা চলচ্চিত্র তারকা অনুরূপ জনপ্রিয়তা উপভোগ করেন নি।
১৮৭৯ সালের ১৪-ই মার্চ জার্মানির একটি ছোট্ট শহর
উলমের একটি ইহুদি পরিবারে অ্যালবার্ট আইনস্টাইন জন্মগ্রহণ করেছিলেন। পিতা হারম্যান
আইনস্টাইন ছিলেন একটি ছোট প্রস্তুতকারী সংস্থার মালিক। মাতা পাউলিন ছিলেন একজন
শান্ত বুদ্ধিমান মহিলা। জন্মের সময় আইনস্টাইনের মাথা অস্বাভাবিক
রকমের বড় ছিল এবং তা নিয়ে পাউলিনের বেশ দুশ্চিন্তা ছিল। সেই দুশ্চিন্তা আরও বেড়ে
যায় যখন আইনস্টাইন কথা বলতে অনেক বেশি
বছর সময় নেন। অবশ্য সমস্ত দুশ্চিন্তার অবসান ঘটিয়ে আইনস্টাইন যথাযথ বড় হয়ে একজন সুপুরুষ
ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন। পাউলিনের চারুকলার প্রতি আকর্ষন ছিল এবং ভালো পিয়ানো বাজাতেন। মায়ের সংগীতের প্রতি ভালবাসা আইনস্টাইনও পেয়েছিলেন এবং মায়ের অনুপ্রেরণায় খুব
অল্প বয়সেই বেহালা বাজানো শিক্ষা শুরু করেছিলেন এবং পরিণত বয়সে একজন দক্ষ বেহালাবাদক
হিসাবে পরিচিত ছিলেন।
আইনস্টাইনের জন্মের অল্প সময় পরে, আইনস্টাইনের পিতা হারমান
মিউনিখে স্থানান্তরিত হন। মিউনিখেই ১৮৮১ সালের ১৮-ই নভেম্বর আইনস্টাইনের একমাত্র বোন
মাজা জন্মগ্রহণ করেন। সারা জীবন আইনস্টাইন তার বোনের খুব ঘনিষ্ট ছিলেন। মিউনিখে হারমান তার ভাই জ্যাকবের সাথে একটি ছোট গ্যাস এবং জল সরবরাহের ব্যবসা
শুরু করেন। এই ব্যাবসায় তারা বেশ সাফল্যও অর্জন করেছিলেন। আইনস্টাইনের কাকা জ্যাকব উচ্চাকাঙ্ক্ষী
ছিলেন এবং কিছুদিন পরে মূলত তার প্রচেষ্টায় দুই ভাই ডায়নামো প্রভৃতি বৈদ্যুতিন সরঞ্জাম
প্রস্তুত করার একটি কারখানা স্থাপন করেন। প্রাথমিকভাবে, কারখানাটি সাফল্য পেয়েছিল। বীয়ার উৎসব
মিউনিখের একটি বিখ্যাত উৎসব। সারা পৃথিবী থেকে প্রায় ৫০-৬০ লক্ষ
লোক উৎসবে অংশ গ্রহন করেন । ১৬ থেকে ১৮ দিন চলা এই উৎসবটি শুরু হয় অক্টোবর মাসে
তাই এটা অক্টোবরফেস্ট নামেই বিশেষ পরিচিত। অক্টোবরফেস্টের সময় মিউনিখ শহর আলোকিত
করার জন্য বিশেষ ব্যাবস্থা করা হয়। আইনস্টাইনদের সংস্থাটি ১৮৮৫ সালে মিউনিখ শহর আলোকিত করার জন্য একটি চুক্তি জিতেছিল। কিন্তু
এই সাফল্য ছিল ক্ষণস্থায়ী। আইনস্টাইনদের সংস্থাটি ডিসি বা ডাইরেক্ট কারেন্টের জন্য
যন্ত্রপাতি তৈরি করত। সেই সময় জার্মানি তার বিদ্যুৎ উৎপাদন সংস্থাগুলিকে ডিসি থেকে
এসি বা অল্টারনেটিং কারেন্টে পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত নেয়। অল্টারনেটিং কারেন্টের জন্য যন্ত্রাংশ বানানোর জন্য তাদের সংস্থাটিতে যে
পরিবর্তন করা দরকার ছিল, পুঁজির অভাবে হারমান ও জ্যাকব তা করতে পারলেন না। ক্রমশ
আইনস্টাইনদের সংস্থায় উৎপাদিত যন্ত্রপাতি ক্রেতার অভাব শুরু হয়। বাধ্য হয়ে ১৮৯৪
সালে কারখানাটি তারা ইতালির পাভিয়ায শহরে স্থানান্তরিত করেন। আইনস্টাইনদের
পরিবারও ইতালীতে স্থানান্তরিত হয়। ইতালির কারখানাটিও সাফল্য অর্জন করতে ব্যর্থ হয়।
জ্যাকব একটি বড় সংস্থায় চাকুরী নেন। হারম্যান আইনস্টাইন আরেকটি সংস্থা শুরু করেন,
সংস্থাটি মাঝারি সাফল্যও পায় যদিও তিনি আগের ব্যর্থতার বেদনা ভূলতে পারেন না। ১৯০২ সালে তিনি 55 বছর বয়সে মারা যান।
ছেলেবেলায় আইনস্টাইন লাজুক
প্রকৃতির ছিলেন, একাকী থাকতে পছন্দ করতেন। অন্যান্য ছেলেরা যখন দল বেঁধে নানা
ধরনের খেলা খেলত, বাচ্চা আলবার্ট শান্তভাবে নিজেকে নিয়েই থাকতেন। তার এক গৃহ
শিক্ষয়ত্রী তাকে ফাদার বোর (বিরক্ত বাবা) বলে সম্বোধন করতেন। তিনি ভালবাসতেন
বিভিন্ন ধরনের ধাঁধার সমাধান করতে, খেলনা বিল্ডিং সেট দিয়ে জটিল কাঠামো বানাতে,
তাস দিয়ে বাড়ি বানাতে ইত্যাদি। তার বোন মাজার কথা অনুযায়ী আইনস্টাইন একবার তাস
দিয়ে একটি ১৪ তলা বাড়ি বানিয়েছিলেন। বোঝা যায় অধ্যবসায় ও জিদ ছোটবেলা থকেই তার
চরিত্রের অংশ।
তার ৪-৫ বছর বয়সের একটি ঘটনা তার
জীবনে বিশেষ দাগ কেটেছিল। একবার কোন এক অসুস্থতার সময় তার বাবা তাকে একটি কম্পাস
উপহার দেন। কম্পাসটি যেদিকেই ঘোরানো যাক না, তার কাঁটাটি সবসময় একই দিকে নির্দেশ
করে, এই ঘটনায় তিনি অবাক হয়ে যান। তিনি বলেছিলেন, কোন রহস্যময় শক্তি এই ঘটনাটি
ঘটাচ্ছে সেই ভাবনায় তিনি উত্তেজিত হয়ে কাঁপতে থাকেন। আরেকটি ঘটনা তাকে বিশেষ
অভিভূত করেছিল; তার ১২ বছর বয়সে তার হাতে একটি জ্যামিতির বই আসে। চিন্তার স্বচ্ছতা, যুক্তি, প্রতিটি বিবৃতির প্রমান, তাকে বিস্মিত
করে তুলে। তার মনে হল এই অপরিচ্ছন্দ, অনিয়মিত বিশ্বের মধ্য থেকে একটি পরিচ্ছন্দ, নিয়মিত বিশ্ব তাঁর সামনে হঠাৎ আবির্ভূত হয়েছে। তার মনে সেই
সুন্দর, সুশৃঙ্খলিত বিশ্বকে খুজে বার করার
ইচ্ছে হল।
ইহুদী হলেও আইনস্টাইনের পিতা ও
মাতা ছিলেন উদারমনা, তৎকালীন ইহুদীদের নানাবিধ কুসংস্কার থেকে মুক্ত মনের মানুষ।
বাড়ির কাছকাছি কোন ইহুদি স্কুল না থাকায় একটি
ক্যাথলিক স্কুলেই ছয় বৎসর বয়সে আইনস্টাইনের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় । স্কুলে তিনিই ছিলেন একমাত্র ইহুদি
ছাত্র এবং স্বাভাবিক ভাবেই তিনি কিছু বিদ্রুপ, লাঞ্ছনা এমনকি শারীরিক আক্রমনেরও
শিকার তাকে হতে হয়েছিল কিন্তু পরে তিনি বলেছিলেন যে সেই লাঞ্ছনা বিশেষ বিদ্বেষপূর্ণ
ছিল না। শিক্ষকদেরও তিনি প্রশংসা করেছিলেন, বলেছিলেন তারা ছিলেন উদার এবং ধর্মীয় পার্থক্য করতেন না। নয়
বছর বয়সে আইনস্টাইন মিউনিখের লুইটপোল্ড-জিমনেসিয়ামে ভর্তি হলেন। লুইটপোল্ড জিমনেসিয়াম খুব নিয়ম মাফিক চলত, এবং আশা করা হত যে ছাত্ররা সেই
নিয়ম মেনে চলবে। জিমনেসিয়ামের অনমনীয় পরিবেশ আইনস্টাইনের পছন্দ হয়নি। লুইটপোল্ড
জিমনেসিয়ামে গণিত ও বিজ্ঞানে বিশেষ ভাবে জোর দেওয়া হত। আইনস্টাইন গণিত ও বিজ্ঞানে
অন্যান্য ছাত্রদের চাইতে অনেক বেশি পারদর্শি হলেও ভাষা-সাহিত্য ইত্যাদি বিষয়ে দূর্বল ছিলেন। কিন্তু জিমনেসিয়ামের
নিয়ম অনুযায়ী তাকে অপচ্ছন্দের বিষয়গুলি পড়তে বাধ্য করা হত। শুধুমাত্র পরীক্ষায় পাশ
করার জন্য তার অপছন্দের বিষয় গুলি পড়তে তার আপত্তি ছিল। তদূপরি জিমনেসিয়ামের নিয়ম
অনুযায়ী তাকে খেলাধূলা প্রভৃতিতেও অংশ গ্রহণ করতে হত। আইনস্টাইনের পরিবার জার্মানি
ছেড়ে ইতালি চলে গেলেও পড়ার জন্য আইনস্টাইন জার্মানিতেই থেকে গিয়েছিলেন। জিমনেসিয়ামের
অনমনীয় পরিবেশ কোনদিনই আইনস্টাইনের পছন্দ ছিল না, পরিবার থেকে দূরে থাকা নিঃসঙ্গ আইনস্টাইনের পক্ষে সেই পরিবেশে পড়া চালিয়ে
যাওয়া সম্ভব হল না। ১৮৯৪ সালে, বাবার সাথে পরামর্শ না করেই তিনি কোন ডিগ্রি ছাড়াই
তিনি স্কুল ত্যাগ করে ইটালী চলে আসেন। জার্মানি ত্যাগের পিছনে নিঃসঙ্গতা ছাড়াও
সম্ভবত আরো একটি গূঢ় কারন ছিল। জার্মানির আইন অনু্যায়ী সমস্ত জার্মানবাসীর
জন্য ১৭ বছর বয়সে সৈন্যবাহিনীতে যোগদান বাধ্যতামূলক ছিল। বছরখানেক পরেই আইনস্টাইনের
সতের বছর পূর্ণ হত এবং তাকে সৈন্যদলে
যোগ দিতে হত। খুব ছোটবেলা থেকেই আইনস্টাইনের সৈন্যদলের
প্রতি চরম অনীহা ছিল। পরে তার বোন মাজা বলেছিলেন সতের বছর পূর্ণ হলে তাকে সৈন্যদলে যোগ দিতে হবে এই
ভয়ে আইনস্টাইন চিন্তিত ছিলেন। ইতালীতে গিয়ে আইনস্টাইন পিতাকে দিয়ে তাকে জার্মান
নাগরিকত্ব থেকে মুক্তি দেবার জন্য আবেদন পত্রও পাঠালেন। সেই আবেদনের ভিত্তিতে ১৮৯৬
সালের জানুয়ারীতে তাকে জার্মান নাগরিকত্ব
থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। ১৮৯৬ থেকে ১৯০১ সাল পর্যন্ত আইনস্টাইন কোন দেশেরই নাগরিক
ছিলেন না। ১৯০১ সালে তিনি সুইজারল্যান্ডের নাগরিকত্ব গ্রহন করেন।পরবর্তী জীবনে তিনি
আমেরিকা, অস্ট্রিয়া এবং পুনরায় জার্মানির নাগরিকত্ব গ্রহন করেছিলেন, কিন্তু সুইস নাগরিকত্ব কখনই পরিত্যাগ
করেন নি।
ইতালীতে থাকাকালীন, ষোল বছর বয়সে
আইনস্টাইন তার প্রথম বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্রটি লিখেছিলেন, শিরোনাম ছিল, “ইথারের উপর চৌম্বকশক্তির প্রভাব সম্পর্কিত
গবেষণা (On the investigation of the state of the Ether in a Magnetic field.)” ইথার সেই সময় খুবই গুরুত্ত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। তখন বিজ্ঞানীরা
মনে করতেন আলো একরকম তরঙ্গ। তরঙ্গ কোন একটি মাধ্যমের স্পন্দন। ১৮৬৪ সালে স্কটিশ
বিজ্ঞানী জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল তাত্ত্বিক গবেষণায় জেনেছিলেন যে আলো এক প্রকার
তড়িত-চৌম্বকীয় শক্তি এবং ১৮৮৭ সালে
জার্মান বিজ্ঞানী হেনরিক হার্জ সেই
তত্ত্বকে পরীক্ষাগারে প্রমাণও করেছিলেন। বিজ্ঞানীরা আরো জানতেন যে আলো শূন্যের
মধ্য দিয়েও চলতে পারে। প্রশ্ন ছিল আলো বা তড়িত-চৌম্বকীয় শক্তি তরঙ্গের মাধ্যমটি কি? বিজ্ঞানীরা তত্ত্ব
দিয়েছিলেন যে বিশ্বজুড়ে একটি অদৃশ্য মাধ্যম
আছে এবং আলো সেই অদৃশ্য মাধ্যমটির স্পন্দন। বিজ্ঞানীরা সেই অদৃশ্য মাধ্যমটির নাম দিয়েছিলেন
‘ইথার।‘ আইনস্টাইনের গবেষণার বিষয় ছিল
ইথার মাধ্যমটির স্থিতিস্থাপকতার উপর চৌম্বকীয় শক্তিত প্রভাব। তিনি একটি
পরীক্ষা করার পরামর্শও দিয়েছিলেন। আইনস্টাইন মনে করেছিলেন এই গবেষণা তড়িৎ প্রবাহ
সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান বৃদ্ধি করবে। গবেষণাপত্রটিতে যদিও বিশেষ উল্লেখযোগ্য গবেষণা
ছিল না, কিন্তু পরবর্তি জীবনে আইনস্টাইনের গবেষণার কিছু ধারা আমরা দেখতে পাই।
১। সমকালীন সবচাইতে গুরুত্ত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে
আইনস্টাইন গবেষণা করতেন।
২। তার তাত্ত্বিক গবেষণার সিদ্ধান্ত
প্রমাণ করে দেখানোর বিষয়ে পরামর্শ দিতেন।
কিছুদিন মিলানে থাকার পর আইনস্টাইনকে
তার ভবিষ্যতের কথা ভাবতে হল। কোন ডিগ্রী
ছাড়াই জার্মানী ছেড়ে এসেছিলেন তাই ইতালীর কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার সুযোগ ছিল
না। যেহেতু তার গণিতের জ্ঞান অন্যান্যদের
চাইতে বেশি, প্রযুক্তিগত প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া সহজ হবে মনে করলেন। বাবা হারমেনেরও ইচ্ছে ছিল আইনস্টাইন কারিগরি
বিদ্যায় উচ্চশিক্ষা নিন এবং পারিবারিক ব্যাবসা পরিচালনায় সাহায্য করেন। ১৮৯৫ সালের অক্টোবর মাসে আইনস্টাইন
জুরিখ পলিতেকনিকের প্রবেশিকা পরীক্ষায় বসেন। বিজ্ঞান ও গণিতে খুব ভালো করলেও
সাহিত্য, জীবনবিদ্যা, রাজনীতি ইত্যাদি বিষয়ে খারাপ করায় তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায়
উত্তীর্ন হলেন না। পলিতেকনিকের অধিকর্তার পরামর্শ মতো তিনি জুরিখ থেকে পচিশ মাইল
দূরত্বে আরাউর ক্যানটনাল স্কুলে ভর্তি হন। আরাউর ক্যানটনাল স্কুল মাচুরা পরীক্ষার
জন্য ছাত্রদের প্রস্তুত করত। আরাউর স্কুলের পরিবেশ আইনস্টাইনের ভাল লেগেছিল।
জার্মানির জিমনিসায়ামে ছাত্রদের মূলত পাঠ্যপুস্তক মুখস্থ করতে জোর দেওয়া হত,
সেখানে চিন্তা-ভাবনা করার বিশেষ অবকাশ ছিল না।
আরাউর স্কুলে ছাত্রদের পাঠ্যপুস্তক মুখস্থ করার চাইতে চিন্তা-ভাবনা করতেই
বেশি উৎসাহ দেওয়া হত। আরাউতে আইনস্টাইন তার স্কুলের শিক্ষক যশ উইনটেলারের বাড়িতে পেয়িং
গেস্ট হিসাবে থাকতেন। সেই সময় এটা খুব অস্বাভাবিক ব্যাবস্থা ছিল না। কিছু অধিক
উপার্জনের জন্য স্কুল ও কলেজের শিক্ষকরা কিছু ছাত্রকে পেয়িং গেস্ট হিসাবে রাখতেন।
সেই বছরই আইনস্টাইনের খুড়তুত ভাই রবার্ট কচ আরাউর স্কুলে ভর্তি হন। তিনিও যশ
উইনটেলারের বাড়িতে পেয়িং গেস্ট হিসাবে থাকতেন। যশ উইনটেলার ভাষাতত্ত্ব ও ইতিহাসের
শিক্ষক ছিলেন। বন্ধুত্বপূর্ণ স্বভাবের উইনটেলারের
পরিবার আইনস্টাইনকে মুগ্ধ করে এবং তাদের সাথে তার বিশেষ সখ্যতা হয়। যশ উইনটেলারকে তিনি ‘পিতা’ ও তার
স্ত্রীকে মাতা বলে সম্বোধিত করতেন। তাদের কন্যা মেরি উইনটেলারের সাথে তার প্রণয়
হয়, যদি ও সেই প্রণয় স্থায়িত্ব ছিল বছর খানেক মাত্র। পরে তাদের পুত্র পল উইনটেলারের
সাথে আইনস্টাইনের বোন মাজা এবং আইনস্টাইনের বিশেষ ঘনিষ্ঠ বন্ধু মিশেল অ্যাঞ্জেলো
বেসোর তাদের কন্যা আনার বিবাহ হয়েছিল।
ছাত্র হিসাবে আইনস্টাইন বিশেষ কৃতী
ছিলেন না বলে একটি ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত আছে। এটা অবশ্যই ভুল ধারণা। আইনস্টাইন বিশেষ
কৃতী ছাত্রই ছিলেন, বিশেষ করে গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়ে। মাচুরা
পরীক্ষায় বিভিন্ন বিষয়ে সর্বোচ্চ ৬-র
মধ্যে তার গ্রেডিং ছিল; জার্মান ভাষা – ৫.৫,
ভূগোল - ৪,
বীজগণিত - ৬, জ্যামিতি - ৬, বর্ণনামূলক জ্যামিতি - ৬, পদার্থবিজ্ঞান - ৬,
রসায়ন - ৬, প্রাকৃতিক ইতিহাস - ৫, অঙ্কন (শিল্প ) - ৪,
অঙ্কন (প্রযুক্তিগত) – ৪। আরাউ থাকাকালীন আইনস্টাইন উপলব্ধি করেন পদার্থবিদ্যাতেই তার সবচাইতে বেশি আগ্রহ। মাচুরা পাস করার পর,
তার পিতার অনিচ্ছাসত্ত্বেও তিনি ই টি এইচ-জুরিখ পলিতেকনিকের গণিত ও
পদার্থবিজ্ঞানের ৪ বছরের ডিপ্লোমা প্রোগ্রামে ভর্তি হন। সেই সময় ই টি এইচ জুরিখ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যায় শিক্ষাদানের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। জুরিখে আইনস্টাইনের সহপাঠী ছিলেন মার্সেল
গ্রসম্যান, লুই কলোরস, জ্যাকব এহরাত এবং কলেজের একমাত্র বিজ্ঞান ছাত্রী মিলেভা
মারিক। আইনস্টাইন তাঁর জুরিখের দিনগুলি উপভোগ করেছিলেন। মার্সেল গ্রসম্যান এবং তাঁর
পরিবারের সাথে তার বিশেষ বন্ধুতা হয় এবং সেই বন্ধুতা আজীবন বজায় থাকে। জুরিখে থাকাকালীন তাঁর সাথে মিশেল
অ্যাঞ্জেলো বেসোর বন্ধুত্ব হয় এবং সেই বন্ধুত্ব সারাজীবন বজায় থাকে। তিনি সহপাঠী
মিলেভা মারিকের প্রেমেও পড়েন এবং পরে তাকে বিয়ে করেন।
চার বছরের ই টি এইচ প্রোগ্রামটি ১৯০০ সালের আগস্টে শেষ
হয়েছিল। আইনস্টাইন এবং তার সহপাঠীরা (মিলেভা মারিক ব্যতীত) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ
হয়েছিলেন। মিলেভা পরের বছরও পরীক্ষা দিয়েছিলেন কিন্তু পাশ করতে ব্যার্থ হয়েছিলেন। সেই সময় ই টি এইচ ডিপ্লোমাধারীরা সাধারনত
কোন শিক্ষকের কাছে সহকারী হিসাবে কাজ করার সুযোগ পেতেন। আইনস্টাইনের সহপাঠীরা,
গ্রসমান, এহরাত ও কলোরস তিনজনেই ই টি এইচ-এর
তিন শিক্ষকের সহকারী হিসাবে নিযুক্ত হলেন, কিন্তু আনস্টাইন কোন শিক্ষকের সহকারী
হিসাবে নিযুক্ত হতে ব্যার্থ হলেন। এই ব্যার্থতার জন্য আইনস্টাইন তার ই টি এইচ
শিক্ষক হেনরিখ ওয়েবারকে দায়ী করতেন। ওয়েবার ই টি এইচ-এ পদার্থবিদ্যার প্রফেসর
ছিলেন। শুরুতে পদার্থবিদ্যা ও গণিতে আইনস্টাইনের দক্ষতার জন্য তিনি আইনস্টাইনকে খুব
পছন্দ করতেন। আইনস্টাইনও ওয়েবারের ক্লাস করে মুগ্ধ
ছিলেন। এমনকি তার প্রেমিকা মিলেভাকে লিখেছিলেন, "একের পর এক তার বক্তৃতাতে আমি মুগ্ধ।“ পরে অবশ্য তিনি হতাশ হন। তাঁর মনে হয়েছিল ওয়েবার সমসাময়িক পদার্থবিজ্ঞানের কথা বিশেষ না বলে তার ঐতিহাসিক ভিত্তিতে বেশি
জোর দিচ্ছেন। তার এই অনুভূতিটি তিনি আড়াল করার চেষ্টাও
করেন নি। তিনি ওয়েবারকে প্রচলিত ‘হার প্রফেসর’ না বলে ‘হার ওয়েবার” বলে সম্বোধিত করা শুরু করেন। তিনি ওয়েবারের ক্লাস এড়িয়ে যেতে শুরু করেছিলেন। আইনস্টাইনের এই অবজ্ঞা ওয়েবারের নজর এড়ায় নি এবং তিনিও আইনস্টাইনের উপর তিক্ত
ও অসন্তুষ্ট হয়ে উঠছিলেন। এর ফল হয়েছিল ওয়েবারের নির্দেশনায়
ডিপ্লোমা থিসিসে আইনস্টাইন ক্লাসের দ্বিতীয়-সর্বনিম্ন নম্বর পাওয়া। ওয়েবার আইনস্টাইনের ওপর এতটাই বিরক্ত
ছিলেন যে তিনি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দুটি ছাত্রকে তার সহকারী হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন কিন্তু
পদার্থবিজ্ঞানের স্নাতক আইনস্টাইনকে বিবেচনা করেননি। ইনস্টিটিউটের অপর অধ্যাপক জাঁ পার্নেট পরীক্ষামূলক অনুশীলনের দায়িত্বে ছিলেন। তার কার্যপদ্ধতিও আইনস্টাইনের পছন্দ ছিল না।পার্নেট অনুশীলনমুলুক পরীক্ষাগুলির জন্য বিশদ নির্দেশিকা দিতেন এবং আশা করতেন ছাত্ররা সেই
নির্দেশনা মেনে পরীক্ষাগুলি করবে। আইনস্টাইন খুব কমই পার্নেটের ক্লাসে
যোগ দিতেন এবং যখনই তিনি যোগ দিতেন, প্রথমেই তিনি পার্নেটের নির্দেশিকাটি ছুঁড়ে ফেলে দিতেন এবং
সম্পূর্ন নিজের মত করে পরীক্ষাটি করতেন। তার এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণে পার্নেট
রেগে গিয়েছিলেন। এমনকি তিনি ইনস্টিটিউট ডিরেক্টরের কাছে অভিযোগও করেছিলেন। ফলে পদার্থবিজ্ঞানের
ব্যবহারিক কোর্সে অধ্যবসায়ের অভাবের জন্য আইনস্টাইনকে আনুষ্ঠানিকভাবে তিরস্কার করা হয়েছিল। একবার পার্নেট রেগে তিনি আইনস্টাইনকে জিজ্ঞাসা করলেন কেন সে চিকিৎসাবিজ্ঞান বা আইন না পড়ে পদার্থবিজ্ঞান পড়ছে। আইনস্টাইন জবাবে বলেছিলেন যে ঔ বিষয়গুলিতে আমার প্রতিভা আরও কম। পার্নেটের সাথে তার দ্বন্দ্বের পরিণতিতে ব্যবহারিক কোর্সে পার্নেট আইনস্টাইনকেসর্বনিম্নতম
গ্রেড ১ দিয়েছিলেন, আর এই একটিমাত্র পদার্থবিজ্ঞানের বিষয়ে
আইনস্টাইন ফেল করেছিলেন।
আইনস্টাইন বুঝতে পেরেছিলেন ওয়েবার
বা পার্নেটের কাছে তিনি সহকারীর কাজ পাবেন না। ইনস্টিটিউটের আরেক অধ্যাপক ছিলেন গ্ণিতের অধ্যাপক অ্যাডল্ফ হারউইজ। দুর্ভাগ্যক্রমে, আইনস্টাইন হারউইজের বেশিরভাগ ক্লাসই
বাদ দিয়েছিলেন। যখন আইনস্টাইনের বন্ধু এহরাত জানায় যে হারউইজের বর্তমান
সহকারী চাকুরী পেয়ে চলে যাচ্ছে, তখন হারউইজের সহকারীর কাজ পাবার আশা হয়েছিল। এমনকি বান্ধবী মিলিভাকে লিখেছিলেন, "এর অর্থ আমি ঈশ্বরের ইচ্ছায় হারউইজের দাস হয়ে যাব।"
২ সেপ্টেম্বর ১৯০০ আইনস্টাইন চাকুরির
জন্য তাঁর প্রথম চিঠিটি অ্যাডল্ফ হারউইজকে লিখেছিলেন। চাকুরী পাবার চিঠি কিভাবে লিখতে হয় না, এটি তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ,
শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক,
আপনার সদয় চিঠির জন্য ধন্যবাদ। আপনার কাছে আমার কাজ পাওয়ার সুযোগ আছে জানতে পেরে আমি অতি আনন্দিত। সময়ের অভাবে আমি বেশিরভাগ গণিতের আলোচনা সভাগুলিতে যোগ দিতে পারিনি, তাত্ত্বিক এবং পরীক্ষামূলক পদার্থবিজ্ঞানের
কোন আলোচনাসভাতে আমার যোগ দেওয়ার কোন সুযোগ হয়নি, গণিতের বেশিরভাগ বক্তৃতায় আমি অংশগ্রহন
করতে পারিনি, তাই আমার পক্ষে বিশেষ কিছু বলার নেই। আমি শুধু বলব যে বিশ্ববিদ্যালয়ের বছরগুলি
আমি মূলত বলবিজ্ঞান এবং তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের
জন্যই ব্যায় করেছিলাম। শ্রদ্ধার সাথে, অ্যালবার্ট আইনস্টাইন।
চাকুরীর জন্য তার ব্যগ্রতা এত বেশি
ছিল যে ৩০শে সেপ্টেম্বর তিনি হারউইজকে আর একটি চিঠি লিখেন,
শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক, আমার বন্ধু এহরাত আমাকে জানিয়েছেন যে
আপনার বর্তমান সহকারী ডক্টর ম্যাটার ফ্রাউনফিল্ড জিমন্যাসিয়ামে শিক্ষকের পদ পেয়েছেন। বিনম্রতার সাথে জানতে চাই আমি কি আপনার সহকারী হওয়ার সুযোগ পেতে পারি? শ্রদ্ধার সাথে, অ্যালবার্ট আইনস্টাইন।
হারউইজ অবশ্যই আইনস্টাইনকে তিনি তার
সহযোগীর পদে নিযুক্ত করলেন না। তার গবেষণা ছিল মূলত সংখ্যাতত্ত্বের উপর। তিনি মনে করেছিলেন তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র তার পক্ষে উপযোগী হবে না।
ইতিমধ্যে আইনস্টাইনের প্রথম
গবেষণাপত্র “সূক্ষ্মনলের ঘটনা থেকে প্রাপ্ত সিদ্ধান্ত (Conclusions drawn from the phenomenon of capillarity)” জার্মানীর প্রখ্যাত
জার্নাল অ্যানালেন ডার ফিজিকের ১৯০১ সালের মার্চ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। গবেষণাপত্রটি ছিল খুবই মামুলি এবং এর
মূল ভিত্তিটি ছিল ভুল (আইনস্টাইন আনবিক আকর্ষণের জন্য বিপরীত বর্গ আইন অর্থাৎ দুইটি অনুর পরপ্সরকে আকর্ষন শক্তি তাদের মধ্যেকার দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক, অনুমান করেছিলেন, যা ভূল ছিল), তথাপি গবেষণাপত্রটি
তার উচ্চাশার পথের একটি ধাপ ছিল।
তিনি তার গবেষণাপত্রের প্রতিলিপিটি সহ বিভিন্ন অধ্যাপকের
কাছ চাকরির সন্ধানে চিঠি পাঠাতে লাগলেন। নিচে কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি,
১৯০১ সালের ৯-ই মার্চ লাইপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ের
অধ্যাপক অটো ওয়েইনারকে লেখেন,
“শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক,
গত গ্রীষ্মে আমি জুরিখ পলিটেকনিকের
গাণিতিক-পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা শেষ করেছি। বিভিন্ন বক্তৃতা শুনে, বিভিন্ন ক্লাসিক পড়ে, পরীক্ষাগারে বিভিন্ন পরীক্ষা করে আমি যে জ্ঞান অর্জন করেছি তা আরও প্রসারিত করতে চাই, কিন্তু তার জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান বর্তমানে আমার
আয়ত্ত্বের বাইরে। সেইজন্য আপনার কোনও সহকারীর
প্রয়োজন আছে কিনা তা জিজ্ঞাসা করার স্বাধীনতা নিচ্ছি। কিছু দিন আমার একটি গবেষণাপত্র আগে প্রকাশিত হয়েছে। আপনি যদি কয়েক লাইন লিখে
জানাতে পারেন এখন বা পরবর্তী শরৎকালে আমার আপনার কাছে সহকারীর
কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা আছে কি না তবে বাধিত হব। আপনার অনুগত অ্যালবার্ট
আইনস্টাইন।"
সেই একই দিনে নোবেল লরেট বিজ্ঞানী
উইলহেম অসওয়াল্ডকে লেখেন,
“সাধারণ রসায়ন সম্পর্কিত আপনার
কাজ আমাকে এই নিবন্ধটি লেখার জন্য অনুপ্রাণিত করেছিল তাই এর একটি প্রতিলিপি
পাঠানোর স্বাধীনতা নিচ্ছি। এই সুযোগে আমি কি জানতে পারি পরিমান বিজ্ঞানের সাথে
সুপরিচিত গাণিতিক-পদার্থবিজ্ঞানীকে আপনার
প্রয়োজন আছে কি? আমি এটা জানতে চাচ্ছি কারন এই ধরনের কোন পদ আমার শিক্ষার
সম্পূর্নতা আনবে।“
ওসওয়াল্ড চিঠির উত্তর দেবার মত
সৌজন্য পর্যন্ত দেখান নি। প্রায় একমাস পর চিঠিতে তার ঠিকানা দিয়েছেন কিনা এই
অনিশ্চয়তার অজুহাতে আইনস্টাইন পূনরায় ওসওয়াল্ডকে
চিঠি লিখেন। ওসওয়াল্ড সেই চিঠিরও কোন উত্তর দেননি। এরপর আইনস্টাইন একের পর এক
চাকুরীর দরখাস্ত পাঠাতে লাগলেন। গ্রোনিনজেন ইউনিভার্সিটির এডুয়ার্ড
রাইকে, স্টুটগার্টের রিচার্ড কক, লিডেনের কামারলিন ওনেস, বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের
কার্ল প্যালজোর, ইত্যাদি ইউরোপের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের
প্রফেসরদের কাছে তিনি দরখাস্ত পাঠিয়েছিলেন। বেশিরভাগ
সময় তিনি প্রত্যাখ্যানের সৌজন্যতাও পাননি। হতাশ হয়ে এক সময় তিনি এক গাদা পোস্টকার্ড জবাবি পোস্টকার্ড সহ কেনেন,
আশা করেছিলেন যে অন্তত তিনি একটি উত্তর পাবেন। দূর্ভাগ্যজনক, দেশিরভাগ সময়ই প্রফেসররা
জবাবি পোস্টকার্ডটাও ফেরত পাঠান নি।
ইতিমধ্যে আইনস্টাইনের পরিবার উদ্বিগ্ন
হয়ে পড়ছিল। কোনও চাকরি না পেয়ে প্রিয় ছেলের হতাশা তার বাবা হারম্যান আইনস্টাইনকে
একটি অস্বাভাবিক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছিল। ১৩ এপ্রিল, ১৯০১-এ হারম্যান উইলহেলম ওসওয়াল্ডকে
একটি চিঠি লিখেছিলেন। চিঠিটি ছেলের জন্য পিতার উদ্বেগের এক দুর্দান্ত উদাহরণ। চিঠিটি
ভাবানুবাদ এইরকম,
“অতি সম্মানিত প্রফেসর,
দয়া করে একজন পিতাকে ক্ষমা করবেন যিনি ছেলের স্বার্থে
আপনার মত সম্মানিত অধ্যাপকের দ্বারস্থ হয়েছেন। আপনাকে জানাই যে আমার ছেলে আলবার্ট ২২
বছর বয়স, ৪ বছর ধরে জুরিখ পলিটেকনিকে পড়াশোনা করে গত গ্রীষ্মে সম্মানের সাথে গণিত
এবং পদার্থবিজ্ঞানের ডিপ্লোমা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। সেই থেকে আলবার্ট একটি সহকারীর পদ, যা তাকে তাত্ত্বিক এবং পরীক্ষামূলক
পদার্থবিজ্ঞানে তার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সক্ষম করবে, পাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে
যাচ্ছে। যারা তাকে জানে তারা সকলেই তাঁর প্রতিভার প্রশংসা
করেন। আমি আপনাকে নিশ্চয়তা দিতে পারি যে আলবার্ট অসাধারণভাবে অধ্যয়নশীল, পরিশ্রমী
এবং বিজ্ঞানের প্রতি তার প্রচন্ড ভালবাসা। কোন সহকারীর
পদ পাওয়ায় অকৃতকার্য হওয়ায় আমার পুত্র বর্তমানে গভীরভাবে অসন্তুষ্ট। সে মনে করছে, তার
পছন্দের পেশা- গ্ণিত ও পদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়া চালিয়ে যাওয়া এখন তার হাতের বাইরে চলে
যাচ্ছে। এই ধারণা প্রতিদিনই তাকে আরও বেশি বিষন্ন করে তুলছে। এ ছাড়াও সে আমাদের বোঝা হয়ে দাড়াচ্ছে এইধরনের চিন্তাভাবনায়ও সে জর্জরিত হচ্ছে। সম্মানিত প্রফেসর, আমার পুত্র বর্তমানে সক্রিয়
যে কোনও পণ্ডিতের চাইতে আপনার প্রশংসা বেশি করে এবং সবচাইতে বেশি সম্মান করে। তাই আপনাকে তাঁর প্রকাশিত
তাঁর গবেষণাপত্রটি পড়ে দেখার জন্য বিনীত অনুরোধ করছি। আর যদি সম্ভব হয় তবে তাকে কিছু
উৎসাহের কথা লিখবেন যাতে সে বেঁচে থাকার ও কাজ করার নূতন উৎসাহ পায়। অতিরিক্ত হিসাবে আপনি যদি এখন বা পরবর্তী কোন সময়
তাকে একটি সহায়কের পদ দিতে পারেন, তবে আমার কৃতজ্ঞতা কোনও সীমানা থাকবে। আমি আশা রাখব
যে নিজের বিচক্ষণতায় আমার এই অনুরোধের জন্য আমাকে মার্জনা করবেন। এটা অবশ্যই উল্লেখ
করব যে আমার অস্বাভাবিক পদক্ষেপ সম্পর্কে আমার পুত্র কিছুই জানে না।
আপনার একনিষ্ঠ হারম্যান আইনস্টাইন।“
সংবেদনশূন্য ওসওয়াল্ড এই চিঠিরও কোন
জবাব দেন নি। ভাগ্যের পরিহাসে নয় বছর পরে ১৯০৯ সালে ওসওয়াল্ড এবং আইনস্টাইন উভয়ই
একসাথে জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট পান। অবশ্য ১৯১০ সালে ওসওয়াল্ড
আইনস্টাইনকে পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরষ্কারের মনোনীত করে তার অপরাধের কিছুটা প্রায়শ্চিত্ত করেছিলেন।
সহায়কের পদ পাওয়াতে তার অকৃতকার্জতার
জন্য আইনস্টাইন বিশেষ ভাবে তার ই টী এইচ প্রফেসর ওয়েবারকে দায়ী করতেন। ২৩ শে মার্চ,
১৯০১ তার বান্ধবী মিলেভাকে লিখেছিলেন, “… আমি মোটামুটিভাবে সহায়কের পদ পাওয়ার আশা ছেড়ে
দিয়েছি। আমার মনে হয় না ওয়েবার আমাকে অপদস্থ করার এইরকম একটা সুযোগ ছেড়ে দিবে। আমি
ওয়েবারকে লিখেছি যে আমার সহায়কের পদ পাওয়া একমাত্র তার সুপারিশের উপরই নির্ভর করে।”
বন্ধু গ্রসমানের কাছে দুঃখ করেছিলেন, "ওয়েবার অসাধু আচরণ না করলে অনেক আগেই একটি
চাকুরি পাওয়া যেত।"
বারবার অকৃতকার্যতা, অধ্যাপকদের অসংবেদনশীলতা
আইনস্টাইনকে অবশ্যই হতাশ করেছিল। তবুও আইনস্টাইন হাল ছাড়েননি। তিনি সহায়ক পদের জন্য
চেষ্টা চালিয়ে যান। এমনকি তাঁর নিকটতম বন্ধু
মিশেল বেসোর কাকার মাধ্যমে মিলানের পলিটেকনিকের গণিতের অধ্যাপকের কাছে আবেদন করেছিলেন।
১৫ মে থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত দুই মাস বাদে
তিনি ১৯০১ সালের বেশিরভাগ সময় তিনি বেকারই ছিলে। ওই দুইমাস তিনি উইন্টাথেরের একটি
স্কুলে শিক্ষকতা করেছিলেন এবং সেটা বেশ উপভোগ করেছিলেন। যশ উইন্টেলারকে তিনি লিখেছিলেন,
“আমি এখানে আমার কার্যক্রম নিয়ে বেশ খুশি আছি। পড়ানোটা যে আমি এত উপভোগ করব তা কখন
ভাবিনি। সকালে ৫-৬টি ক্লাস নেবার পরেও আমি বেশ সতেজ থাকি। বিকেলে আমার পড়াশোনা বা
কোন আকর্ষণীয় সমস্যা নিয়ে কাজ করি। আমি সত্যিই এই চাকরিতে খুশি আছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে
কোন পদ পাওয়ার চেষ্টা পুরোপুরি ছেড়ে দিয়েছি।“ উইন্টারথারে
তিনি যে সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলেন তা হ'ল অন্যান্য শিক্ষকদের সমসাময়িক পদার্থবিজ্ঞানে
আগ্রহের অভাব।
আইনস্টাইন স্থায়ী চাকুরীর জন্য চেষ্টা
চালিয়ে যাচ্ছিলেন। উইন্টেলারের কাছ থেকে তিনি
জানতে পারেন যে বার্গডর্ফ টেকনিয়ামে একটি
শূন্য পদ আছে। তিনি তৎক্ষণাত আবেদন করেন, "আমি জানতে পেরেছি যে আপনার প্রতিষ্ঠানের
স্ট্রেন্থ অফ ম্যাটারিয়াল চেয়ারের জন্য একটি শূন্যপদ রয়েছে। আমি সেই পদে আবেদনের
স্বাধীনতা নিচ্ছি…।" তিনি উইন্টাথআরে সাময়িক শিক্ষকতা, তাঁর গবেষণাপত্রের উল্লেখ ও করেন। অবশ্য সেই চাকুরীটি
তিনি পান নি। চাকুরীটির অন্যতম শর্ত ছিল মেশিন ডিজাইন সম্বন্ধে ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা,
যা আইনস্টাইনের ছিল না। ফ্রাউনফিল্ডের একটি ক্যান্টনাল স্কুলে একটি শূন্য পদ আছে জেনে
তিনি আবেদন করেছিলেন। সেই পদটি পেয়েছিল তাঁর বন্ধু মার্সেল গ্রসম্যান।
তিনি গ্রসম্যানকে অভিনন্দন জানিয়ে লিখেছিলেন, “প্রিয় মার্সেল, খবরের কাগজে তোমার
ফ্রাউনফিল্ডের ক্যান্টনাল স্কুলে অধ্যাপক হওয়ার পড়লাম। এই সাফল্যের জন্য তোমাকে আমার
আন্তরিক অভিনন্দন। ওই পদের জন্য আমিও আবেদন
করেছিলাম, যদিও জানতাম আমার ওই পদটি বা অনুরূপ
কোন পদ পাওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই।“ গ্রসমানকে জানিয়েছিলেন, “আমিও এখন কমপক্ষে এক বছরের জন্য আমার জীবিকা সম্পর্কে
স্থায়ী উদ্বেগ থেকে মুক্তি পেয়ে খুশির অবস্থানে রয়েছি।“ আইনস্টাইন একটি প্রাইভেট
স্কুলে কাজ পেয়েছিলেন। আইনস্টাইনের কাজ ছিল একটি মাত্র ছাত্রকে মাচুরা পরীক্ষার জন্য
প্রস্তুত করানো। চাকুরীটা অবশ্যই আইনস্টাইনের উপযুক্ত ছল না। বিনামূল্যে থাকা, খাওয়া
এবং মাসে ১৫০ ফ্রাঙ্ক। কিন্তু আর্থিক কারনে আইনস্টাইনকে ওই শর্তে রাজী হতে হয়। তবে
পড়ানোর চাপ কম থাকায় নিজের পড়াশোনার জন্য যথেষ্ট সময় থাকত। সেখানে থাকাকালীন তিনি জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক
আলফ্রেড ক্লাইনারের নির্দেশনায় তিনি ডক্টরেট ডিগ্রীর জন্য থিসিস জমা দেন। বান্ধবী
মিলেভা মারিক গর্ব করে তার বন্ধুকে লিখেছিলেন, “অ্যালবার্ট একটি দুর্দান্ত গবেষণা লিখেছেন,
যা তিনি তাঁর ডক্টরেট ডিগ্রীর প্রবন্ধ হিসাবে জমা দিয়েছে। সম্ভবত কয়েক মাসের
মধ্যে ডক্টরেট পাবেন।“ দূর্ভাগ্যজনকভাবে জুরিখ ইউনিভার্সিটি থিসিসটি বাতিল করে। পেটেন্ট অফিসের কাজের প্রত্যাশায় বার্নে চলে যাওয়ার
ঠিক আগে আইনস্টাইনের জীবনের এটিই শেষ ধাক্কা।
আইনস্টাইনের পেটেন্ট অফিসে চাকুরীর
একটি ইতিহাস আছে। ছাত্রজীবন থেকেই মার্সেল গ্রসমান আইনস্টাইনের একজন সত্যিকারের বন্ধু এবং অনুরাগী ছিলেন।
ছাত্রজীবনেই তিনি তাঁর পিতামাতার কাছে ভবিষ্যদবাণী করেছিলেন, "এই আইনস্টাইন একদিন
এক বিশিষ্ট বিখ্যাত ব্যক্তি হবেন।" আইনস্টাইনের চাকরী পেতে অসুবিধায় তিনি অত্যন্ত
ব্যথিত ছিলেন। একদিন তার বাবাকে জানিয়েছিলেন যে আইনস্টাইনের উপযুক্ত কাজ পেতে অসুবিধা
হচ্ছে। বার্নের ফেডারাল পেটেন্ট অফিসের পরিচালক ফ্রেডরিক হেলার
ছিলেন গ্রসমানের পিতার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। গ্রসমানের পিতা হেলারের কাছে আইনস্টাইনের
জন্য সুপারিশ করেন, হেলারও আইনস্টাইনের চাকরির প্রতিশ্রুতি দেন।
১৯০১ সালের এপ্রিলে আইনস্টাইন যখন এ সম্পর্কে জানতে পেরেছিলেন, তখন গ্রসম্যানের প্রতি
তাঁর কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেছিলেন, “গতকাল তোমার চিঠি পেয়েছি। তোমার ভালবাসা ও সহমর্মিতায়
আমি মুগ্ধ। তুমি তোমার দূর্ভাগা বন্ধুকে ভূলে যাওনি। আমি সত্যিই বিশ্বাস করি যে তুমি
ও এহরাতের চেয়ে ভাল সহকর্মী আমার নেই। বলার দরকার নেই যে কাজটি পেলে আমি খুবই
আনন্দিত হব এবং তোমার সুপারিশের অসম্মান হতে দেব
না।“ ১৫ ই এপ্রিল মিলেভাকে জানান "গতকাল
সন্ধ্যায় মার্সেলের কাছ থেকে একটি চিঠি পেয়েছি। আমাকে জানিয়েছে খুব শীঘ্রই বার্নের
পেটেন্ট অফিসে স্থায়ী পদ পাব। এটি কি সাংঘাতিক খুশির খবর। এটা হলে আমি আনন্দে
পাগল হয়ে যাব।“
এপ্রিল মাসে এই পদক্ষেপটি শুরু করা
হলেও কাজটি পেতে সময় লেগেছিল। ১১ ডিসেম্বর পেটেন্ট অফিসে শূন্যপদের জন্য বিজ্ঞাপন
দেওয়া হয়েছিল। আইনস্টাইনের কথা ভেবে হেলার যোগ্যতার মান ঠিক করেন, তিনি আইনস্টাইনকে
আবেদন করতেও বলেছিলেন। আইনস্টাইন সঙ্গে সঙ্গে আবেদন করেন, “আমি, নীচের স্বাক্ষ্কারিক,
বৌদ্ধিক
সম্পত্তির যুক্তরাস্টীয় দপ্তরের দ্বিতীয় শ্রেণির
পদের ইঞ্জিনিয়ার পদের জন্য আবেদন করার স্বাধীনতা নিচ্ছি, যে পদটি ১১ ডিসেম্বর ১৯০১
সরকারী সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপিত হয়েছে।।।“ এরপর তিনি ইটিএইচ থেকে
গণিত ও পদার্থবিদ্যায় ডিপ্লোমা, তার গবেষণাপ্ত্র, স্কুলে অস্থায়ী চাকুরি ইত্যাদির উল্লেখ
করেন। জুরিখ ইউনিভার্সিটিতে পি এইচ ডি ডিগ্রীর জন্য থিসিস জমা দেওয়ার কথাও লেখেন। পরিশেষে
লেখেন, “আমি জার্মান পিতামাতার পুত্র, তবে
আমি ১৬ বছর বয়স থেকে সুইজারল্যান্ডে বসবাস করছি I বর্তমানে আমি জুরিখ শহরের নাগরিক।“
পেটেন্ট অফিসে চাকরীর আশায় আইনস্টাইন স্কুলের চাকুরী ছেড়ে বার্নে চলে আসেন। চাকুরিটি
না পাওয়া অবধি কিছু উপার্জনের জন্য তিনি প্রাইভেট টুইশন দেবার কথা ভেবেছিলেন। ১৯০২ সালের
৫ ফেব্রুয়ারি বার্নের এক একটি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন,
গণিত ও পদার্থবিদ্যার
ছাত্র ও শিক্ষার্থীদের জন্য
পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে শিক্ষা দেন
অ্যালবার্ট আইনস্টাইন
জুরিখ পলিটেকনিকের শিক্ষকের ডিপ্লোমা প্রাপ্ত।
পরীক্ষামূলক পাঠ বিনামূল্যে।
দর্শনের ছাত্র তরুণ রোমানিয়ান মরিস সলোভাইন বিজ্ঞাপনটি দেখে
আইনস্টাইনের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন। পরে, তিনি তাদের প্রথম সাক্ষাৎকার সম্বন্ধে
লিখেছিলেন,
“ঘরে ঢুকে চেয়ারে বসে আইনস্টাইনকে বলেছিলাম যে আমি দর্শন নিয়ে
পড়াশোনা করেছি তবে প্রকৃতি সম্বন্ধে আরও জ্ঞান অর্জনের জন্য আমি পদার্থবিজ্ঞান অধ্যয়ন
করতে চাই। আমরা বিভিন্ন ধরণের নানা প্রশ্ন নিয়ে প্রায় দুই ঘন্টা কথা বলি। বুঝতে পারলাম আমাদের দুজনের
ধারণায় অনেক মিল আছে। আমরা পরস্পরের প্রতি
আকৃষ্টও হলাম। আমি চলে আসার সময় আইনস্টাইন আমার সাথে নিচে এসেছিলেন। রাস্তায়
দাঁড়িয়ে আমরা আরও আধ ঘন্টা কথা বলি তারপর পরের দিন আবার আসব বলে বিদায় নিই।“
মরিস সলোভাইন তাঁর আজীবনের বন্ধু হয়ে ওঠেন। তারা নিয়মিত মিলিত
হতেন এবং পদার্থবিজ্ঞান এবং দর্শনের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতেন। কিছুদিন পর
জুরিখ থেকে আইনস্টাইনের পুরানো বন্ধু কনরাড হ্যাবিচ তাদের সাথে যোগ দেন। তারা পদার্থবিজ্ঞানের
সমস্যাগুলি নিয়ে আলোচনা করতেন। সবাই মিলে বিভিন্ন ক্লাসিক বই; ডেভিড
হিউমের মানব প্রকৃতির উপর নিবন্ধ, (এ ট্রিটাইস অন হিউম্যান নেচার), আর্নস্ট ম্যাকের সংবেদনশীলতার বিশ্লেষণ (আনালিসিস অফ দী
সেনসেশন), বলবিজ্ঞান ও তার বিকাশ (মেকানিক্স অ্যান্ড ইটস
ডেভেলপমেন্ট), ইমানুয়েল ক্যান্টের বিশুদ্ধ কারণের সমালোচনা (ক্রিটিক অফ পিউর
রিজন), বারুক স্পিনোজার নীতিশাস্ত্র (এথিক্স) ইত্যাদি পড়তেন ও তাদের বক্তব্য
নিয়ে আলোচনা করতেন। কৌতুক করে তারা নিজেদের নিয়ে অলিম্পিয়া আকাদেমি
বানিয়েছিলেন এবং আইনস্টাইন ছিলেন আকাদেমির প্রেসিডেন্ট। অলিম্পিয়া আকাদেমি তার স্বল্প জীবনে আইনস্টাইনের বিজ্ঞান এবং দর্শনের উপর দীর্ঘ প্রভাব ফেলেছিল।
পরবর্তীকালে আইনস্টাইন বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন আকাডেমির সদস্য হন, তবে তিনি তার অলিম্পিয়া
আকাডেমির সদস্যপদের স্মৃতি সাদরে স্মরণ করতেন।
তিনি বলেছিলেন, "আমাদের আনন্দপূর্ন আকাডেমি অন্যান্য অনেক সম্মানজনক আকাদেমি, পরবর্তী
সময়ে আমি যাদের অনেক কাছ থেকে জানতে পেরেছিলাম, তাদের চাইতে কম শিশুসুলভ ছিল।“
অবশেষে ১৯০২ সাল ২ জুন, ফেডারাল পেটেন্ট অফিসের পরিষদ (কাউন্সিল)
আনুষ্ঠানিকভাবে আইনস্টাইনকে (ইঞ্জিনিয়ার্স দ্বিতীয় শ্রেনী) বেছে নিলেন। লক্ষণীয় যে
একই সাথে বার্নের এক হেনরিক শেঙ্কও নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯০২ সালের ১৯ জুন, সুইস বিচার
বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে আইনস্টাইনের নিয়োগ পত্র
জারি করে, জানান হয় তার বার্ষিক ৩,৫০০ বেতন, এবং সর্বশেষ
১ জুলাইয়ের মধ্যে তাকে যোগ দিতে বলা হয়। আইনস্টাইন
২৩ জুন বার্নের পেটেন্ট অফিসে যোগ দেন। একটি
স্থায়ী চাকুরীর জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষা অবসান হল।
No comments:
Post a Comment